প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
দেশে চলমান বিদ্যুৎ সংকটের কারণে সৃষ্টি হওয়া লোডশেডিং পরিস্থিতি খুব স্বল্প সময়ের মধ্যেই উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। তিনি জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে চলমান বিভিন্ন সমস্যা মোকাবিলায় সরকার কাজ করছে এবং সংকট কাটিয়ে উঠতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি দেশের সাম্প্রতিক বিদ্যুৎ পরিস্থিতি, লোডশেডিংয়ের কারণ এবং শহর ও গ্রামাঞ্চলের মধ্যে বিদ্যুৎ সংকটের বোঝা বণ্টনের বিষয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন।
জাহেদ উর রহমান বলেন, বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে সরকার বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করছে। লোডশেডিংয়ের প্রকৃত চিত্র এবং এর পেছনের কারণ সম্পর্কে আরও তথ্য জনসমক্ষে তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বর্তমানে যে পরিমাণ লোডশেডিং হচ্ছে, তা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই অনেকটাই কমে আসবে।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুতের ঘন ঘন ওঠানামা এবং নির্ধারিত ও অনির্ধারিত লোডশেডিং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে প্রচণ্ড গরমের সময় বিদ্যুৎ না থাকায় নগর ও গ্রাম—উভয় এলাকার মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে। বাসাবাড়ির পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসা, শিল্পকারখানা, শিক্ষা কার্যক্রম এবং বিভিন্ন সেবাখাতেও এর প্রভাব পড়ছে।
তথ্য উপদেষ্টা বলেন, বর্তমান সরকার বিদ্যুৎ সংকটের বোঝা শহর ও গ্রামাঞ্চলের মানুষের মধ্যে তুলনামূলকভাবে সুষমভাবে ভাগ করে দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অতীতে রাজধানী ও বড় শহরগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কারণে অনেক ক্ষেত্রে গ্রামাঞ্চলে তুলনামূলক বেশি লোডশেডিংয়ের অভিযোগ ছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার সংকটের চাপ একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের ওপর না রেখে তুলনামূলকভাবে সবার মধ্যে ভাগ করে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, ঢাকায় বসবাসকারী মানুষ সাম্প্রতিক সময়ে যে মাত্রার লোডশেডিং দেখছেন, অতীতে রাজধানীতে তা তুলনামূলক কম দেখা যেত। এর কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, আগে রাজধানীতে বিদ্যুৎ সরবরাহ বজায় রাখার চেষ্টা করা হলেও দেশের অন্যান্য অঞ্চলে বিদ্যুৎ ঘাটতির চাপ বেশি পড়ত।
তবে তিনি এটাও স্পষ্ট করেন যে, বড় শহরগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রয়োজনীয়তা শুধু সেখানে প্রভাবশালী মানুষের বসবাসের কারণে নয়। দেশের বড় শহরগুলো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রধান কেন্দ্র হওয়ায় সেখানে শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবহন, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সেবা পরিচালনায় বিদ্যুতের চাহিদা বেশি থাকে। এ কারণেই নীতিগতভাবে বড় শহরগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহকে অনেক সময় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
তারপরও সরকার বর্তমান সংকটের বাস্তবতায় বিদ্যুৎ ঘাটতির চাপ তুলনামূলকভাবে ভাগাভাগি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানান তিনি। এই নীতির ফলে রাজধানীতেও এখন আগের তুলনায় বেশি লোডশেডিং দেখা যাচ্ছে।
লোডশেডিংয়ের প্রকৃত তথ্য ও অতীতের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়েও সরকার কাজ করছে বলে জানান তথ্য উপদেষ্টা। তিনি বলেন, আগের বিভিন্ন সরকারের সময় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের যে দাবি করা হয়েছিল, বাস্তবে সে সময় দেশে কী পরিমাণ বিদ্যুৎ ঘাটতি ছিল এবং কত মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে, সেই তথ্যও পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী সপ্তাহের মধ্যে অতীত ও বর্তমান বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরা সম্ভব হবে। এর মাধ্যমে দেশের মানুষ বিদ্যুৎ খাতের প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে একটি পরিষ্কার ধারণা পাবেন বলেও তিনি মনে করেন।
বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সংকটের বিষয়টি শুধু উৎপাদন সক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; জ্বালানি সরবরাহ, বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারিগরি অবস্থা, সঞ্চালনব্যবস্থা এবং ক্রমবর্ধমান চাহিদাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তথ্য উপদেষ্টা বলেন, জ্বালানি ঘাটতির পাশাপাশি বিদ্যুৎকেন্দ্রে আকস্মিক যান্ত্রিক ত্রুটি, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং সঞ্চালন গ্রিডের সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক সময় বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দ্রুত বাড়তে থাকা বিদ্যুতের চাহিদাও সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ণ, শিল্পায়ন এবং নতুন নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সম্প্রসারণের ফলে বিদ্যুতের প্রয়োজনীয়তা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। কিন্তু উৎপাদন, জ্বালানি সরবরাহ এবং সঞ্চালন ব্যবস্থার মধ্যে কোনো একটি অংশে সমস্যা দেখা দিলে তার প্রভাব দ্রুত পুরো ব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় শুধু উৎপাদন বাড়ালেই যথেষ্ট নয়; একই সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, পুরোনো সঞ্চালন অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করা প্রয়োজন। কারণ উৎপাদিত বিদ্যুৎ যথাযথভাবে সঞ্চালন ও বিতরণ করা না গেলে উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ভোক্তারা কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।
বর্তমানে লোডশেডিংয়ের কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। দিনের কাজ শেষে রাতে বাসায় ফিরে বিদ্যুৎ না থাকলে শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিদের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও এর আর্থিক প্রভাব পড়ে। বিদ্যুৎনির্ভর ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অনেককে বিকল্প ব্যবস্থার জন্য অতিরিক্ত ব্যয় করতে হয়।
গ্রামাঞ্চলেও বিদ্যুৎ সংকট মানুষের জীবনযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে। কৃষি, ক্ষুদ্র শিল্প, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে বিদ্যুতের সম্পর্ক ক্রমেই বাড়ছে। ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহে দীর্ঘ সময়ের বিঘ্ন স্থানীয় অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষ থেকে স্বল্প সময়ের মধ্যে লোডশেডিং কমে আসার আশ্বাস সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছুটা স্বস্তির প্রত্যাশা তৈরি করেছে। তবে মানুষ এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন আশ্বাসের বাস্তবায়নে। বিদ্যুৎ পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি হলে দৈনন্দিন জীবনযাত্রার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তথ্য উপদেষ্টার বক্তব্য অনুযায়ী, সরকার বিদ্যুৎ সংকটের কারণগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের পথে এগোচ্ছে এবং পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্যভিত্তিক চিত্র জনসমক্ষে আনার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিদ্যুৎ ঘাটতি কমিয়ে আনা এবং সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও স্থিতিশীল করাই এখন সরকারের সামনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
সামনের দিনগুলোতে জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কারিগরি সমস্যা সমাধান এবং সঞ্চালন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠা গেলে লোডশেডিং দ্রুত কমে আসতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। সরকারের ঘোষিত উদ্যোগ কত দ্রুত বাস্তব ফল নিয়ে আসে, এখন সেদিকেই তাকিয়ে দেশের কোটি কোটি বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী।


