প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে পুলিশের লুণ্ঠিত বলে দাবি করা তিনটি অবিস্ফোরিত টিয়ারগ্যাস গ্রেনেড উদ্ধার করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)-৯। পরিত্যক্ত একটি স্থান থেকে উদ্ধার হওয়া এসব গ্রেনেডকে ঘিরে নতুন করে নিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। উদ্ধার হওয়া আলামতগুলো ইতোমধ্যে আইনগত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দক্ষিণ সুরমা থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে এবং এ ঘটনায় কারা জড়িত, কীভাবে গ্রেনেডগুলো সেখানে পৌঁছেছে এবং এর পেছনে কোনো সংঘবদ্ধ চক্র রয়েছে কি না—এসব বিষয় সামনে রেখে তদন্ত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।
র্যাব-৯ সূত্রে জানা গেছে, সোমবার (২০ জুলাই) দিবাগত রাতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তাদের সদর কোম্পানির একটি আভিযানিক দল দক্ষিণ সুরমা থানাধীন হুমায়ুন রশিদ চত্বর এলাকায় অবস্থান করছিল। এ সময় তারা তথ্য পায়, হুমায়ুন রশিদ চত্বর থেকে ফেঞ্চুগঞ্জ সড়কের সোনারগাঁও আবাসিক এলাকার একটি পরিত্যক্ত স্থানে অস্ত্রসদৃশ কিছু বস্তু ফেলে রাখা হয়েছে। তথ্যের গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে রাত আনুমানিক ১২টা ২০ মিনিটে র্যাব সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে চারপাশে তল্লাশি শুরু করেন।
তল্লাশির একপর্যায়ে একটি ঝোপের ভেতরে রাখা একটি শপিং ব্যাগ তাদের নজরে আসে। ব্যাগটি পরীক্ষা করে সেখানে তিনটি অবিস্ফোরিত টিয়ারগ্যাস গ্রেনেড পাওয়া যায়। নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে গ্রেনেডগুলো উদ্ধার করা হয় এবং পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা হয়।
র্যাবের প্রাথমিক দাবি অনুযায়ী, উদ্ধার হওয়া টিয়ারগ্যাস গ্রেনেডগুলো বাংলাদেশ পুলিশের বিভিন্ন থানা থেকে পূর্বে লুণ্ঠিত হয়েছিল। যদিও ঘটনাস্থল থেকে কোনো ব্যক্তি বা সন্দেহভাজনকে আটক করা সম্ভব হয়নি, তবুও উদ্ধার হওয়া আলামতকে কেন্দ্র করে তদন্ত আরও বিস্তৃত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এসব গ্রেনেড সেখানে কী উদ্দেশ্যে রাখা হয়েছিল, কতদিন ধরে পড়ে ছিল এবং এগুলোর সঙ্গে কোনো অপরাধী চক্র বা নাশকতার পরিকল্পনার সম্পর্ক রয়েছে কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, পরিত্যক্ত স্থানে বিস্ফোরক বা নিরাপত্তা সরঞ্জাম ফেলে রাখা জননিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক বিষয়। বিশেষ করে জনবসতিপূর্ণ এলাকার কাছাকাছি এ ধরনের আলামত উদ্ধার হওয়া আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। যদিও উদ্ধার হওয়া গ্রেনেডগুলো অবিস্ফোরিত ছিল, তবুও যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়া এগুলোর উপস্থিতি সাধারণ মানুষের জন্য ঝুঁকির কারণ হতে পারত।
র্যাব-৯ জানিয়েছে, উদ্ধার হওয়া আলামত প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সাধারণ ডায়েরি (জিডি) মূলে দক্ষিণ সুরমা থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। পাশাপাশি গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং প্রযুক্তিনির্ভর তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার উৎস ও সংশ্লিষ্টদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। তদন্তের স্বার্থে এই মুহূর্তে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা না হলেও সংশ্লিষ্টরা আশাবাদী, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে সিলেট বিভাগ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় ধারাবাহিক অভিযানের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, গোলাবারুদ এবং বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়েছে। র্যাবের দেওয়া তথ্য অনুসারে, এ সময়ের মধ্যে ৪৯টি দেশি-বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র, ১০৪ রাউন্ড গুলি, ছয়টি ম্যাগাজিন, বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক, ডেটোনেটর, সাউন্ড গ্রেনেড, পেট্রোল বোমা, ককটেল এবং ১৫৫টি এয়ারগান উদ্ধার করা হয়েছে। এসব অভিযানের মাধ্যমে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সম্ভাব্য নাশকতা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে বলে দাবি করছে বাহিনীটি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অবৈধ অস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধার অভিযান শুধু অপরাধ দমনেই নয়, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে একই সঙ্গে এসব অস্ত্র ও সরঞ্জাম কীভাবে অপরাধীদের হাতে পৌঁছায়, কোথায় সংরক্ষণ করা হয় এবং কীভাবে সেগুলো উদ্ধার হওয়া পর্যন্ত নজরের বাইরে থাকে—এসব বিষয়েও দীর্ঘমেয়াদি তদন্ত ও কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।
র্যাব-৯-এর মিডিয়া অফিসার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কে এম শহিদুল ইসলাম সোহাগ বলেন, দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে গোয়েন্দা নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে। যেকোনো ধরনের অবৈধ অস্ত্র, বিস্ফোরক বা নাশকতার উপকরণ উদ্ধারে বিশেষ অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে জনসাধারণকে সন্দেহজনক কোনো বস্তু বা কার্যকলাপ চোখে পড়লে দ্রুত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানাতে আহ্বান জানান তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশও জানিয়েছেন, পরিত্যক্ত স্থানগুলোতে নিয়মিত নজরদারি ও তল্লাশি পরিচালনা করা হলে এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ আলামত আরও দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে। তাদের মতে, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সাধারণ মানুষের সমন্বিত সহযোগিতা নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, উদ্ধার হওয়া টিয়ারগ্যাস গ্রেনেডগুলোর উৎপত্তি, সংরক্ষণের সময়কাল এবং সম্ভাব্য ব্যবহার নিয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধান চলছে। প্রয়োজনে ফরেনসিক বিশ্লেষণসহ অন্যান্য প্রযুক্তিগত পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করা হবে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে ঘটনার উদ্দেশ্য বা দায়ীদের বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো মন্তব্য করতে রাজি নয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা, তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত প্রকৃত ঘটনা উদঘাটিত হবে এবং যদি কোনো ব্যক্তি বা সংগঠিত চক্র এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকে, তবে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি প্রতিরোধে গোয়েন্দা তৎপরতা, নিয়মিত অভিযান এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ আরও জোরদার করা হবে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


