প্রকাশ: ০৭ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
বাংলাদেশ পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ পদে আবারও জায়গা করে নিয়েছেন সুনামগঞ্জের কৃতি সন্তান মল্লিক আহসান উদ্দিন সামী। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উপ-পুলিশ কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই কর্মকর্তা এবার নড়াইল জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। তার এই পদোন্নতি ও নতুন দায়িত্বপ্রাপ্তির খবরে সুনামগঞ্জজুড়ে আনন্দ ও গর্বের অনুভূতি ছড়িয়ে পড়েছে। পরিবার, সহকর্মী, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং স্থানীয় বাসিন্দারা এটিকে জেলার জন্য সম্মানের বিষয় হিসেবে দেখছেন।
মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের পুলিশ-১ শাখা থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে তাকে উপ-পুলিশ কমিশনার পদ থেকে পুলিশ সুপার হিসেবে পদোন্নতি দিয়ে নড়াইল জেলার দায়িত্ব প্রদান করা হয়। সরকারি এ সিদ্ধান্ত প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও শুভেচ্ছা ও অভিনন্দনের বার্তা ছড়িয়ে পড়ে।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, মল্লিক আহসান উদ্দিন সামী সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার সৈয়দপুর-শাহারপাড়া ইউনিয়নের সৈয়দপুর মল্লিকপাড়া গ্রামের সন্তান। তিনি এমন একটি পরিবারে বেড়ে উঠেছেন, যেখানে শিক্ষা, সামাজিক নেতৃত্ব ও জনসেবার ঐতিহ্য দীর্ঘদিনের। তার বাবা অ্যাডভোকেট মল্লিক মো. মঈন উদ্দিন সোহেল বর্তমানে সুনামগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি তিনি জেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি এবং বর্তমান আহ্বায়ক কমিটির সদস্য হিসেবেও রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিচিত।
১৯৮৪ সালে জন্ম নেওয়া মল্লিক আহসান উদ্দিন সামীর শিক্ষাজীবন শুরু হয় নিজ এলাকায়। পরে তিনি সুনামগঞ্জের দ্বীনি সিনিয়র আলিম মডেল মাদ্রাসা থেকে দাখিল ও আলিম সম্পন্ন করেন। শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই তিনি মেধাবী ও শৃঙ্খলাপরায়ণ ছাত্র হিসেবে পরিচিত ছিলেন বলে জানান তার সহপাঠীরা। ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক শিক্ষায়ও তিনি নিজেকে সমানভাবে দক্ষ করে তোলেন।
উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি ভর্তি হন দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে লোকপ্রশাসন বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে প্রশাসন, রাষ্ট্র পরিচালনা ও জনসেবামূলক কর্মকাণ্ডের প্রতি তার আগ্রহ আরও গভীর হয়।
পরে ২৮তম বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়ে বাংলাদেশ পুলিশ ক্যাডারে যোগদান করেন তিনি। ২০১০ সালে সহকারী পুলিশ সুপার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করার পর থেকে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দায়িত্ব পালন করেছেন। সহকর্মীদের মতে, পেশাগত দক্ষতা, দায়িত্বশীলতা ও নেতৃত্বগুণের কারণে তিনি দ্রুতই পুলিশের অভ্যন্তরে একজন মেধাবী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিতি পান।
ডিএমপিতে দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত কাজে তিনি ভূমিকা রেখেছেন বলে জানা গেছে। তার সহকর্মীরা বলছেন, তিনি দায়িত্ব পালনে যেমন কঠোর, তেমনি সাধারণ মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণের জন্যও পরিচিত।
তার পরিবারও শিক্ষিত ও পেশাগতভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত। স্ত্রী সৈয়দা সুমাইয়া ইফা পেশায় একজন চিকিৎসক। পারিবারিকভাবে শিক্ষা ও জনসেবার পরিবেশে বেড়ে ওঠার কারণে মল্লিক আহসান উদ্দিন সামীর কর্মজীবনেও সেই প্রভাব লক্ষ্য করা যায় বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
অ্যাডভোকেট মল্লিক মো. মঈন উদ্দিন সোহেল তিন ছেলে ও এক মেয়ের জনক। পরিবারের অন্য সদস্যরাও নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। বড় মেয়ে মল্লিক সাহিদা বেগম লিনা বর্তমানে স্বামীর সঙ্গে যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন এবং সেখানে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত আছেন। দ্বিতীয় ছেলে মল্লিক শামসুদ্দিন জামী সোনালী ব্যাংকের সুনামগঞ্জ শাখায় প্রিন্সিপাল অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ছোট ছেলে মল্লিক ওয়াসি উদ্দিন তামী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে বর্তমানে লন্ডনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন।
মল্লিক আহসান উদ্দিন সামীর নতুন দায়িত্বপ্রাপ্তির খবরে সুনামগঞ্জের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে আনন্দের আবহ তৈরি হয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, হাওরাঞ্চলের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে উঠে এসে জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হওয়া তরুণদের জন্য অনুপ্রেরণার বিষয়।
জগন্নাথপুর এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, সামীর সাফল্য প্রমাণ করে যে, প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকেও কঠোর পরিশ্রম ও মেধার মাধ্যমে দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পৌঁছানো সম্ভব। তারা আশা করছেন, নতুন দায়িত্বেও তিনি সততা ও দক্ষতার সঙ্গে কাজ করবেন।
পুলিশ প্রশাসনের সাবেক কয়েকজন কর্মকর্তা বলছেন, বর্তমানে জেলা পুলিশ সুপার পদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জপূর্ণ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, মাদকবিরোধী অভিযান, সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং জনগণের সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক উন্নয়নে একজন এসপির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই জায়গায় মল্লিক আহসান উদ্দিন সামীর অভিজ্ঞতা তাকে কার্যকর নেতৃত্ব দিতে সহায়তা করবে বলে তাদের বিশ্বাস।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সময়ে প্রশাসনে দক্ষ ও জনবান্ধব কর্মকর্তার প্রয়োজনীয়তা অনেক বেড়েছে। জনগণের আস্থা অর্জন এবং প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক পুলিশিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে নতুন প্রজন্মের কর্মকর্তাদের বড় ভূমিকা রাখতে হবে।
নড়াইল জেলার পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে মল্লিক আহসান উদ্দিন সামীর কর্মজীবনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। সুনামগঞ্জের মানুষ এখন আশা করছেন, তিনি তার অভিজ্ঞতা ও পেশাগত দক্ষতা দিয়ে নতুন কর্মস্থলেও সাফল্যের স্বাক্ষর রাখবেন এবং দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবেন।


