প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
জুলাই আন্দোলনের শহীদ ও আহত যোদ্ধাদের আত্মত্যাগ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে বলে মন্তব্য করেছেন সিলেট সিটি কর্পোরেশনের (সিসিক) প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী। তিনি বলেছেন, জুলাই আন্দোলনের শহীদ ও যোদ্ধাদের রক্তের বিনিময়েই গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়েছে। রাষ্ট্র তাদের অবদান কখনো ভুলবে না। শহীদ পরিবার ও আহত যোদ্ধাদের কল্যাণ, পুনর্বাসন এবং মর্যাদা নিশ্চিত করতে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে এবং ভবিষ্যতেও তাদের পাশে থাকবে।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) ‘জুলাই শহিদ দিবস-২০২৬’ উপলক্ষে সিলেট জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত এ সভায় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, জুলাই আন্দোলনের যোদ্ধা, শহীদ পরিবারের সদস্য এবং বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের দীর্ঘ ইতিহাসে জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। দীর্ঘ ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় এই গণআন্দোলন চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। সেই আন্দোলনে অসংখ্য নেতা-কর্মী, ছাত্র-জনতা এবং সাধারণ মানুষ জীবন উৎসর্গ করেছেন। অনেকে কারাবরণ করেছেন, নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ বিসর্জন দিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে অংশ নিয়েছেন।
তিনি বলেন, যারা বছরের পর বছর রাজপথে আন্দোলন করেছেন এবং জুলাই আন্দোলনে সাহসিকতার সঙ্গে অংশ নিয়ে আত্মত্যাগের নজির স্থাপন করেছেন, তাদের অবদান জাতি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। ইতিহাসে তাদের নাম সম্মানের সঙ্গে উচ্চারিত হবে। নতুন প্রজন্মের কাছে এই আন্দোলনের প্রকৃত ইতিহাস পৌঁছে দেওয়া এবং আত্মত্যাগের মূল্যবোধ তুলে ধরা রাষ্ট্র ও সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সিসিক প্রশাসক আরও বলেন, জুলাই আন্দোলনে আহতদের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা, তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা এবং শহীদ পরিবারের সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করতে সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। তিনি আশ্বাস দিয়ে বলেন, রাষ্ট্র শুধু আনুষ্ঠানিকভাবে নয়, বাস্তব অর্থেই শহীদ পরিবার ও আহত যোদ্ধাদের পাশে রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। তাদের প্রয়োজন ও সমস্যাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে।
আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন সিলেটের জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মামুন। প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী। তিনি বলেন, যে কোনো জাতির ইতিহাসে গণআন্দোলন ও আত্মত্যাগের ঘটনা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে। তাই জুলাই আন্দোলনের ইতিহাস সংরক্ষণ এবং শহীদদের স্মৃতি রক্ষায় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ আরও শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সিলেট জেলা পরিষদের প্রশাসক আবুল কাহের চৌধুরী শামীম, সিলেট মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী, সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মো. এনামুল হক, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রাসেলুর রহমান, সিলেটের সিভিল সার্জন ডা. মো. নাসির উদ্দিন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. শামসুজ্জামান এবং সমাজসেবা অধিদপ্তর, সিলেটের উপপরিচালক মো. আব্দুর রফিক। বক্তারা জুলাই আন্দোলনের তাৎপর্য তুলে ধরে বলেন, গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যারা জীবন দিয়েছেন, তাদের অবদান ইতিহাসে অমলিন হয়ে থাকবে।
সভায় শহীদ পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য ছিল অত্যন্ত আবেগঘন। শহীদ পাভেলের পিতা মো. রফিক উদ্দিন বলেন, সন্তানের শূন্যতা কখনো পূরণ হওয়ার নয়। তবে রাষ্ট্র যদি শহীদ পরিবারগুলোর পাশে থাকে এবং তাদের আত্মত্যাগকে যথাযথ মর্যাদা দেয়, তাহলে সেটিই হবে সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি। শহীদ মিনহাজ আহমদের বড় ভাই সাঈদ আলমগীরও একই ধরনের অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, শহীদ পরিবারের সদস্যদের শুধু বিশেষ দিবসে নয়, সারা বছর নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।
জুলাই যোদ্ধা সংসদ সিলেটের আহ্বায়ক লিটন আহমেদ এবং ‘আমরা জুলাই যোদ্ধা’র সদস্যসচিব আব্দুল মতিন তাদের বক্তব্যে আহত আন্দোলনকারীদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং কর্মসংস্থানের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন। তারা বলেন, আন্দোলনে অংশ নেওয়া অনেকেই এখনো শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। তাদের জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর ও স্থায়ী উদ্যোগ প্রয়োজন।
আলোচনা সভায় শহীদ পরিবারের সদস্যরা সরকারের কাছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি তুলে ধরেন। তারা বলেন, শহীদ পরিবারগুলোর নিয়মিত খোঁজখবর রাখা, আর্থিক ও সামাজিক সহায়তা অব্যাহত রাখা, আহতদের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং জুলাই আন্দোলনে সিলেট জেলার ১৪ জন শহীদের স্মৃতি সংরক্ষণে তাদের নামে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, স্থাপনা বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করা উচিত। একই সঙ্গে শহীদ পরিবার ও আহতদের জন্য একটি স্থায়ী কল্যাণ তহবিল গঠনের দাবিও জানানো হয়।
বক্তারা মনে করেন, ইতিহাস সংরক্ষণ কেবল স্মৃতিচারণের বিষয় নয়, বরং এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, নাগরিক অধিকার এবং আত্মত্যাগের শিক্ষা দেওয়ার অন্যতম মাধ্যম। তাই জুলাই আন্দোলনের দলিল, স্মৃতি, আলোকচিত্র ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বানও জানানো হয়।
এর আগে ‘জুলাই শহিদ দিবস-২০২৬’ উপলক্ষে সকালে রিকাবীবাজারে অবস্থিত জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী। তার নেতৃত্বে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এ শ্রদ্ধা নিবেদনে অংশ নেন।
পুষ্পস্তবক অর্পণের সময় উপস্থিত ছিলেন সিসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রেজাই রাফিন সরকার, সচিব মো. আশিক নূর, প্রধান প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) মো. আলী আকবর, প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. জাহিদুল ইসলাম, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম, প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা লে. কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ একলিম আবদীন, নির্বাহী প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) লে. কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ উল্লাহসহ সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা।
‘জুলাই শহিদ দিবস’ উপলক্ষে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে শহীদদের স্মরণ, আহতদের প্রতি সম্মান এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনের চেতনাকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়। বক্তারা বলেন, শহীদদের আত্মত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন এবং তাদের পরিবারের মর্যাদা ও কল্যাণ নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই একটি কৃতজ্ঞ জাতি হিসেবে বাংলাদেশের দায়িত্ব পালন করা সম্ভব। একই সঙ্গে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আত্মোৎসর্গকারীদের স্মৃতি সংরক্ষণে রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিকদের সম্মিলিত উদ্যোগ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানানো হয়।


