সিলেটে এসএসসিতে প্রায় অর্ধেক ফেল, কমেছে পাসের হার

প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড এবং জ্ঞানভিত্তিক একটি প্রগতিশীল সমাজ বিনির্মাণের চাবিকাঠি হলো মানসম্মত শিক্ষা। মানবজীবনের প্রথম বড় একাডেমিক লড়াই হিসেবে মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট বা এসএসসি পরীক্ষা প্রতিটি শিক্ষার্থীর জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। দীর্ঘ একটি বছর কিংবা তারও বেশি সময় ধরে চলা দিনরাত পড়াশোনা, গাণিতিক হিসাব-নিকাশ, বিজ্ঞান কিংবা ইতিহাসের পাতা উল্টে রাত জাগার ক্লান্তি এবং অভিভাবকদের বুকভরা আশা—সবকিছুরই একটি চূড়ান্ত পরিণতি নির্ধারণ করে এই পরীক্ষার ফলাফল। কিন্তু কাঠিন্যের চাদরে মোড়ানো এই পরীক্ষার ফলাফল যখন প্রকাশিত হয়, তখন সব আনন্দ সবার ভাগ্যে সমানভাবে জোটে না। চলতি বছরের প্রকাশিত এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল দেশজুড়ে এক গভীর আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে সিলেট শিক্ষা বোর্ডের প্রকাশিত ফলাফলে যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তা এককথায় উদ্বেগজনক এবং হতাশার চাদরে ঢাকা। ফলাফলের পরিসংখ্যান বলছে, এই বোর্ডে এবার প্রায় অর্ধেক পরীক্ষার্থীই কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জনে ব্যর্থ হয়ে ফেল করেছে, যা পুরো শিক্ষাব্যবস্থার মান ও কার্যকারিতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে।
গত সোমবার সকাল থেকেই সিলেট শিক্ষা বোর্ডের চারপাশের বাতাসে এক ধরনের চাপা উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছিল। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যখন আনুষ্ঠানিকভাবে চলতি বছরের এসএসসির ফলাফল ঘোষণা করা হলো, তখন সেই শঙ্কা সত্যি প্রমাণিত হলো। বোর্ডের দায়িত্বশীল কতৃপক্ষের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর সিলেট শিক্ষা বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত মাধ্যমিক পরীক্ষায় সামগ্রিক পাসের হার নাটকীয়ভাবে কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫৮ দশমিক ৩৩ শতাংশে। এই হিসাবের সহজ অর্থ দাঁড়াল যে, পরীক্ষার বৈতরণী পার হয়ে যারা সফলভাবে উত্তীর্ণ হতে পেরেছেন, তাদের হার প্রায় ৫৮ শতাংশ হলেও এর বিপরীতে বাকি বিশাল একটি অংশ অর্থাৎ প্রায় ৪১ দশমিক ৬৭ শতাংশ শিক্ষার্থী চূড়ান্তভাবে অকৃতকার্য বা ফেল করেছে। শতাংশের এই হিসাব অনুযায়ী প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থীর ফলাফল বিপর্যয় ঘটায় সংশ্লিষ্ট অভিভাবক, শিক্ষক এবং সচেতন মহলের মনে গভীর চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। কেন এমন ধস নামল শিক্ষার মানে, তা নিয়ে এখন চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
সার্বিক পাসের হার আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ার এই করুণ চিত্রের বিপরীতে একমাত্র সান্ত্বনা কিংবা সামান্য আশার আলো হয়ে এসেছে জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা। সামগ্রিক পাসের হার গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস পেলেও সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ জিপিএ-৫ অর্জনকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা এবার সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে সিলেট শিক্ষা বোর্ডের অধীনে সারা দেশ থেকে মোট ৩ হাজার ৮৩৬ জন মেধাবী শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ অর্জন করার গৌরব অর্জন করেছে। বিগত বছরের ফলাফলের সঙ্গে তুলনা করলে এই বৃদ্ধির চিত্রটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিগত ২০২৫ সালে সিলেট শিক্ষা বোর্ডে সার্বিক পাসের হার যেখানে ছিল ৬৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ, সেখানে সেবার জিপিএ-৫ পেয়েছিল মাত্র ৩ হাজার ৬১৪ জন। আর তার আগের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালে পাসের হার ছিল ৭৩ দশমিক ৩৫ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৫ হাজার ৪৭১ জন। অর্থাৎ বিগত তিন বছরের ধারাবাহিক পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, পাসের হার নিয়মিতভাবে কমতে থাকলেও জিপিএ-৫ এর সংখ্যা এই বছর সামান্য ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।
সিলেট শিক্ষা বোর্ড সূত্রে প্রাপ্ত বিস্তারিত তথ্যে আরও জানা যায় যে, চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় এই বোর্ডের অধীনে মোট ৯টি জেলার বিভিন্ন উপজেলার মোট ৯৭৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে হাজার হাজার শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছিল। এ বছর বোর্ডের অধীনে সর্বমোট ৮৯ হাজার ৭৯ জন পরীক্ষার্থী অত্যন্ত উদ্দীপনার সঙ্গে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য নিবন্ধন করেছিল এবং পরীক্ষায় অংশ নেয়। এই বিশাল পরীক্ষার্থীর ভিড় থেকে দীর্ঘ লড়াই শেষে চূড়ান্তভাবে পাস করতে পেরেছেন মাত্র ৫১ হাজার ৯৫৭ জন শিক্ষার্থী। বিগত বছরের তুলনায় এ বছর পরীক্ষার্থীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস পেয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, গত বছরের তুলনায় চলতি বছরে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১২ হাজার ৭৯৮ জন কম ছিল। পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী এই মোট শিক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্রীর সংখ্যা ছিল ৫৩ হাজার ৮৯১ জন এবং অন্যদিকে ছাত্রের সংখ্যা ছিল ৩৫ হাজার ৫৩০ জন। অর্থাৎ ছাত্রদের তুলনায় ছাত্রীদের উপস্থিতি ও অংশগ্রহণ ছিল লক্ষ্যণীয়ভাবে অনেক বেশি।
বোর্ডের আওতাধীন বিভিন্ন জেলার ফলাফলের তুলনামূলক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে শিক্ষার মানের এক বড় বৈষম্য ও ভিন্নতা দেখতে পাওয়া যায়। জেলাভিত্তিক এই ফলাফলে পাসের হারের দিক থেকে সবার শীর্ষে রয়েছে সিলেট জেলা নিজে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তুলনামূলক ভালো ফল করেছে। এর বিপরীতে এই বোর্ডের আওতাধীন চার জেলার মধ্যে সবচেয়ে সর্বনিম্ন পাসের হার রেকর্ড করা হয়েছে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর ঘেরা জেলা সুনামগঞ্জে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্কুলগুলোতে মানসম্মত শিক্ষক ও শিক্ষা উপকরণের তীব্র সংকট, নিয়মিত ক্লাসের অভাব এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার দূরবস্থার কারণে সুনামগঞ্জের শিক্ষার্থীরা বারবার পিছিয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন স্থানীয় শিক্ষাবিদরা। পাসের হারের এই তারতম্য প্রমাণ করে যে আঞ্চলিক বৈষম্য দূর না করলে সামগ্রিক শিক্ষার মানোন্নয়ন কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
বিগত বছরগুলোর ঐতিহাসিক ধারা পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, সিলেট শিক্ষা বোর্ডের ফলাফল কখনোই খুব একটা সন্তোষজনক জায়গায় স্থির ছিল না, বরং এটি বরাবরই একটা নির্দিষ্ট সীমারেখার মধ্যে ওঠানামা করেছে। বিগত ২০২৪ সালের ৭৩ দশমিক ৩৫ শতাংশের গৌরবোজ্জ্বল পাসের হার থেকে নেমে এসে ২০২৫ সালে তা ৬৮ দশমিক ৫৭ শতাংশে এসে ঠেকেছিল। আর চলতি বছরের ফলাফল সেই নিম্নমুখী ধারাকে আরও ত্বরান্বিত করে সরাসরি ৫৮ দশমিক ৩৩ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। পাসের হার এভাবে প্রতিবছর ধাপে ধাপে কমে যাওয়ার অর্থ দাঁড়াল আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ভিত দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ছে। করোনার পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি পূরণে যেসব পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ছিল, তার সঠিক বাস্তবায়ন না হওয়াই এই বিপর্যয়ের অন্যতম প্রধান কারণ বলে মনে করছেন বিশারদরা।
অকৃতকার্য হওয়া এই বিশাল সংখ্যক শিক্ষার্থীর জীবন নিয়ে এখন তৈরি হয়েছে এক চরম অনিশ্চয়তা। ফল প্রকাশের পর থেকেই হাজার হাজার শিক্ষার্থীর বাড়িঘরে নেমে এসেছে কান্নার রোল। যে তরুণ বয়সটায় তাদের দুরন্তপনায় মুখরিত থাকার কথা, আজ সেই বয়সেই তাদের জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষায় ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে ঘরের কোণে বসে থাকতে হচ্ছে। অনেক শিক্ষার্থী হয়তো এই ধাক্কা সামলে পুনরায় প্রস্তুতি নেওয়ার সাহস পাবে, কিন্তু অর্থাভাব কিংবা সামাজিক চাপের কারণে অনেকের পক্ষেই পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না। ঝরে পড়ার এই উচ্চ হার আমাদের জাতীয় প্রগতির পথে একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। শিক্ষার এই ভঙ্গুর দশার স্থায়ী প্রতিকার না করলে আগামী দিনের প্রজন্ম এক অন্ধকার সংকটের মুখে পতিত হবে।
শিক্ষাতাত্ত্বিক ও সামাজিক বিশ্লেষকরা অত্যন্ত জোরের সঙ্গে বলছেন যে, সিলেটে এসএসসির ফলাফলে প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থীর ফেল করার এই মর্মান্তিক ঘটনাকে কোনোভাবেই হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। এটি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি ত্রুটি, তদারকির অভাব এবং পাঠদান পদ্ধতির চরম ব্যর্থতার এক কঠিন দলিল। কেবল পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন হতাশা প্রকাশ করা কিংবা দায়সারা বক্তব্য দেওয়াই যথেষ্ট নয়; বরং এর পেছনে লুকিয়ে থাকা মূল শেকড়গুলো খুঁজে বের করতে হবে। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসম্মত শিক্ষকের উপস্থিতি নিশ্চিত করা, কোচিং বাণিজ্য রোধ করে ক্লাসরুমের শিক্ষাকে আকর্ষণীয় করা এবং শিক্ষার্থীদের নিয়মিত কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা এখন সময়ের সবচেয়ে জোরালো দাবি। অন্যথায় আগামী দিনে এই পাসের হার আরও নিচে নেমে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে যাবে, যা কোনোভাবেই একটি জাতির জন্য কাম্য হতে পারে না।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

এশিয়া থেকে সরছে না যুক্তরাষ্ট্র, আরও শক্ত অবস্থানে পেন্টাগন

প্রকাশ:১০ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের...

সালমান শাহ হত্যা মামলা: ডন গ্রেফতার ও নতুন তথ্য

প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ভারতের গোয়েন্দা প্রধান পরাগ জৈন ঢাকায়

প্রকাশ: ১০ আগস্ট  ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

গোবিন্দর আত্মহত্যার চেষ্টার পেছনের অজানা গল্প

প্রকাশ: ১০ অগাস্ট  ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

লালাবাজারে বাস-ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ১

প্রকাশ: ১০ অগাস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিষয়বস্তু

এশিয়া থেকে সরছে না যুক্তরাষ্ট্র, আরও শক্ত অবস্থানে পেন্টাগন

প্রকাশ:১০ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের...

সালমান শাহ হত্যা মামলা: ডন গ্রেফতার ও নতুন তথ্য

প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ভারতের গোয়েন্দা প্রধান পরাগ জৈন ঢাকায়

প্রকাশ: ১০ আগস্ট  ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

গোবিন্দর আত্মহত্যার চেষ্টার পেছনের অজানা গল্প

প্রকাশ: ১০ অগাস্ট  ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

লালাবাজারে বাস-ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ১

প্রকাশ: ১০ অগাস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনারের সাক্ষাৎ

প্রকাশ:১০ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের...

সিলেট-ঢাকা রুটে আকাশছোঁয়া বিমানভাড়া নিয়ন্ত্রণ জরুরি

প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ডিএমপিতে রদবদল, ৭ এডিসি ও এসি পদে নতুন দায়িত্ব

প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ