প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
আকাশপথে চলাচলের ক্ষেত্রে সামান্য ত্রুটিও যে কতটা উদ্বেগের কারণ হতে পারে, তার ভয়াবহ অভিজ্ঞতা পেলেন ঢাকা থেকে কক্সবাজারগামী নোভোএয়ারের একটি ফ্লাইটের যাত্রীরা। শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা ৫০ মিনিটে ঢাকা থেকে উড্ডয়ন করা ফ্লাইট বিকিউ-৯৩৫ উড্ডয়নের মাত্র ১৫ মিনিটের মাথায় যান্ত্রিক জটিলতায় পড়ে। বিমানে থাকা যাত্রীদের মধ্যে ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র ও বেসামরিক বিমান পরিবহন উপদেষ্টা হুমায়ুন কবীর। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ল্যান্ডিং গিয়ার স্বাভাবিকভাবে ওপরে না ওঠায় পাইলট ঝুঁকি না নিয়ে ফ্লাইটটি ঢাকায় ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেন। প্রায় ৪৫ মিনিট আকাশে চক্কর দেওয়ার পর বিমানটি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিরাপদে জরুরি অবতরণ করে। বড় ধরনের কোনো প্রাণহানি বা দুর্ঘটনা ছাড়াই ফ্লাইটটি অবতরণ করায় যাত্রীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসে, তবে সেই মুহূর্তের আতঙ্ক ছিল স্পষ্ট।
ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হুমায়ুন কবীর গণমাধ্যমের কাছে সেই উত্তেজনাকর পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, বিমানটি আকাশে ওড়ার ১০ থেকে ১৫ মিনিট পরই যান্ত্রিক ত্রুটি ধরা পড়ে। পাইলট লক্ষ্য করেন যে ল্যান্ডিং গিয়ার বা বিমানের চাকাগুলো স্বাভাবিকভাবে ওপরে উঠছে না। বারবার চেষ্টা করার পরও যখন সেগুলো প্রত্যাহার করা সম্ভব হচ্ছিল না, তখন যাত্রী ও বিমানের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে ক্যাপ্টেন বিমানটি ঢাকায় ফিরিয়ে নেওয়ার সাহসী ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। অবতরণের আগে অতিরিক্ত জ্বালানি পুড়িয়ে ফেলা এবং বিমানের গতি নিয়ন্ত্রণের জন্য পাইলটকে প্রায় ৪৫ মিনিট আকাশে অপেক্ষা করতে হয়। যদিও তিনি নিজেকে বিমান বিশেষজ্ঞ হিসেবে দাবি করেননি, তবুও ব্যক্তিগতভাবে তিনি মনে করেন পাইলটের সিদ্ধান্তটিই ছিল ওই মুহূর্তের জন্য সবচেয়ে সঠিক এবং বিচক্ষণ।
বিমানের ভেতরে থাকা যাত্রীদের অভিজ্ঞতা ছিল অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। হুমায়ুন কবীর বলেন, ল্যান্ডিং গিয়ার কাজ না করার তথ্য পাওয়ার পর বিমানের ভেতরে যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে শিশুদের কান্নাকাটি এবং যাত্রীদের উৎকণ্ঠা পরিস্থিতিকে আরও অস্বস্তিকর করে তোলে। আকাশে চক্কর দেওয়ার পুরো সময়টিতে যাত্রীরা মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে আছেন কি না—এমন শঙ্কায় গ্রাস করেছিল সবাইকে। তবে শেষ পর্যন্ত বড় কোনো দুর্ঘটনা ছাড়াই বিমানটি নিরাপদে অবতরণ করলে সবাই স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেন। আকাশপথের এমন যান্ত্রিক বিভ্রাট যাত্রীদের মনস্তাত্ত্বিক চাপের মুখে ফেলে দেয়, যা যেকোনো যাত্রীর জন্যই এক বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতার নামান্তর। আল্লাহর রহমতে বড় কোনো অঘটন না ঘটলেও, এই ঘটনাটি দেশের বিমান চলাচল ব্যবস্থাপনায় নিরাপত্তার প্রশ্নটিকে আরও বড় করে সামনে নিয়ে এসেছে।
দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকে রক্ষা পাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হুমায়ুন কবীর দেশের বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলোর উড়োজাহাজের ফিটনেস পরীক্ষার ওপর কঠোর নজরদারির তাগিদ দিয়েছেন। তিনি বলেন, বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলো যে পুরোনো উড়োজাহাজগুলো পরিচালনা করছে, সেগুলোর ফিটনেস আরও নিবিড় ও কঠোরভাবে পরীক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। যাত্রীবাহী উড়োজাহাজের নিরাপত্তার সঙ্গে কোনো ধরনের আপস বা অবহেলার সুযোগ নেই। যদি নিয়মিত ও কার্যকর ফিটনেস পরীক্ষা নিশ্চিত না করা হয়, তবে ভবিষ্যতে এমন ছোটখাটো যান্ত্রিক ত্রুটি থেকে বড় ধরনের বিপর্যয়ের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এটি কেবল বিমান চলাচল ও ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়, বরং হাজার হাজার যাত্রীর জীবন ও নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই প্রতিটি এয়ারলাইন্সকে তাদের উড়োজাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ ও মাননিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার মানদণ্ড নিয়ে দীর্ঘদিনের যে বিতর্ক, এই ঘটনাটি সেই আলোচনার আগুনে ঘি ঢেলেছে। আকাশপথে ভ্রমণকারী যাত্রীরা সর্বদা একটি নিরবচ্ছিন্ন ও নিরাপদ যাত্রা প্রত্যাশা করেন। কিন্তু নোভোএয়ারের এই ফ্লাইটের যান্ত্রিক ত্রুটি আবারও প্রমাণ করল যে, বিমান রক্ষণাবেক্ষণে এক চুল পরিমাণ শিথিলতাও দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। বেসামরিক বিমান পরিবহন খাতের নিয়মিত অডিট এবং উড়োজাহাজের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা যাচাইয়ের প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। বিশেষ করে যে এয়ারলাইন্সগুলো দীর্ঘদিনের পুরোনো উড়োজাহাজ ব্যবহার করছে, সেগুলোর ব্যাপারে সিভিল এভিয়েশন অথরিটিকে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। যাত্রীদের নিরাপত্তার বিষয়টি যেন কেবল নিয়মের খাতায় সীমাবদ্ধ না থেকে মাঠ পর্যায়ে প্রতিফলিত হয়, সেটি নিশ্চিত করাই হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মূল দায়িত্ব।
ঘটনাটি ঘটার পরপরই বিমানবন্দরে উদ্ধারকারী দল ও ফায়ার সার্ভিসকে সতর্ক রাখা হয়েছিল, যা বিমান কর্তৃপক্ষের দ্রুত সচেতনতার প্রমাণ দেয়। কিন্তু দুর্ঘটনার পূর্বপ্রস্তুতির চেয়ে দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান এবং তা প্রতিকারের উপায় খুঁজে বের করাই হবে মূল কাজ। দেশের আকাশপথকে নিরাপদ রাখতে সরকারি পর্যায়ের নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলোর নৈতিক দায়বদ্ধতাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হুমায়ুন কবীরের এই মন্তব্য যে অত্যন্ত সময়োপযোগী, তা বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞরাও একমত পোষণ করেছেন। নিয়মিত বিরতিতে প্রতিটি উড়োজাহাজ চেক-আপ এবং যন্ত্রাংশের কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে না পারলে আকাশপথের এই রোমাঞ্চকর ভ্রমণ আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
পরিশেষে বলা যায়, আজ যাত্রীরা নিরাপদে অবতরণ করতে পেরেছেন ঠিকই, কিন্তু এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের বিমান পরিবহন খাতে আমূল পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। নোভোএয়ার কর্তৃপক্ষকে এই যান্ত্রিক ত্রুটির কারণ তদন্ত করে দ্রুত প্রতিবেদন প্রকাশের আহ্বান জানিয়েছেন সচেতন মহল। এয়ারলাইন্সের সুনাম অর্জনের চেয়ে যাত্রীর জীবনের নিরাপত্তা অনেক বেশি মূল্যবান। আশা করা যায়, হুমায়ুন কবীরের এই সতর্কবাণী এবং যাত্রীদের এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের বিমান খাতের নিরাপত্তা কাঠামো পুনর্বিন্যাসে বাধ্য করবে। আকাশপথে ভ্রমণ কেবল একটি যাতায়াত ব্যবস্থা নয়, এটি মানুষের বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। সেই বিশ্বাসের মর্যাদা রাখতে হলে ফিটনেস পরীক্ষার স্বচ্ছতা ও কঠোরতা নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। প্রতিটি যাত্রীর গন্তব্যে পৌঁছানো যেন নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ হয়, সেটিই হোক আমাদের লক্ষ্য।


