প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের পর্যটন কেন্দ্র জাফলংয়ের হাতছানি আর পরীক্ষা শেষের আনন্দ—এই দুইয়ের মিশেলে তিন বন্ধুর একটি বিকেল কাটানোর পরিকল্পনা যে এভাবে মৃত্যুর মিছিলে পরিণত হবে, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। পরীক্ষার ক্লান্তি ঝরিয়ে একটু প্রশান্তির খোঁজে বের হওয়া সেই তিন সহপাঠী আর বাড়ি ফিরল না। রোববার দুপুরে গোয়াইনঘাট উপজেলার মধ্য জাফলং ইউনিয়নের রাধানগর-বাউরভাগ চা-বাগান সড়কে ঘটা এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে তিনটি উদীয়মান প্রাণ। এই হৃদয়বিদারক ঘটনায় পুরো সিলেট অঞ্চল শোকের চাদরে ঢাকা পড়েছে। যে বয়সে বই-খাতা আর স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে থাকার কথা, সেই বয়সেই সড়ক দুর্ঘটনা কেড়ে নিল সাকিব, রাহুল ও জয়ের মতো তিন কিশোরের প্রাণ।
ঘটনার দিনটি ছিল অন্যরকম এক আনন্দের। পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর তিন বন্ধু মিলে একটি পালসার মোটরসাইকেলে চড়ে জাফলংয়ের সবুজে ঘেরা চা-বাগান এলাকায় ঘুরতে গিয়েছিল। কিশোর বয়সের উদ্দামতা আর গতির প্রতি আকর্ষণ—সব মিলিয়ে তারা ছিল উচ্ছ্বাসে ভরপুর। কিন্তু ফেরার পথে নিয়তি তাদের জন্য সাজিয়ে রেখেছিল এক করুণ পরিণতি। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, মোটরসাইকেলটি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে চলন্ত অবস্থায় রাধানগর-বাউরভাগ চা-বাগান সড়কের এক বাঁকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। চোখের পলকেই মোটরসাইকেলটি রাস্তার পাশের একটি বিশাল গাছের সাথে সজোরে ধাক্কা খায়। সংঘর্ষের তীব্রতা এতটাই প্রকট ছিল যে, মোটরসাইকেলটি দুমড়ে-মুচড়ে রাস্তার ওপর পড়ে যায়।
দুর্ঘটনার পরপরই স্থানীয়রা ছুটে আসেন উদ্ধারের জন্য। সাকিব আহমদ ঘটনাস্থলেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। তার নিথর দেহটি দেখে স্থানীয় লোকজনের আর্তনাদ আকাশ-বাতাস ভারী করে তোলে। বাকি দুই বন্ধু রায়হান আহমেদ ওরফে রাহুল এবং জয়কে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে দ্রুত সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ ও নূরজাহান হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসক ও নার্সরা তাদের জীবন বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু আঘাতের গভীরতা ছিল সহ্যক্ষমতার বাইরে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গভীর রাতে একে একে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে রাহুল ও জয়। তিন বন্ধুর এই অকাল বিদায়ে তাদের পরিবার ও সহপাঠীদের হৃদয়ে তৈরি হয়েছে এমন এক ক্ষত, যা কোনোদিন শুকোবার নয়।
নিহত তিন কিশোরই ছিল একই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তাদের মৃত্যুতে বিদ্যালয়ের আঙিনায় নেমে এসেছে এক নিস্তব্ধতা। শিক্ষকদের মুখে কোনো কথা নেই, সহপাঠীরা তাদের প্রিয় বন্ধুদের শূন্যতা কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। পরিবারগুলোর অবস্থা হয়েছে আরও শোচনীয়। সাকিবের মৃত্যুতে তার পরিবার পাথর হয়ে গেছে। অন্যদিকে, ছৈলাখেল গ্রামের হাবিবুর রহমানের ছেলে রাহুল এবং লাখেরপাড় গ্রামের রাজ্জাক মিয়ার ছেলে জয়ের বাড়িতে এখন চলছে কান্নার রোল। ঈদের আনন্দের মতো উৎসবের দিনগুলোতে যে বাড়িতে হইচই থাকার কথা ছিল, সেই বাড়িতে এখন শোকের মাতম। মা-বাবার কোল খালি করে তাদের প্রিয় সন্তানরা চলে গেছে না ফেরার দেশে।
গোয়াইনঘাট থানার অফিসার ইনচার্জ মো. ওমর ফারুক এই মর্মান্তিক ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, পুলিশের পক্ষ থেকে দুর্ঘটনার যাবতীয় আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হচ্ছে। এই ধরনের অকাল মৃত্যু সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক বিশাল সতর্কবার্তা। কেন একটি মোটরসাইকেলে তিন বন্ধু আরোহী হয়ে এবং এত দ্রুতগতিতে পথ চলল, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। কিশোর বয়সের আবেগ আর গতির নেশা যে কত বড় বিপদের কারণ হতে পারে, এই দুর্ঘটনাটি তার এক নির্মম উদাহরণ। অভিভাবক সচেতনতা এবং কিশোরদের মানসিক বিকাশের ক্ষেত্রে গতির চেয়ে জীবনের নিরাপত্তা যে বড়—সেটি প্রতিটি পরিবারকে বুঝতে হবে।
রাস্তাঘাটে অপ্রাপ্তবয়স্কদের মোটরসাইকেল চালানো, বৈধ লাইসেন্স ও হেলমেটবিহীন চলাচল বর্তমানে এক জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে পর্যটন এলাকাগুলোতে কিশোর ও তরুণদের এই বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানোর প্রবণতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। জাফলংয়ের মতো এলাকায় পর্যটকদের ভিড় থাকায় অনেক সময় গতির নিয়ন্ত্রণ রাখা সম্ভব হয় না। রাস্তাগুলো সংকীর্ণ হওয়ার পাশাপাশি ঘন ঘন বাঁক থাকার কারণে যেকোনো ভুল পদক্ষেপ ডেকে আনতে পারে মৃত্যু। এই তিন কিশোরের মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, নিয়ম না মানলে সড়ক কখনোই কাউকে ক্ষমা করে না।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত তদারকি থাকলেও তা অনেক সময় যথেষ্ট হয়ে ওঠে না। প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পরিবারকে তাদের সন্তানদের চলাফেরা ও গতির প্রতি বাড়তি নজর দিতে হবে। আজকের এই শোকের দিনটি আমাদের যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, একটুখানি অসাবধানতা আর গতির উন্মাদনা কেড়ে নিতে পারে পরিবারের ভবিষ্যৎ। নিহত তিন কিশোরের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে ও তাদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে আমরা বলতে চাই, যেন আর কোনো কিশোরকে এভাবে রাস্তায় ঝরে পড়তে না হয়। প্রতিটি জীবনের মূল্য অপরিসীম, সেই জীবন রক্ষার দায়িত্ব আমাদের সবার।
পরিশেষে বলা যায়, সাকিব, রাহুল ও জয় আমাদের মাঝে আর ফিরে আসবে না। তাদের হাসি, তাদের পরীক্ষা শেষের আনন্দটুকু স্মৃতির পাতায় ধুলো জমিয়ে পড়ে থাকবে। তাদের এই অকাল প্রয়াণ আমাদের হৃদয়ে দাগ রেখে গেল। আমরা মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন এই তিন কিশোরের বিদেহী আত্মার শান্তি দান করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোকে এই গভীর শোক সহ্য করার শক্তি দেন। সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক প্রতিটি পথে, প্রতিটি যাত্রায়—এই প্রত্যাশা আজ সবার। তাদের মৃত্যু আমাদের সচেতন করার পাশাপাশি এক গভীর বেদনার শিক্ষা দিয়ে গেল, যা আমাদের চিরকাল মনে রাখতে হবে।


