প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
ফুটবল বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে কাঁদিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নিল নরওয়ে। নিউ জার্সিতে অনুষ্ঠিত রাউন্ড অব সিক্সটিনের এই স্নায়ুচাপের ম্যাচে আর্লিং হালান্ডের জোড়া গোলে ব্রাজিলকে ২-১ ব্যবধানে পরাজিত করে ইতিহাস গড়ল নরওয়ে। অথচ পুরো ম্যাচে বলের দখল এবং আক্রমণে ব্রাজিল দাপট দেখালেও গোলের সুযোগ কাজে লাগাতে না পারার চড়া মাশুল দিতে হয়েছে তাদের। নরওয়ের এই ঐতিহাসিক জয় কেবল একটি ম্যাচের জয় নয়, এটি বিশ্ব ফুটবলের মানচিত্রে নতুন শক্তির উত্থানেরও ইঙ্গিত। ব্রাজিলের বিদায় নিশ্চিত হওয়ার পর মাঠে থাকা হলুদ জার্সিধারীদের কান্নায় আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল, যা ফুটবলপ্রেমীদের মনে দীর্ঘকাল গেঁথে থাকবে।
ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দলই আক্রমণাত্মক মেজাজে খেলতে শুরু করেছিল। খেলার মাত্র ৪ মিনিটের মাথায় নরওয়ে যখন বল জালে জড়িয়ে ফেলে, তখন পুরো স্টেডিয়াম স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। তবে ভিএআর প্রযুক্তির সাহায্যে সেই গোলটি অফসাইডের কারণে বাতিল হলে ব্রাজিল শিবির কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। কিন্তু ওই গোল বাতিল হওয়ার পরই ব্রাজিল বুঝতে পেরেছিল যে, নরওয়ে কোনো সাধারণ প্রতিপক্ষ নয়। খেলার ১৪ মিনিটে ম্যাচে এগিয়ে যাওয়ার বড় সুযোগ এসেছিল ব্রাজিলের সামনে। বক্সের ভেতর মাতেউস কুনিয়াকে নরওয়ের ডিফেন্ডার ক্রিস্টোফার আয়ের স্লাইডিং ট্যাকল করলে রেফারি ভিএআর যাচাই করে পেনাল্টির বাঁশি বাজান। কিন্তু ব্রুনো গিমারেসের নেওয়া সেই শট নরওয়ের গোলরক্ষক ওরইয়ান নিল্যান্ড দারুণ ক্ষিপ্রতায় ঠেকিয়ে দিলে ব্রাজিলের জয়ের পথে বড় বাধার সৃষ্টি হয়। এই পেনাল্টি মিসের অনাকাঙ্ক্ষিত রেকর্ডটি যেন ব্রাজিলের ভাগ্যে বিপর্যয় ডেকে আনারই পূর্বাভাস ছিল।
প্রথমার্ধ জুড়ে ব্রাজিল গোল করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল। ৪০ মিনিটে ভিনিসিয়াস জুনিয়রের একটি জোরালো শট গোলরক্ষক নিল্যান্ড পা দিয়ে সেভ না করলে ম্যাচের ফল ভিন্ন হতে পারত। বিপরীতে প্রথমার্ধের শেষদিকে নরওয়ের অধিনায়ক মার্টিন অডেগার্ডের দূরপাল্লার একটি শট গোলরক্ষক আলিসন ঝাঁপিয়ে পড়ে ঠেকিয়ে না দিলে ব্রাজিল পিছিয়ে পড়ত। গোলশূন্য সমতায় বিরতিতে যাওয়ার পর দুই দলই তাদের কৌশলে পরিবর্তন আনে। দ্বিতীয়ার্ধে ব্রাজিল কোচ এনদ্রিককে মাঠে নামিয়ে আক্রমণভাগে নতুন প্রাণের সঞ্চার করতে চেয়েছিলেন। ৬০ মিনিটে ভিনিসিয়াসের দারুণ পাসে গোলরক্ষককে একা পেয়েও এনদ্রিক যেভাবে গোল মিস করেন, তাতে ব্রাজিলের সমর্থকরা হতাশায় ভেঙে পড়েন। যেন গোল করার সব পথ আজ ব্রাজিলের জন্য বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
ম্যাচের ধারার বিপরীতে ৭৯ মিনিটে সেই মাহেন্দ্রক্ষণটি আসে। অসাধারণ এক হেডে বল জালে জড়িয়ে নরওয়েকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন নরওয়েজিয়ান গোলমেশিন আর্লিং হালান্ড। গ্যালারিতে উপস্থিত থাকা নরওয়ের সমর্থকরা তখন উল্লাসে ফেটে পড়েন। গোল খাওয়ার পর ব্রাজিল কোচ দ্রুত নেইমার জুনিয়রকে মাঠে নামান। কিন্তু নেইমারের উপস্থিতি নরওয়ের শক্তিশালী রক্ষণভাগকে খুব একটা টলাতে পারেনি। বরং ম্যাচের শেষ দিকে পাল্টা আক্রমণে হালান্ড নিজের ও দলের দ্বিতীয় গোলটি করে ব্রাজিলের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেন। চলতি বিশ্বকাপে এটি ছিল হালান্ডের সপ্তম গোল, যা তাকে লিওনেল মেসি ও কিলিয়ান এমবাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ডের সমকক্ষে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
ম্যাচ যখন ২-০ ব্যবধানে পিছিয়ে, তখন ব্রাজিলের বিদায় প্রায় নিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। তবুও শেষ মুহূর্তে নেইমার জুনিয়র একটি গোল করে ব্যবধান কমালেও তা কেবল সান্ত্বনাই হয়ে থেকেছে। শেষ পর্যন্ত ১-২ ব্যবধানে ম্যাচ হেরে ব্রাজিল বিদায় নেয়, আর নতুন ইতিহাস লিখে কোয়ার্টার ফাইনালে নাম লেখায় নরওয়ে। আর্লিং হালান্ড এই ম্যাচে যে দাপট দেখিয়েছেন, তাতে তিনি প্রমাণ করেছেন কেন তিনি বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার। তাঁর ক্ষিপ্রতা, উচ্চতা এবং গোল করার সহজাত ক্ষমতা ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্ডারদের সারাক্ষণ চাপে রেখেছিল। অন্যদিকে, ব্রাজিলিয়ান গোলরক্ষক আলিসন কয়েকবার দারুণ সেভ করলেও হালান্ডের নিখুঁত হেডের কাছে তিনি পরাস্ত হয়েছিলেন।
ফুটবল ইতিহাসে এটি একটি অবিস্মরণীয় ম্যাচ হয়ে থাকবে। পাঁচবারের চ্যাম্পিয়নদের এভাবে বিদায় নেওয়াটা অনেকের কাছেই অকল্পনীয়। কিন্তু ফুটবলের মাঠে ইতিহাস গড়তে শক্তির চেয়েও অনেক সময় সঠিক সময়ের সঠিক সিদ্ধান্ত এবং গোল করার দক্ষতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। নরওয়ে ঠিক সেই কাজটিই করেছে। হালান্ডের একক নৈপুণ্য এবং পুরো দলের সুশৃঙ্খল রক্ষণভাগ ব্রাজিলকে গোল থেকে বঞ্চিত রেখেছে। আজকের এই হার থেকে ব্রাজিলকে নতুন করে ভাবতে হবে। তাদের রক্ষণভাগ এবং আক্রমণভাগের সমন্বয়হীনতা এই ম্যাচে প্রকটভাবে দেখা গেছে। বিশেষ করে পেনাল্টি মিস করাটা ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।
ব্রাজিলের বিদায়ের পর ভক্ত-সমর্থকদের মধ্যে তীব্র হতাশা ছড়িয়ে পড়েছে। তবে নরওয়ের ঐতিহাসিক জয়ে বিশ্ব ফুটবল এক নতুন চ্যাম্পিয়নের অপেক্ষায় দিন গুনছে। কোয়ার্টার ফাইনালে হালান্ডের নরওয়ে কার মুখোমুখি হয়, তা দেখার জন্য এখন ফুটবল বিশ্ব উদগ্রীব। হালান্ডের ফর্ম যদি এভাবেই অব্যাহত থাকে, তবে নরওয়ে বিশ্বকাপের নতুন চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্নও দেখতে পারে। আজকের দিনটি ব্রাজিলের জন্য শোকের, কিন্তু নরওয়ের জন্য এক অবিশ্বাস্য আনন্দের। খেলাধুলার এই অনির্শ্চিত পথচলাই তো ফুটবলের সৌন্দর্য। একটি শক্তিশালী সাম্রাজ্যের পতন আর নতুন এক শক্তির উত্থান—বিশ্বকাপের মঞ্চ থেকে ঠিক এই গল্পটিই আমাদের প্রতিদিন উপহার দেয়। বিদায় ব্রাজিল, স্বাগত নরওয়ে—এটাই আজকের ফুটবলের কঠিন সত্য।


