প্রকাশ: ০৭ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
রাষ্ট্র সংস্কার, জুলাই সনদ এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়ন নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যখন নতুন বিতর্ক ও আলোচনা চলছে, তখন সিলেটে অনুষ্ঠিত এক আলোচনা সভায় তীব্র রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সাবেক শিবির নেতা অ্যাডভোকেট শিশির মনির। তিনি বলেছেন, রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগ ব্যাহত হলে দেশে আবারও ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠা পেতে পারে এবং সেই পরিস্থিতিতে নতুন গণঅভ্যুত্থান অনিবার্য হয়ে উঠবে।
বুধবার বিকেলে নগরীর দরগাগেইটস্থ কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ (কেমুসাস) মিলনায়তনে ‘জুলাই ঐক্য’ সিলেট আয়োজিত “গণরায় বাস্তবায়ন ও জনপ্রত্যাশা” শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান আলোচকের বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
অ্যাডভোকেট শিশির মনির তার বক্তব্যে বলেন, দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যারা গণআন্দোলন ও পরিবর্তনের পক্ষে ভূমিকা রেখেছে, তাদের মূল্যায়নে ব্যর্থতার খেসারত বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক দলগুলোকে দিতে হয়েছে। তিনি দাবি করেন, ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর যেসব শক্তি বিএনপির উত্থানে ভূমিকা রেখেছিল, পরবর্তীতে বিএনপি তাদের রক্ষা করতে পারেনি। একইভাবে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হলেও সেই আন্দোলনের শক্তিকে এখন উপেক্ষা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তার ভাষায়, “জুলাই সনদ এবং গণভোটের রায় উপেক্ষা করা হলে এর রাজনৈতিক পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে। জনগণের প্রত্যাশাকে পাশ কাটিয়ে কোনো রাজনৈতিক শক্তি দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারে না।”
তিনি আরও বলেন, জুলাই সনদের মূল ভিত্তিই ছিল রাষ্ট্র সংস্কার। সেই সনদে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট বিজয়ী হলে জাতীয় সংসদের পাশাপাশি নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করবেন। ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কথাও সেখানে উল্লেখ ছিল বলে দাবি করেন তিনি।
শিশির মনির অভিযোগ করেন, পরবর্তীতে রাজনৈতিক দলগুলো বিশেষ করে বিএনপি সেই প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসেছে। তিনি বলেন, “গণভোটে সম্মতি দিয়ে পরে সেই রায় অস্বীকার করা জনগণের সঙ্গে প্রতারণার শামিল। জনগণের সামনে দেওয়া অঙ্গীকার রাজনৈতিক সুবিধাবাদের কারণে বদলে ফেলা হলে গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে।”
বক্তব্যে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনায় ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রশ্নও তোলেন। তার মতে, গণঅভ্যুত্থানের পরও যদি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী না করা হয় এবং ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত না হয়, তাহলে কয়েক বছরের মধ্যেই আবার স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে।
তিনি বলেন, “রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি খাতে জবাবদিহি ও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক শাসন নিশ্চিত না হলে ব্যক্তি-নির্ভর রাজনীতি ফ্যাসিবাদের পথ তৈরি করে দেয়। সঠিক জায়গায় সঠিক মানুষকে দায়িত্ব দিতে না পারলে শুধু উন্নয়ন প্রকল্প দিয়ে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ সম্ভব নয়।”
সাম্প্রতিক সময়ে প্রধানমন্ত্রীর বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প উদ্বোধনের প্রসঙ্গ টেনে শিশির মনির বলেন, অনেক ক্ষেত্রে যেসব কাজ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের করার কথা, সেগুলোও রাজনৈতিকভাবে কেন্দ্রীয়ভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এতে প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা ও স্বতন্ত্র ভূমিকা দুর্বল হয়ে পড়ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, “হাওর রক্ষার জন্য যদি পাউবো কার্যকরভাবে কাজ করতে না পারে, তাহলে উন্নয়ন টেকসই হবে না। শুধু প্রকল্প ঘোষণা নয়, প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর করা জরুরি।”
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. ইসমাঈল পাটোয়ারীও রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মাধ্যমে যে স্বপ্ন নিয়ে রাজনৈতিক পরিবর্তন এসেছিল, সেই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের পরিবর্তে এখন অনেক ক্ষেত্রে দলীয় আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।
তার মতে, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে মেধা ও যোগ্যতার পরিবর্তে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়া হলে তা দীর্ঘমেয়াদে গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়াবে।
ডা. ইসমাঈল পাটোয়ারী বলেন, “একদিকে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে সংসদে ভিন্ন বক্তব্য আসছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, গণভোটে জনগণের দেওয়া রায়কে গুরুত্ব না দিলে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়তে পারে। জুলাই আন্দোলনে নিহত ও আহতদের আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান জানিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নের আহ্বান জানান তিনি।
সভায় সভাপতিত্ব করেন সিলেট প্রেসক্লাবের সভাপতি মুক্তাবিস উন নুর। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের সভাপতি ভাষাসৈনিক অধ্যক্ষ মাসউদ খান, সাবেক অধ্যক্ষ কবি কালাম আজাদ, জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ, খেলাফত মজলিস ও অন্যান্য সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে অধ্যক্ষ মাসউদ খান বলেন, গণভোটে বিপুলসংখ্যক মানুষ সমর্থন জানিয়েছিল বলে দাবি করা হচ্ছে। সেই গণরায়কে উপেক্ষা করা হলে তা জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে। তিনি রাজনৈতিক দলগুলোকে জুলাই আন্দোলনের চেতনা বাস্তবায়নের আহ্বান জানান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্র সংস্কার, গণভোট এবং জুলাই সনদ নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও নাগরিক প্ল্যাটফর্ম এ নিয়ে সক্রিয় অবস্থান নিচ্ছে। বিশেষ করে গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রশ্নে মতপার্থক্য এখন প্রকাশ্যে চলে এসেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং সংস্কার প্রশ্নে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ভবিষ্যতে আরও বড় রাজনৈতিক সংঘাতের কারণ হতে পারে। একই সঙ্গে গণতন্ত্রের স্থিতিশীলতার জন্য রাজনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়ন, জবাবদিহিমূলক শাসন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার বিকল্প নেই বলেও মত তাদের।
সিলেটের এই আলোচনা সভা তাই কেবল একটি রাজনৈতিক সমাবেশেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং দেশের চলমান রাজনৈতিক বাস্তবতা, রাষ্ট্র সংস্কার এবং গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন বিতর্কের ক্ষেত্রও তৈরি করেছে।


