প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
দেশের বাজারে সুগন্ধি চালের চাহিদা ও দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় রপ্তানি নীতিতে আরও কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে সরকার। অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং ভোক্তাদের ওপর বাড়তি মূল্যচাপ কমাতে আগে অনুমোদন দেওয়া সুগন্ধি চালের রপ্তানি কোটা পুনর্বিবেচনা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে রপ্তানির অনুমতি পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো বাস্তবে কত পরিমাণ সুগন্ধি চাল বিদেশে রপ্তানি করেছে, তার বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
বৃহস্পতিবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের রপ্তানি-২ শাখা থেকে জারি করা এক চিঠিতে অনুমোদন পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগামী তিন কর্মদিবসের মধ্যে তাদের প্রকৃত রপ্তানির পরিমাণের তথ্য জমা দিতে বলা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের এই উদ্যোগের মধ্য দিয়ে একদিকে বাজারে সুগন্ধি চালের সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, অন্যদিকে অব্যবহৃত রপ্তানি কোটা পুনর্বিন্যাসের প্রক্রিয়া শুরু হলো।
মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট স্মারকে বলা হয়েছে, সুগন্ধি চালের বর্তমান বাজার পরিস্থিতি এবং দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আগে দেওয়া রপ্তানি অনুমোদনের পরিমাণ হ্রাস অথবা সমন্বয় করা প্রয়োজন। এজন্য যেসব প্রতিষ্ঠান রপ্তানির অনুমতি পেয়েছে, তাদের প্রকৃত রপ্তানির পরিমাণ সম্পর্কে হালনাগাদ তথ্য জরুরি ভিত্তিতে সংগ্রহ করা হচ্ছে।
সরকারের এই সিদ্ধান্তের পেছনে মূল কারণ হিসেবে দেশের বাজারে সুগন্ধি চালের চাহিদা ও দামের ঊর্ধ্বগতি সামনে এসেছে। সাধারণত সুগন্ধি চাল দেশের ভোক্তাদের পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশি ও আন্তর্জাতিক বাজারেও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন একটি পণ্য। তবে অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহ কমে গেলে কিংবা মজুদের ওপর চাপ তৈরি হলে এর দাম দ্রুত বাড়ার আশঙ্কা থাকে। এমন পরিস্থিতিতে রপ্তানির পাশাপাশি দেশের বাজারের চাহিদাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, রপ্তানির অনুমতি পাওয়ার পরও অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের নির্ধারিত কোটা অনুযায়ী সুগন্ধি চাল বিদেশে পাঠাতে পারেনি। আবার কিছু প্রতিষ্ঠান অনুমোদিত পরিমাণের একটি অংশ রপ্তানি করেছে। ফলে কাগজে অনুমোদিত রপ্তানি কোটা এবং বাস্তবে রপ্তানি হওয়া চালের পরিমাণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য তৈরি হয়েছে।
এই ব্যবধানের প্রকৃত চিত্র জানতে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক তথ্য চাওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো আগামী তিন কর্মদিবসের মধ্যে তাদের প্রকৃত রপ্তানির পরিমাণ জানালে সরকার বুঝতে পারবে কোন প্রতিষ্ঠানের কতটুকু কোটা ব্যবহার হয়েছে এবং কতটুকু অব্যবহৃত রয়েছে। এরপর সেই তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এর আগে গত ২ আগস্ট বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে সুগন্ধি চালের বাজার পরিস্থিতি নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে দেশের চাল উৎপাদন, অভ্যন্তরীণ চাহিদা, বাজারের মূল্য পরিস্থিতি এবং সুগন্ধি চালের রপ্তানির প্রকৃত চিত্র নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বৈঠকে উঠে আসে, সুগন্ধি চাল রপ্তানির জন্য অনুমতি পাওয়া অনেক প্রতিষ্ঠানই তাদের নির্ধারিত কোটা পুরোপুরি ব্যবহার করতে পারেনি। কেউ কেউ আংশিক রপ্তানি করেছে, আবার কিছু প্রতিষ্ঠানের রপ্তানি কার্যক্রমও সীমিত রয়েছে। এ অবস্থায় অনুমোদিত পুরো কোটা বহাল রাখলে দেশের বাজারের সরবরাহ ব্যবস্থায় তার প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছে সরকার।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সুপারিশের ভিত্তিতে এর আগে দুই দফায় মোট ২৭৮টি প্রতিষ্ঠানকে ৪৫ হাজার ২৭০ টন সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। প্রথম দফায় ১৩ মে ২১১টি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে এবং দ্বিতীয় দফায় ৬৭টি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে এই অনুমোদন দেওয়া হয়।
তবে অনুমোদিত পরিমাণের বড় একটি অংশ বাস্তবে রপ্তানি না হওয়ায় এখন সেই কোটা নিয়ে নতুন করে হিসাব করছে সরকার। রপ্তানির অনুমতি পাওয়ার পর কোনো প্রতিষ্ঠান যদি নির্ধারিত পরিমাণ চাল বিদেশে পাঠাতে না পারে, তাহলে তার অব্যবহৃত কোটা বহাল রাখার প্রয়োজনীয়তা কতটা রয়েছে, সেটিও বিবেচনা করা হচ্ছে।
সরকারের এই উদ্যোগকে বাজার নিয়ন্ত্রণের একটি অংশ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে কোনো পণ্যের সরবরাহ কমে গেলে শুধু দাম বাড়ে না, এর প্রভাব সাধারণ ভোক্তার দৈনন্দিন ব্যয়েও পড়ে। বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়লে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর চাপ তুলনামূলক বেশি পড়ে।
সুগন্ধি চালের বাজার পরিস্থিতি নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যেও ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য রয়েছে। ব্যবসায়ীদের একটি অংশের দাবি, দেশের শীর্ষ ১০টি বড় মিল মালিকের কাছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সুগন্ধি চাল মজুদ রয়েছে। তাদের অভিযোগ, বাজারের প্রয়োজন অনুযায়ী মজুদ থাকা চাল সরবরাহ না করার কারণে কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে এবং এর সুযোগ নিয়ে দাম বাড়ছে।
তবে মজুদ ও সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে ওঠা এসব অভিযোগ যাচাই করে দেখার বিষয় রয়েছে। সরকারও কোনো পক্ষের বক্তব্যের ওপর নির্ভর না করে প্রকৃত পরিস্থিতি যাচাই করতে চাইছে। এ কারণেই রপ্তানিকারকদের প্রকৃত রপ্তানি তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি বাজার মনিটরিং আরও জোরদার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অতিরিক্ত মুনাফা করার প্রবণতা ঠেকাতে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাজারে চালের সরবরাহ, মজুদ, মূল্য এবং ব্যবসায়ীদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করা হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, রপ্তানি ও অভ্যন্তরীণ বাজারের মধ্যে ভারসাম্য রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে দেশের রপ্তানিকারকদের আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যবসার সুযোগ দিতে হবে, অন্যদিকে দেশের ভোক্তাদের প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের সরবরাহও নিশ্চিত করতে হবে। কোনো একটি দিককে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিলে অন্যদিকে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
সরকারের বর্তমান উদ্যোগে সেই ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে যেসব প্রতিষ্ঠান নিয়মিত রপ্তানি করছে এবং অনুমোদিত কোটা ব্যবহার করছে, তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রাখার সুযোগ থাকতে পারে। অন্যদিকে যেসব প্রতিষ্ঠান কোটা পেয়েও তা ব্যবহার করেনি, তাদের অব্যবহৃত অংশ পুনর্বিবেচনা করা হলে দেশের বাজারের জন্য প্রয়োজনীয় চাল ধরে রাখা সম্ভব হতে পারে।
তবে রপ্তানি কোটা কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রকৃত রপ্তানি, বাজারে মজুদের পরিমাণ, উৎপাদন, অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ হঠাৎ করে রপ্তানি কমিয়ে দিলে রপ্তানিকারক ও কৃষক পর্যায়েও এর প্রভাব পড়তে পারে। আবার বাজারে সরবরাহ নিশ্চিত না করে অতিরিক্ত রপ্তানির সুযোগ রাখলেও ভোক্তাদের ওপর মূল্যচাপ বাড়তে পারে।
তিন কর্মদিবসের মধ্যে পাওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই শেষে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সুগন্ধি চালের রপ্তানি কোটা কমানো বা সমন্বয়ের বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে। সেই সিদ্ধান্তে কোন প্রতিষ্ঠানের কতটুকু কোটা বহাল থাকবে এবং কোন প্রতিষ্ঠানের অব্যবহৃত কোটা পুনর্বিবেচনা করা হবে, তা প্রকৃত রপ্তানি তথ্যের ওপর নির্ভর করবে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দেশের বাজারে সুগন্ধি চালের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং একই সঙ্গে বৈধ রপ্তানি কার্যক্রম সচল রাখা। বাজারে কৃত্রিম সংকট কিংবা অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে কার্যকর নজরদারি এবং সময়মতো সিদ্ধান্ত গ্রহণই এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সুগন্ধি চালের বাজারে সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যে যে উদ্বেগ তৈরি করেছে, তা কমাতে সরকারের এই উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। রপ্তানিকারকদের কাছ থেকে প্রকৃত তথ্য পাওয়ার পর সরকার যদি বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কোটা পুনর্বিন্যাস করতে পারে, তাহলে একদিকে অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং অন্যদিকে রপ্তানির সুযোগ ধরে রাখার মধ্যে একটি কার্যকর ভারসাম্য তৈরি হতে পারে।


