প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
পৃথিবীর আলো দেখার কয়েক ঘণ্টা পরেই যে শিশুটির পাওয়ার কথা ছিল অকৃত্রিম মমতা ও ভালোবাসা, সেই নিষ্পাপ নবজাতককেই কিনা ফেলে রাখা হলো রাস্তার ধারের ঝোপঝাড়ে। এক চরম মানবিক বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটেছে হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার উত্তর শাহপুর এলাকায়। সোমবার ভোরের আলো ফোটার আগে শায়েস্তাগঞ্জ-জগদীশপুর জেলা পরিষদ সড়কের পাশে পরিত্যাক্ত অবস্থায় পাওয়া যায় এক নবজাতক কন্যাশিশুকে। শিশুটির শরীরে তখনো স্যালাইন লাগানো ছিল, যা ইঙ্গিত দেয় যে, জন্ম নেওয়ার পর থেকেই হয়তো তাকে কোনো হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল। কে বা কারা এমন নির্মমতার আশ্রয় নিয়ে এই শিশুকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিল, তা নিয়ে এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে তীব্র চাঞ্চল্য এবং ক্ষোভ।
সকালে পথচারীরা যখন ওই রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন শিশুটির কান্নার শব্দ তাদের কানে ভেসে আসে। স্থানীয় লোকজন দ্রুত এগিয়ে গিয়ে দেখেন, রাস্তার পাশে অত্যন্ত অসহায় অবস্থায় পড়ে আছে শিশুটি। কনকনে ঠান্ডায় বা বৈরী পরিবেশে শিশুটি যেভাবে টিকে ছিল, তা যেন এক অলৌকিক ঘটনা। নবজাতকের শরীরে লাগানো স্যালাইনের নলগুলো দেখে উপস্থিত জনতা হতবাক হয়ে যান। এমন হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখে মানুষের মনে প্রশ্ন উঠেছে—কোন অপরাধে এই শিশুকে তার মা-বাবার কোল থেকে বঞ্চিত করে এমন নিষ্ঠুরভাবে পরিত্যক্ত করা হলো? খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরাসহ শত শত মানুষ ঘটনাস্থলে ভিড় করেন।
বাঘাসুরা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আব্দুর রশিদ এই মানবিক সংকটে দ্রুত সাড়া দিয়েছেন। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি ঘটনাস্থলে ছুটে যান এবং শিশুটিকে উদ্ধার করে মাধবপুরের ল্যাবএইড হাসপাতালে ভর্তির ব্যবস্থা করেন। আব্দুর রশিদ জানান, শিশুটির জীবন রক্ষা করাই ছিল সেই মুহূর্তে তাদের একমাত্র লক্ষ্য। তিনি শিশুটির চিকিৎসার জন্য সব ধরনের সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বর্তমানে শিশুটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে এবং চিকিৎসকরা জানিয়েছেন যে, সে এখন বিপদমুক্ত ও শারীরিকভাবে অনেকটা সুস্থ। হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণে থাকা এই শিশুর প্রতি এখন পুরো এলাকার মানুষের গভীর মমত্ববোধ জেগে উঠেছে।
কিন্তু প্রশ্ন রয়ে গেছে, কেন এই নবজাতককে ফেলে যাওয়া হলো? নবজাতকের শরীরে স্যালাইন লাগানো থাকাটা অনেকগুলো সম্ভাবনার জন্ম দেয়। হতে পারে শিশুটি জন্মের পর থেকেই অসুস্থ ছিল এবং কোনো হাসপাতাল থেকে তাকে এখানে এনে ফেলে রাখা হয়েছে, অথবা জন্মের সময় কোনো জটিলতার কারণে তাকে বাইরে চিকিৎসা নিতে হয়েছিল। সমাজবিজ্ঞানী ও স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, লোকলজ্জা, অর্থনৈতিক সংকট কিংবা সামাজিক কোনো জটিলতার কারণে মা-বাবা হয়তো এমন চরম সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে কারণ যাই হোক না কেন, জীবনের চেয়ে কোনো কিছু বড় হতে পারে না। শিশুকে এভাবে রাস্তায় ফেলে দিয়ে যাওয়া কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের কাজ হতে পারে না।
ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এলাকার মানুষ এখন অপরাধীকে খুঁজে বের করার জন্য স্থানীয় প্রশাসনের কাছে দাবি জানিয়েছেন। রাস্তায় সিসিটিভি ক্যামেরা বা আশেপাশের মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রকৃত অপরাধীকে চিহ্নিত করা সম্ভব বলে অনেকেই মনে করছেন। মাধবপুর থানা পুলিশ ঘটনাটি তদন্তের আশ্বাস দিয়েছে। যদি শিশুটির মা-বাবার কোনো অপরাধ না থাকে এবং তারা যদি পরিস্থিতির শিকার হন, তবে তাদের খুঁজে বের করে কাউন্সেলিং বা সরকারি সহায়তা প্রদানের দাবিও উঠেছে। অন্যদিকে, যদি এটি পরিকল্পিত কোনো অপরাধ হয়, তবে শিশুটিকে হত্যাচেষ্টার দায়ে তাদের আইনের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।
মাধবপুর ল্যাবএইড হাসপাতালে শিশুটির সুস্থতার জন্য এখন অনেক মানুষই খোঁজ নিচ্ছেন। অনেকেই শিশুটিকে দত্তক নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। পরিত্যক্ত এই শিশুটি এখন যেন পুরো এলাকার মানুষের আদরের কন্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, নবজাতকটি বেশ শান্ত এবং তাকে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও পুষ্টি দেওয়া হচ্ছে। সে যেভাবে বেঁচে ফিরেছে, তাতে অনেকেই তাকে ‘আল্লাহর দান’ হিসেবে দেখছেন। হাসপাতালের নার্সরা নিজেদের সন্তানের মতোই তাকে সেবা করছেন। এই শিশুটির বেঁচে থাকা যেন এক চরম আশার প্রতীক, যা মানুষের মাঝে মানবিকতা ও সহমর্মিতার জয়গান গাইছে।
মানুষের নিষ্ঠুরতার চরম বহিঃপ্রকাশের বিপরীতে মানুষেরই যে মমত্ববোধ, তা এই ঘটনা থেকে আবারও প্রমাণিত হলো। রাস্তার পাশে পড়ে থাকা একটি শিশুকে উদ্ধারে স্থানীয় মানুষের যে তৎপরতা, তা প্রমাণ করে যে আমাদের সমাজে এখনো বিবেক জীবিত। যদি আব্দুর রশিদ বা স্থানীয় লোকজন দ্রুত ব্যবস্থা না নিতেন, তবে হয়তো এই শিশুটিকে প্রাণ হারাতে হতো। এই মানবিক বিপর্যয় থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। সমাজের প্রতিটি স্তরে সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন যাতে কোনো মা যেন তার সন্তানকে এভাবে ফেলে দেওয়ার কথা কল্পনাও করতে না পারেন। সরকারের উচিত এমন মা-বাবার জন্য সহায়তা বা পুনর্বাসনের পথ প্রশস্ত করা।
শেষ পর্যন্ত শিশুটির ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়ে এখন নানা আলোচনা চলছে। আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাকে শিশুসদনে নাকি ভালো কোনো পরিবারে দত্তক দেওয়া হবে, তা কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেবে। তবে এই নবজাতক যেন নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে উঠতে পারে এবং সমাজে যেন তার অধিকার সংরক্ষিত থাকে, সেটিই এখন সবার দাবি। মাধবপুরের এই ঘটনাটি কেবল একটি নিউজ আইটেম নয়, এটি আমাদের নৈতিকতার এক আয়না। এই আয়নায় নিজেদের চেহারা দেখে অপরাধীদের অনুশোচনা হোক এবং মানুষ হিসেবে আমাদের দায়িত্ববোধ জাগ্রত হোক। ওই অনাথ শিশুটি যেন ভবিষ্যতে বড় হয়ে জানতে পারে, তাকে ফেলে দেওয়ার মতো মানুষ থাকলেও তাকে বাঁচানোর মতো মানুষের অভাব ছিল না।


