প্রকাশ: ০৭ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলায় গভীর রাতে র্যাব-৯ এর অভিযানে বিপুল পরিমাণ গাঁজাসহ দুই মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেফতারের ঘটনা এলাকায় ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে পরিচালিত এই অভিযানে একটি ট্রাক থেকে ২৯ কেজি গাঁজা উদ্ধার করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে মাদক সংগ্রহ করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহের উদ্দেশ্যে এগুলো বহন করা হচ্ছিল।
বুধবার দুপুরে র্যাব-৯ সদর দপ্তর থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে অভিযানের বিস্তারিত তথ্য জানানো হয়। র্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের মহাসড়কগুলো ব্যবহার করে মাদক পাচারের প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় গোয়েন্দা নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় মাধবপুরে এই অভিযান পরিচালনা করা হয়।
র্যাব-৯ এর মিডিয়া অফিসার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কে. এম. শহিদুল ইসলাম সোহাগ জানান, র্যাব-৯ এর সিপিসি-৩ শায়েস্তাগঞ্জ ক্যাম্পের একটি আভিযানিক দল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জানতে পারে যে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ব্যবহার করে একটি ট্রাকে মাদকদ্রব্য ঢাকার দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তথ্যটি পাওয়ার পরপরই র্যাব সদস্যরা সম্ভাব্য রুটে নজরদারি শুরু করেন।
রাত দেড়টার দিকে মাধবপুর পৌরসভার আওতাধীন ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে একটি বিশেষ চেকপোস্ট স্থাপন করা হয়। ওই সময় সন্দেহভাজন একটি লাল-নীল রঙের ট্রাককে থামানোর সংকেত দেওয়া হলে ট্রাকে থাকা দুই ব্যক্তি দ্রুত নেমে পালানোর চেষ্টা করেন। তবে র্যাব সদস্যরা ধাওয়া করে তাদের আটক করতে সক্ষম হন।
আটক দুই ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তারা প্রথমে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন বলে জানা গেছে। পরে কঠোর জিজ্ঞাসাবাদে তারা ট্রাকে গাঁজা থাকার কথা স্বীকার করেন। এরপর ট্রাকটি তল্লাশি করে একটি সিমেন্টের বস্তার ভেতর বিশেষ কৌশলে রাখা খাকি রঙের স্কচ টেপে মোড়ানো ২৯ কেজি গাঁজা উদ্ধার করা হয়।
র্যাব জানায়, উদ্ধার হওয়া গাঁজার বাজারমূল্য কয়েক লাখ টাকা হতে পারে। মাদকগুলো রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহের পরিকল্পনা ছিল বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
গ্রেফতার হওয়া দুই ব্যক্তি হলেন কুড়িগ্রাম জেলার ভুরুঙ্গামারী উপজেলার নুরুল্যাগঞ্জ গ্রামের মৃত শুক্ররাম মোল্লার ছেলে করিম (৪০) এবং মো. মেহেদী হাসান (৩২)। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছেন, সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে গাঁজা সংগ্রহ করে বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্রির জন্য পরিবহন করছিলেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, মাদক পাচারকারীরা বর্তমানে অভিনব কৌশল ব্যবহার করছে। কখনো পণ্যবাহী ট্রাক, কখনো যাত্রীবাহী যানবাহন ব্যবহার করে তারা মাদক পরিবহন করছে। বিশেষ করে মহাসড়ক ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন স্থানে মাদক সরবরাহের প্রবণতা বাড়ায় গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক দেশের অন্যতম ব্যস্ত সড়ক হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরেই এটি মাদক পাচারের একটি রুট হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিলসহ নানা ধরনের মাদক উদ্ধার হলেও পুরো চক্র নির্মূল করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্তবর্তী অঞ্চল থেকে সহজে মাদক প্রবেশ করায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাদক ব্যবসার বিস্তার ঘটছে। এতে তরুণ সমাজ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মাদকাসক্তির কারণে পরিবারে অস্থিরতা, সামাজিক অপরাধ বৃদ্ধি এবং যুবসমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের মতো সমস্যাও বাড়ছে।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, শুধু অভিযান চালিয়ে মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এর পাশাপাশি সীমান্ত নজরদারি জোরদার, স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং মাদক ব্যবসার পেছনে থাকা বড় নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা জরুরি।
মাধবপুরের কয়েকজন বাসিন্দা জানান, মহাসড়ক এলাকায় মাঝেমধ্যেই সন্দেহজনক যানবাহনের চলাচল দেখা যায়। তারা আশা করছেন, নিয়মিত তল্লাশি ও নজরদারির মাধ্যমে মাদক পাচার রোধে আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
র্যাব জানিয়েছে, গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ অনুযায়ী মামলা দায়ের করা হয়েছে। পরে তাদের জব্দকৃত আলামতসহ মাধবপুর থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং দেশের বিভিন্ন রুটে নজরদারি আরও বাড়ানো হবে। একই সঙ্গে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বড় চক্রগুলোকে আইনের আওতায় আনতে গোয়েন্দা কার্যক্রমও জোরদার করা হয়েছে।
স্থানীয়রা বলছেন, মাদক নির্মূলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে একযোগে কাজ করতে হবে। কারণ মাদক শুধু একটি অপরাধ নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বড় সামাজিক হুমকি।


