প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার একটি জনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে প্রায় ১৮ ফুট লম্বা একটি বিশাল আকৃতির অজগর সাপ নিরাপদে উদ্ধার করা হয়েছে। স্থানীয় মানুষের সচেতনতা, বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের দ্রুত পদক্ষেপ এবং বন বিভাগের সমন্বিত উদ্যোগের ফলে সাপটি কোনো ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। পরে অজগরটি শ্রীমঙ্গল বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং বন বিভাগ জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ শেষে এটিকে প্রাকৃতিক আবাসস্থলে অবমুক্ত করা হবে।
মঙ্গলবার দুপুরে শ্রীমঙ্গল উপজেলার পুল বন্ধন কমিউনিটি সেন্টারের পাশের একটি এলাকায় এ ঘটনাটি ঘটে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এলাকার বাসিন্দা ওয়াশিম মিয়া রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় ঝোপের পাশে একটি বিশাল আকৃতির সাপ দেখতে পান। প্রথমে বিষয়টি বুঝতে না পারলেও কাছে গিয়ে তিনি নিশ্চিত হন যে এটি একটি বড় আকারের অজগর। খবরটি মুহূর্তেই আশপাশে ছড়িয়ে পড়লে উৎসুক মানুষ ঘটনাস্থলে জড়ো হতে থাকেন। অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন, আবার কেউ কেউ নিজেদের নিরাপত্তার কথা ভেবে সাপটিকে মেরে ফেলারও চেষ্টা করেন।
তবে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হওয়ার আগেই এলাকার কয়েকজন সচেতন ব্যক্তি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের গুরুত্ব উপলব্ধি করে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। খবর পাওয়ার পর ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজল, পরিবেশকর্মী রাজদীপ দেব দীপ এবং বাবুল রবিদাস দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তারা স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায় অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে অজগরটিকে উদ্ধার করেন। উদ্ধার অভিযানে সাপটির কোনো ধরনের ক্ষতি হয়নি এবং উপস্থিত সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা হয়।
উদ্ধার শেষে অজগরটিকে শ্রীমঙ্গল বন বিভাগের রেঞ্জ কার্যালয়ে হস্তান্তর করা হয়। বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রাণীটির শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে উপযুক্ত পরিবেশে, মানুষের বসতি থেকে দূরে নিরাপদ বনাঞ্চলে অবমুক্ত করা হবে। এর মাধ্যমে সাপটি আবারও তার স্বাভাবিক আবাসস্থলে ফিরে যেতে পারবে।
বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজল জানান, উদ্ধার হওয়া অজগরটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১৮ ফুট এবং এর ওজন আনুমানিক ৩০ থেকে ৩৫ কেজি। এত বড় আকারের অজগর লোকালয়ে চলে আসা বিরল ঘটনা হলেও বনাঞ্চলসংলগ্ন এলাকায় মাঝে মাঝে এমন ঘটনা ঘটতে পারে। তিনি বলেন, অজগর সাধারণত মানুষের ওপর আক্রমণাত্মক নয়। ভয় পেলে বা আত্মরক্ষার প্রয়োজন হলে এটি প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। তাই এ ধরনের প্রাণী দেখা গেলে আতঙ্কিত না হয়ে বন বিভাগ বা বন্যপ্রাণী উদ্ধারকারী সংস্থাকে খবর দেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ।
শ্রীমঙ্গল বনরেঞ্জ কর্মকর্তা মো. নাজমুল ইসলাম বলেন, উদ্ধার হওয়া অজগরটিকে প্রাথমিকভাবে নিরাপদে সংরক্ষণ করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে এটিকে এমন একটি বনাঞ্চলে অবমুক্ত করা হবে, যেখানে এটি স্বাভাবিকভাবে বসবাস করতে পারবে এবং মানুষের সঙ্গে সংঘাতের ঝুঁকি থাকবে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শ্রীমঙ্গল দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ অঞ্চল। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, বিভিন্ন সংরক্ষিত বনাঞ্চল এবং চা-বাগানঘেরা প্রাকৃতিক পরিবেশের কারণে এখানে নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণীর বসবাস। তবে বনাঞ্চল সংকুচিত হওয়া, আবাসস্থল নষ্ট হওয়া, খাদ্যের সংকট এবং মানুষের ক্রমবর্ধমান বসতি বিস্তারের কারণে অনেক সময় বন্যপ্রাণী লোকালয়ে চলে আসে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে বা খাদ্যের সন্ধানে সাপসহ বিভিন্ন প্রাণী বন থেকে বেরিয়ে মানুষের বসতিপূর্ণ এলাকায় প্রবেশ করতে দেখা যায়।
পরিবেশবিদরা বলছেন, অজগর প্রকৃতির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রাণী। এটি ইঁদুর, খরগোশসহ বিভিন্ন ছোট প্রাণী খেয়ে বনাঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করে। কৃষিজমিতে ইঁদুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণেও অজগরের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ফলে এ ধরনের প্রাণীকে হত্যা না করে সংরক্ষণ করা পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই জানান, প্রথমে বিশাল আকৃতির সাপটি দেখে তারা ভয় পেয়ে যান। তবে উদ্ধারকারীরা দক্ষতার সঙ্গে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ায় কেউ আহত হননি এবং সাপটিও নিরাপদে উদ্ধার হয়েছে। তাদের মতে, এ ধরনের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন, যাতে ভয় বা ভুল ধারণা থেকে কেউ বন্যপ্রাণী হত্যা না করে।
বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন অনুযায়ী অজগর একটি সংরক্ষিত বন্যপ্রাণী। এ প্রাণী হত্যা, আটক বা পাচার আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। তাই কোনো এলাকায় অজগর বা অন্য কোনো বন্যপ্রাণী দেখা গেলে নিজ উদ্যোগে ধরার বা ক্ষতি করার পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে খবর দেওয়া উচিত।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের বিভিন্ন জেলায় লোকালয় থেকে অজগর, বনবিড়াল, শিয়াল, মেছোবাঘ, বানর ও বিভিন্ন প্রজাতির পাখি উদ্ধারের ঘটনা বেড়েছে। পরিবেশবিদদের মতে, এটি একদিকে যেমন বনাঞ্চলের ওপর বাড়তি চাপের ইঙ্গিত দেয়, অন্যদিকে মানুষের সঙ্গে বন্যপ্রাণীর সংঘাত বৃদ্ধিরও লক্ষণ। তাই বন সংরক্ষণ, প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এ ধরনের পরিস্থিতি অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।
শ্রীমঙ্গলের এই ঘটনায় স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছে। তাদের সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের কারণেই একটি বিরল ও গুরুত্বপূর্ণ বন্যপ্রাণীর জীবন রক্ষা সম্ভব হয়েছে। একই সঙ্গে এই ঘটনাটি আবারও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণী রক্ষা শুধু বন বিভাগের দায়িত্ব নয়; বরং সমাজের প্রতিটি মানুষের সচেতন অংশগ্রহণই জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের সবচেয়ে বড় শক্তি। বন বিভাগ ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকর্মীরা আশা করছেন, ভবিষ্যতেও এ ধরনের ঘটনায় মানুষ আতঙ্কিত না হয়ে আইনসম্মত ও মানবিক আচরণ করবে এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে সক্রিয় সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।


