প্রকাশ: ০৭ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
হবিগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী সুতাং নদ এখন ভয়াবহ পরিবেশ দূষণের করাল গ্রাসে। একসময় যে নদ হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবিকা, যোগাযোগ, মাছের উৎস এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রতীক ছিল, সেই নদ এখন ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে বিষাক্ত জলধারায়। নদটির পানি, মাছ এবং আশপাশের পরিবেশ নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য। গবেষকেরা বলছেন, সুতাং নদের পানিতে শুধু ভারী ধাতুই নয়, বিপজ্জনক মাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিকও ছড়িয়ে পড়েছে। এমনকি নদ থেকে সংগ্রহ করা মাছের শরীরেও মিলেছে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা।
হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হকৃবি) একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, সুতাং নদ থেকে সংগৃহীত ৩০টি মাছের পরিপাকতন্ত্র বিশ্লেষণ করে মোট ৫১টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা শনাক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিটি মাছে গড়ে প্রায় দুটি প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। গবেষকেরা বলছেন, এই পরিস্থিতি শুধু জলজ প্রাণীর জন্য নয়, মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় ধরনের হুমকির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, ছোট মাছের তুলনায় বড় আকারের মাছের শরীরে দূষণের মাত্রা বেশি। দীর্ঘ সময় ধরে দূষিত পানিতে বসবাসের কারণে এসব মাছের শরীরে ধীরে ধীরে প্লাস্টিক ও ভারী ধাতু জমা হচ্ছে বলে ধারণা করছেন গবেষকেরা। পরিবেশবিদদের মতে, খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে এই দূষণ মানুষের শরীরেও প্রবেশ করছে, যা ভবিষ্যতে ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে।
সুতাং নদের পানির নমুনা বিশ্লেষণেও উদ্বেগজনক তথ্য মিলেছে। প্রতি লিটার পানিতে ৬টি থেকে সর্বোচ্চ ৪৬টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। এসব কণার গড় আকার শূন্য দশমিক ১ মিলিমিটার থেকে শূন্য দশমিক ৫ মিলিমিটার পর্যন্ত। রাসায়নিক বিশ্লেষণে শনাক্ত হওয়া প্লাস্টিকের মধ্যে রয়েছে পলিথিন, পলিইথিলিন টেরেফথালেট এবং পলিআমাইডের মতো ক্ষতিকর উপাদান।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব প্লাস্টিক মূলত শিল্পকারখানার বর্জ্য, প্লাস্টিক প্যাকেট, বোতল এবং বিভিন্ন পলিথিনজাত পণ্য থেকে নদে প্রবেশ করছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বড় প্লাস্টিক ভেঙে ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়ে পানির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। পরে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণী সেগুলো খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করছে।
সুতাং নদের পানি নিয়ে পরিচালিত আরেক গবেষণায় পাওয়া গেছে আরও ভয়ংকর তথ্য। এতে দেখা যায়, নদের পানিতে লোহা, ম্যাঙ্গানিজ ও সিসার মতো ভারী ধাতুর মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। একই সঙ্গে পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ কম এবং মোট দ্রবীভূত কঠিন পদার্থের পরিমাণ বেশি পাওয়া গেছে। ‘ওয়াটার কোয়ালিটি ইনডেক্স’ অনুযায়ী গবেষকেরা এই নদের পানিকে অত্যন্ত নিম্নমানের হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, শিল্প এলাকাসংলগ্ন ভাটির দিকে দূষণের মাত্রা সবচেয়ে বেশি। পরিবেশবিদদের অভিযোগ, এলাকার বিভিন্ন শিল্পকারখানা বিশেষ করে টেক্সটাইল ও অন্যান্য কারখানার বর্জ্য পরিশোধন ছাড়াই সরাসরি নদে ফেলা হচ্ছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, প্লাস্টিক বর্জ্যের অব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশ আইন বাস্তবায়নের দুর্বলতার কারণে পরিস্থিতি দিন দিন আরও খারাপ হচ্ছে।
গবেষক মো. শাকির আহম্মদ বলেন, “মিঠাপানির এই দূষণ দীর্ঘমেয়াদে মানবস্বাস্থ্য, কৃষি ও জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করবে। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।”
বাংলাদেশ নদী কমিশনের তালিকাভুক্ত আন্তসীমান্ত এই নদ ভারতের ত্রিপুরা থেকে উৎপন্ন হয়ে হবিগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা অতিক্রম করেছে। একসময় সুতাং নদ ছিল এই অঞ্চলের প্রাণ। নদপথে চলত নৌকা, মাছ ধরেই চলত অসংখ্য জেলের সংসার, আর নদীর পানি ব্যবহার হতো কৃষিকাজে। কিন্তু বর্তমানে নদটির অনেক অংশে পানি কালচে হয়ে গেছে, কোথাও কোথাও ছড়াচ্ছে তীব্র দুর্গন্ধ।
নদতীরবর্তী করাব, ছড়িপুর, উচাইল, রাজিউড়া ও সাধুর বাজার এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, আগের সেই স্বচ্ছ নদ এখন আর নেই। বর্ষা ছাড়া অনেক সময় নদে পানির প্রবাহও কমে যায়। তার ওপর শিল্পবর্জ্য ও ময়লার কারণে নদের পরিবেশ দিন দিন বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠছে।
ভাদগরি গ্রামের বাসিন্দা শফিক মিয়া বলেন, “আগে আমরা এই নদে গোসল করতাম, মাছ ধরতাম। এখন পানিতে নামলেই শরীরে চুলকানি শুরু হয়। বাচ্চাদেরও নদের কাছে যেতে দেই না।”
সাধুর বাজার এলাকার শিক্ষক গুলনাহার বেগম বলেন, “নদের পানি কালো হয়ে গেছে। দুর্গন্ধে অনেক সময় এলাকায় থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। স্কুলে যাতায়াত করতেও সমস্যা হয়। কয়েক বছর আগেও এমন অবস্থা ছিল না।”
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, দূষিত এই পানি সেচকাজে ব্যবহারের ফলে ভারী ধাতু কৃষিজমিতে ছড়িয়ে পড়ছে। ধান ও অন্যান্য ফসলের মাধ্যমে এসব বিষাক্ত উপাদান খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি ক্যানসার, স্নায়ুরোগ, কিডনি জটিলতা এবং শিশুদের শারীরিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
পরিবেশবিদদের মতে, শুধু গবেষণা প্রকাশ করলেই হবে না; এখন জরুরি কার্যকর উদ্যোগ। তারা বলছেন, শিল্পকারখানায় বাধ্যতামূলক বর্জ্য শোধনাগার চালু ও কার্যকর করতে হবে। একইসঙ্গে নদে সরাসরি বর্জ্য ফেলা বন্ধে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা, নদীর পানির নিয়মিত বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ এবং স্থানীয় জনগণের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধির ওপরও জোর দিয়েছেন তারা।
বিশ্লেষকদের মতে, সুতাং নদের বর্তমান অবস্থা শুধু একটি নদের সংকট নয়; এটি বাংলাদেশের পরিবেশ ব্যবস্থাপনার সামগ্রিক দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি। নদ বাঁচাতে না পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বড় ধরনের পরিবেশগত বিপর্যয় অপেক্ষা করছে। আর তাই এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে একসময় হয়তো সুতাং নদ কেবল স্মৃতির অংশ হয়ে থাকবে।


