প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
দেশের তৃণমূল পর্যায়ে গণতান্ত্রিক ধারা সুসংহত করতে এবং স্থানীয় সরকার কাঠামোর স্থবিরতা কাটাতে নির্বাচন কমিশন (ইসি) এক কর্মযজ্ঞ শুরু করেছে। দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আগামী অক্টোবর মাস থেকে ধাপে ধাপে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু করার প্রস্তুতি নিয়েছে ইসি। এই নির্বাচন প্রক্রিয়া কেবল একটি সাংবিধানিক দায়িত্বই নয়, বরং এটি স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়ন ও সুশাসনের চাকা সচল করার ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানিয়েছেন, সরকারের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সমন্বয় করে আগামী এক থেকে দেড় মাসের মধ্যেই নির্বাচন আয়োজনের চূড়ান্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন করা সম্ভব। কমিশনের লক্ষ্য হলো, একটি অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের হাতে দায়িত্ব অর্পণ করা।
নির্বাচন কমিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, নির্বাচনের প্রথম ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। উপজেলা পরিষদ গঠনের ক্ষেত্রে ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা নির্বাচনের ফলাফল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হওয়ায় এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। দেশের প্রশাসনিক কাঠামো ও ভৌগোলিক বাস্তবতার দিকে নজর রেখে কমিশন এই অগ্রাধিকার তালিকা তৈরি করছে। তবে নির্বাচন অনুষ্ঠানের তারিখ নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষা, ধর্মীয় উৎসব, বর্ষা মৌসুম এবং স্থানীয় যোগাযোগ পরিস্থিতির মতো বিষয়গুলোকে কমিশন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। দেশের প্রতিটি অঞ্চল যেন উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচনে অংশ নিতে পারে, সে লক্ষ্যে কমিশন সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে তফসিল ঘোষণা করবে বলে জানানো হয়েছে।
বর্তমানে দেশের সাড়ে ৪ হাজারের বেশি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য প্রস্তুত রয়েছে। কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, প্রতিটি স্তরের নির্বাচন সম্পন্ন করতে প্রায় এক বছর সময়ের প্রয়োজন হতে পারে। এই দীর্ঘ সময়ে ধাপে ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ ও সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন সম্পন্ন করা হবে। নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানিয়েছেন যে, নির্বাচন আয়োজনের জন্য আইন, বিধিমালা ও আচরণবিধি সংশোধনের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে আচরণবিধির খসড়া ইতিমধ্যে কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে এবং রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যমের কাছ থেকে মতামত আহ্বান করা হয়েছে। সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ও মতামতের ভিত্তিতে বিধিমালায় প্রয়োজনীয় সংযোজন ও বিয়োজন করা হবে।
আসন্ন নির্বাচনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থীদের জামানতের পরিমাণ বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। তবে বড় পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছে ইভিএম বর্জনের ঘোষণা; অর্থাৎ এবারের নির্বাচনে কোনো ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন ব্যবহার করা হবে না। এছাড়া পোস্টাল ব্যালট এবং জাতীয় নির্বাচনের মতো পোস্টার ব্যবহারের সুযোগও থাকছে না বলে জানা গেছে। এই নতুন বিধিমালা প্রার্থীদের জন্য যেমন চ্যালেঞ্জিং, তেমনি নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিশ্চিতেও সহায়ক হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অনলাইনে মনোনয়ন পত্র জমা দেওয়ার সুযোগ থাকছে না, যা প্রথাগত নির্বাচনী আমেজ বজায় রাখার একটি ইঙ্গিত বলে অনেকেই মনে করছেন।
নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কমিশন বিশেষ নিরাপত্তা পরিকল্পনা সাজাচ্ছে। পুলিশ, বিজিবি ও আনসার সদস্যদের সমন্বয়ে প্রতিটি ধাপের নির্বাচন পরিচালনা করা হবে। যেহেতু স্থানীয় সরকার নির্বাচন অঞ্চলভিত্তিক অনুষ্ঠিত হবে, তাই প্রতিটি ধাপের অভিজ্ঞতার আলোকে পরবর্তী পর্যায়ের নিরাপত্তা কৌশল ঢেলে সাজানো হবে। অতীতে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনগুলোতে স্থানীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে সংঘাত ও সহিংসতার ইতিহাস রয়েছে। কমিশন এবার সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সহিংসতা কমিয়ে আনতে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছে। সব ধরনের বিশৃঙ্খলা এড়িয়ে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটগ্রহণ নিশ্চিত করা কমিশনের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে কমিশনার মাছউদ বলেন, ওই নির্বাচন দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষক এবং গণমাধ্যমের দৃষ্টিতে অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য ছিল। স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও সেই একই মানদণ্ড বজায় রাখতে কমিশন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে সফল নির্বাচনের জন্য কেবল কমিশনের ইচ্ছা যথেষ্ট নয়, বরং রাজনৈতিক দল, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গণমাধ্যম ও ভোটারদের সক্রিয় সহযোগিতা প্রয়োজন। প্রতিটি স্টেকহোল্ডারের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দিতে। সম্প্রতি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও সংসদে এ বিষয়ে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছেন। তিনি নিশ্চিত করেছেন যে, সরকার নির্বাচন কমিশনের প্রতিটি উদ্যোগের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে প্রস্তুত।
অক্টোবর থেকে শুরু হতে যাওয়া এই নির্বাচন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে নেতৃত্বের সংকট নিরসনের পাশাপাশি উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর পথ প্রশস্ত হবে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন কেবল জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের মাধ্যম নয়, এটি স্থানীয় মানুষের অধিকার ও ক্ষমতার মূল ভিত্তি। একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রত্যাশা এখন সারা দেশের মানুষের হৃদয়ে। কমিশন যদি তাদের প্রতিশ্রুত রোডম্যাপ অনুযায়ী নির্বাচন আয়োজন করতে পারে, তবে তা দেশের গণতন্ত্রের জন্য একটি বড় জয় হিসেবে চিহ্নিত হবে। প্রতিটি ভোটার তার ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে তাদের কাঙ্ক্ষিত প্রতিনিধি নির্বাচন করবে এবং এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই গড়ে উঠবে আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।
নির্বাচনী আমেজ শুরুর আগে কমিশনের এই আগাম বার্তা দেশের রাজনীতিতে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরিয়ে এনেছে। রাজনৈতিক দলগুলোও এখন স্থানীয় পর্যায়ে নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি প্রদর্শনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সব মিলিয়ে আগামী এক বছর দেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় হতে যাচ্ছে। নির্বাচন কমিশন নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের লক্ষ্য অর্জনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সাধারণ ভোটারদের আশা, কোনো প্রভাবমুক্ত পরিবেশে তারা ভোট দিয়ে এলাকার উন্নয়নের জন্য দক্ষ ও সৎ প্রতিনিধি বেছে নিতে পারবেন। স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে এখন থেকেই প্রতিটি গ্রামে ও নগরে শুরু হয়েছে নানা জল্পনা-কল্পনা, আর সেই জল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এই আসন্ন নির্বাচনী উৎসব।

