স্ত্রীকে হত্যার পর মাটিচাপা: জিডি করতে গিয়ে স্বামী আটক

প্রকাশ: ০৬ জুলাই  ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।

পারিবারিক কলহ যে কতটা ভয়াবহ ও নিষ্ঠুর পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে পারে, তার এক মর্মান্তিক ও লোমহর্ষক উদাহরণ সৃষ্টি হয়েছে মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলায়। স্ত্রীকে হত্যার পর বাড়ির পাশে মাটিচাপা দিয়ে দীর্ঘ বিশ দিন ধরে নিখোঁজের নাটক সাজিয়েছিলেন ঘাতক স্বামী আলমগীর। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি তার। নিজের সাজানো নাটককে পূর্ণতা দিতে যখন পুলিশের কাছে গিয়ে সাধারণ ডায়েরি বা জিডি করতে যান, তখনই তার অসংলগ্ন কথাবার্তা ও সন্দেহজনক আচরণ পুলিশের কাছে ধরা পড়ে। জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে বেরিয়ে আসে হত্যাকাণ্ডের বীভৎস সব তথ্য। সোমবার সকালে পুলিশ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে মাটি খুঁড়ে গৃহবধূ জায়েদা আক্তারের মরদেহ উদ্ধার করে, যা পুরো এলাকাকে শোকস্তব্ধ ও বিস্মিত করে তুলেছে।

নিহত জায়েদা আক্তার রাজনগর উপজেলার সোনাটিকি গ্রামের হান্নান মিয়ার মেয়ে ছিলেন। তার স্বামী আলমগীর হোসেন একই উপজেলার মুন্সিবাজার ইউনিয়নের করিমপুর গ্রামের বাসিন্দা। পারিবারিক কলহ থেকেই এই হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ। গত বিশ দিন আগে পারিবারিক কোনো এক তুচ্ছ ঘটনার জেরে স্বামী আলমগীর তার স্ত্রীকে নির্মমভাবে হত্যা করেন। এরপর ঘটনাটি আড়াল করতে তিনি ঘরের কাছেই গর্ত খুঁড়ে জায়েদার নিথর দেহ মাটিচাপা দিয়ে রাখেন। নিহতের স্বজনরা যখন জায়েদাকে খুঁজে পাচ্ছিলেন না, তখন আলমগীর কৌশলে প্রচার করে দেন যে তার স্ত্রী হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে গেছেন। দীর্ঘ প্রায় তিন সপ্তাহ মেয়েকে না পেয়ে জায়েদার পরিবার বারবার আলমগীরের কাছে খোঁজ নিতে যান, কিন্তু প্রতিবারই তিনি তাদের ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করেছেন।

আলমগীরের এই নিখোঁজের নাটক যেন ছিল এক নিখুঁত অভিনয়। কিন্তু অপরাধ করার পর অপরাধী যখন নিজে থেকেই আইনশৃংখলা বাহিনীর কাছে ধরা দিতে আসে, তখন তার সেই অপচেষ্টা ব্যর্থ হতে বাধ্য। সোমবার জিডি করার উদ্দেশ্যে রাজনগর থানায় উপস্থিত হয়ে পুলিশের সামনে তিনি যখন নিখোঁজ হওয়ার বর্ণনা দিচ্ছিলেন, তখন তার চোখেমুখে ছিল অস্বস্তি ও অসংলগ্নতা। পুলিশের অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এড়াতে পারেননি আলমগীর। জিডিতে উল্লেখ করা তথ্যের সঙ্গে তার মৌখিক বর্ণনার অমিল পাওয়ায় পুলিশ তাকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় নিয়ে আসে। দীর্ঘক্ষণ জেরার পর অবশেষে তিনি ভেঙে পড়েন এবং স্ত্রীকে হত্যার লোমহর্ষক বর্ণনা দেন। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই পুলিশ করিমপুর গ্রামের ওই বাড়ির অদূরে অভিযান পরিচালনা করে মরদেহ উদ্ধার করে।

মরদেহ উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়লে ওই এলাকায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়। শত শত গ্রামবাসী ঘটনাস্থলে ভিড় করেন। যখন মাটি খুঁড়ে জায়েদার মরদেহ বের করে আনা হয়, তখন উপস্থিত মানুষের মধ্যে কান্নার রোল পড়ে যায়। এমন নিষ্ঠুর ও পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড এলাকাবাসী কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না। জায়েদার বাবা-মা ও আত্মীয়রা শোকে পাথর হয়ে গেছেন। তাদের একটাই দাবি, মেয়েকে হত্যার জন্য যারা দায়ী, তাদের যেন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হয়। একটি জীবন, একটি স্বপ্ন এবং একটি সংসার এভাবে অকালে শেষ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি কোনোভাবেই মেনে নেওয়ার মতো নয়। হত্যাকাণ্ডের পর যেভাবে দীর্ঘ বিশ দিন মরদেহ ঘরের পাশে চাপা দিয়ে রাখা হয়েছিল, তা মানবিকতাকেও হার মানিয়েছে।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ময়নাতদন্তের জন্য উদ্ধারকৃত মরদেহ মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। মরদেহের অবশিষ্টাংশ থেকে প্রকৃত মৃত্যুর কারণ এবং ঘটনার আরো কোনো আলামত পাওয়া যায় কি না, তা নিয়ে কাজ করছেন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা। রাজনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. ফরিদ উদ্দিন আহমদ ভূঁইয়া এই হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহতা স্বীকার করে বলেন, ঘাতক আলমগীরকে ইতিমধ্যে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত রয়েছে কি না, তা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একটি হত্যা মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে ঘটনার চার্জশিট দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে পুলিশ।

এই ঘটনাটি আমাদের সমাজ ও পরিবার ব্যবস্থার অস্থিরতার দিকে আবারও আঙুল তুলছে। পারিবারিক দ্বন্দ্ব কেন চরম আকার ধারণ করে এবং সেই দ্বন্দ্ব মেটানোর জন্য কেন প্রাণ কেড়ে নেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত নিতে হয়—তা এক বিরাট প্রশ্ন। জায়েদার মতো একজন গৃহবধূকে স্বামীর হাতে এভাবে প্রাণ দিতে হবে, তা কেউ ভাবতেও পারেনি। সমাজ থেকে এ ধরনের বিকৃত ও অপরাধপ্রবণ মানসিকতা দূর করতে হলে আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি পারিবারিক মূল্যবোধ ও সচেতনতা বাড়ানো ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। একজন মানুষের জীবনের নিরাপত্তা যেখানে ঘরের ভেতরেই নেই, সেখানে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পরিশেষে বলা যায়, জায়েদা আক্তারের মৃত্যু কেবল একটি হত্যাকাণ্ড নয়, এটি মানবিক সম্পর্কের এক চরম ধসের প্রতিফলন। জিডি করার নাটকের মাধ্যমে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের চেষ্টা ছিল একজন অপরাধীর চরম ধৃষ্টতা। আশা করা যাচ্ছে, আইনের হাত থেকে এই খুনি কোনোভাবেই ছাড় পাবে না। ময়মনসিংহের এই নৃশংসতা যাতে দেশের অন্য কোনো প্রান্তে যেন আর না ঘটে, সে জন্য সমাজকেও সোচ্চার হতে হবে। অপরাধী আলমগীরের ফাঁসির দাবি এখন নিহতের স্বজন ও এলাকাবাসীর কণ্ঠে উচ্চারিত হচ্ছে। ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে পুরো এলাকা, যাতে জায়েদার আত্মা শান্তি পায় এবং ভবিষ্যতে অপরাধ করার সাহস যেন আর কেউ না দেখায়। শোকের এই মাতম যেন শেষ পর্যন্ত বিচারিক সাফল্যের মধ্য দিয়ে শেষ হয়, এটাই এখন সকলের প্রত্যাশা।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

অক্টোবরে শুরু স্থানীয় সরকার নির্বাচন: প্রস্তুতি চূড়ান্ত

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ভারী বর্ষণে বন্যা আতঙ্ক: সতর্কতায় সিলেট ও চট্টগ্রাম

প্রকাশ: ০৬ জুলাই  ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

মানবাধিকার রক্ষায় হাসনাইন আব্দুল করিম খানকে সংবর্ধনা

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

জাফলং ভ্রমণে গিয়ে প্রাণ গেল তিন স্কুলছাত্রের

প্রকাশ: ০৬ জুলাই  ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সুনামগঞ্জের মাইজবাড়ি: নৌকা তৈরির ঐতিহ্যবাহী গ্রাম

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিষয়বস্তু

অক্টোবরে শুরু স্থানীয় সরকার নির্বাচন: প্রস্তুতি চূড়ান্ত

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ভারী বর্ষণে বন্যা আতঙ্ক: সতর্কতায় সিলেট ও চট্টগ্রাম

প্রকাশ: ০৬ জুলাই  ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

মানবাধিকার রক্ষায় হাসনাইন আব্দুল করিম খানকে সংবর্ধনা

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

জাফলং ভ্রমণে গিয়ে প্রাণ গেল তিন স্কুলছাত্রের

প্রকাশ: ০৬ জুলাই  ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সুনামগঞ্জের মাইজবাড়ি: নৌকা তৈরির ঐতিহ্যবাহী গ্রাম

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

রাস্তার পাশে মিলল স্যালাইন লাগানো নবজাতক

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

হালান্ড-ঝড়ে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিল ব্রাজিল

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

পর্তুগালে সড়ক দুর্ঘটনায় সিলেটের যুবকের মৃত্যু

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ