প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
রাজনীতির মাঠে নানা সময়ে নানা কৌশল অবলম্বন করা হয়, কখনো কখনো তা জনমতের প্রতিফলন ঘটায়, আবার কখনো নিছক ‘হাইপ’ হিসেবেই রয়ে যায়। সম্প্রতি দেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণের সময় এমন এক বাস্তবতার কথা উঠে এল বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার বিষয়ক মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কণ্ঠে। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪৫তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি) আয়োজিত এক বিশেষ আলোচনা সভায় মির্জা ফখরুল স্পষ্ট করে বলেন যে, নির্বাচনের পূর্বে জামায়াতে ইসলামীর জয়ের ব্যাপারে যে জোরালো প্রচার বা ‘হাইপ’ তোলা হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত জনমতের বাস্তবতার কাছে পরাজিত হয়েছে। তিনি নিজের পরাজয়ের উদাহরণ টেনে বলেন, নির্বাচনের আগের পরিবেশ এমন ছিল যেন সবখানে জামায়াতের জোয়ার বইছে, কিন্তু চূড়ান্ত ফলাফলে দেশের মানুষ তাদের ভুল করেনি, বরং বিএনপিকেই গণতন্ত্রের সঠিক ধারক হিসেবে বেছে নিয়েছে।
নির্বাচনী রাজনীতির জটিল সমীকরণ নিয়ে বলতে গিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সব ধরনের হাইপ আর প্রচারণার ভিড়েও সাধারণ মানুষ তাদের বিবেক অনুযায়ী রায় দিয়েছেন। বিএনপির প্রতি মানুষের এই আস্থা প্রমাণ করে যে, দেশের সাধারণ ভোটাররা উদার গণতন্ত্রের পথে হাঁটতে চায়। তিনি উল্লেখ করেন যে, বিএনপি একটি স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, আর এই প্রতিশ্রুতির প্রতিই মানুষ শেষ পর্যন্ত সমর্থন জানিয়েছে। নির্বাচনের আগে বিভিন্ন মহলের জরিপ বা গুঞ্জন নিয়ে তিনি খুব একটা বিচলিত ছিলেন না, কারণ তিনি জানতেন যে মাঠ পর্যায়ের বাস্তব চিত্র ভিন্ন। তার নিজের নির্বাচনে হেরে যাওয়ার বিষয়টি তিনি বড় কোনো পরাজয় হিসেবে নয়, বরং জনগণের সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান হিসেবেই দেখছেন।
এই আলোচনা সভায় মির্জা ফখরুল সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শিক দর্শনকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসেন। তিনি বলেন, জিয়াউর রহমান এমন একজন নেতা ছিলেন, যিনি সব দল ও মতের মানুষকে নিয়ে ‘রিকনসিলিয়েশন’ বা জাতীয় ঐক্যের প্রচেষ্টা করেছিলেন। তিনি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে এমন একটি অবস্থানে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, যেখানে দেশ কারো শত্রু হবে না। তিনি মনে করেন, জিয়াউর রহমানের সেই দূরদর্শী পররাষ্ট্রনীতি আজও প্রাসঙ্গিক। মির্জা ফখরুলের ভাষ্যমতে, বাংলাদেশ বর্তমানে এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে আধিপত্যবাদের বাইরে নিজস্ব অস্তিত্ব বজায় রাখা এবং বিদেশি শক্তির প্রভাবমুক্ত থাকা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আর এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জিয়াউর রহমানের পথই বর্তমান সময়ের সবচেয়ে কার্যকর সমাধান।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার লড়াইয়ে জিয়াউর রহমানের অবদানের কথা স্মরণ করে বিএনপি মহাসচিব আরও বলেন, তিনি নিজের অস্তিত্ব রক্ষার মাধ্যমে পুরো জাতির অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছিলেন। বাংলাদেশের যে নতুন যাত্রা শুরুর সুযোগ তৈরি হয়েছে, তা মূলত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এসেছে। এই সুযোগটিকে কাজে লাগিয়ে গণতন্ত্রের পথে দেশ এগিয়ে যাবে বলে তিনি প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বর্তমানে তার পিতার রেখে যাওয়া সেই আদর্শ ও পথ ধরেই এগিয়ে চলেছেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের মানুষের মধ্যে যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তা পূরণে বিএনপি ও তাদের শীর্ষ নেতৃত্ব সচেষ্ট রয়েছেন।
মির্জা ফখরুলের এই বক্তব্য কেবল নির্বাচনী পরাজয় বা জয়ের পর্যালোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা ছিল দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে বিএনপির আগামীর লক্ষ্য ও আদর্শের এক প্রতিফলন। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যেসব মেরুকরণ বা প্রচারণার কৌশল অবলম্বন করা হয়, তা কতটা বিভ্রান্তিকর হতে পারে, তা জামায়াতের উদাহরণ দিয়ে তিনি স্পষ্ট করেছেন। রাজনীতি যে আবেগ বা উত্তেজনার চেয়েও বেশি জনমতের ওপর নির্ভরশীল, সেই সত্যটিই তার বক্তব্যের মূল সুর হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার মতে, মানুষ এখন অনেক সচেতন, তারা হুজুগে কোনো রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীকে সমর্থন দিয়ে নিজেদের বিপদে ফেলতে চায় না। তারা এমন একটি রাজনৈতিক দলকে চায়, যারা স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন এবং উদার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী।
আলোচনা সভায় সমাগত বিশিষ্টজন এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মির্জা ফখরুলের এই বিশ্লেষণ রাজনৈতিক সচেতনতার একটি অংশ। নির্বাচনের আগে কোনো দলের জনপ্রিয়তা নিয়ে যে কৃত্রিম উত্তাপ তৈরির চেষ্টা চালানো হয়, তা ভোটারের চূড়ান্ত রায়ের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে না, বরং অনেক সময় উল্টো ফল বয়ে আনে। জামায়াতের ক্ষেত্রে যা ঘটেছিল, তা বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে এক শিক্ষণীয় উদাহরণ হয়ে থাকবে। বিএনপি মহাসচিবের এই বক্তব্য দলটির কর্মীদের মধ্যেও এক ধরনের স্বস্তি এনে দিয়েছে। যারা নির্বাচনের সময় বিভ্রান্তি বা সংশয়ের মধ্যে ছিলেন, তারা এখন দলের নেতৃত্বের কাছ থেকে একটি পরিষ্কার দিকনির্দেশনা পাচ্ছেন।
পরিশেষে বলা যায়, জিয়াউর রহমানের ৪৫তম মৃত্যুবার্ষিকীতে দাঁড়িয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কেবল পুরনো স্মৃতিরোমন্থন করেননি, বরং বর্তমান ও ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে বিএনপির অবস্থান ও দর্শনের একটি সুদৃঢ় ভিত্তি প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, বাংলাদেশের মানুষ তাদের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং গণতন্ত্র রক্ষার জন্য যে রায় দিয়েছে, তা বজায় রাখা এখন দলটির বড় দায়িত্ব। দেশের রাজনীতিতে আধিপত্যবাদের অবসানের পাশাপাশি একটি ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কের আবহ তৈরি করাই বিএনপির মূল লক্ষ্য। আর এই লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে জনমতের প্রতি শ্রদ্ধা এবং উদার গণতন্ত্রের চর্চা যে অপরিহার্য, তা আজ বারবার প্রমাণিত হচ্ছে। মির্জা ফখরুলের কণ্ঠে এই অকুতোভয় সত্যের উচ্চারণ বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠে নতুন করে এক প্রাণসঞ্চার করল, যা ভবিষ্যতে দলটির নীতি নির্ধারণেও বড় ভূমিকা রাখবে বলে রাজনৈতিক মহল মনে করছে।

