প্রকাশ: ০৭ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
মৌলভীবাজার সদর উপজেলার হামরকোনা গ্রামের কাছে সড়ক ও গাইড ওয়ালের ভয়াবহ ধস এখন স্থানীয় মানুষের জন্য বড় আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন হাজারো মানুষ। স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, কর্মজীবী মানুষ, কৃষক ও ব্যবসায়ীরা অনিশ্চয়তার মধ্যে এই সড়ক ব্যবহার করছেন। বর্ষা মৌসুম ঘনিয়ে আসায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, অতিবৃষ্টি কিংবা পাহাড়ি ঢলের তীব্র স্রোতে যেকোনো সময় পুরো সড়ক ভেঙে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পরও অল্প সময়ের ব্যবধানে সড়ক ও গাইড ওয়াল ধসে পড়া শুধু অব্যবস্থাপনাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। তাদের অভিযোগ, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার এবং অপরিকল্পিত কাজের কারণেই এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ফলে সরকারি অর্থ ব্যয়ের সুফল না পেয়ে বরং নতুন দুর্ভোগে পড়েছেন এলাকাবাসী।
সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ) এবং স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সিলেট-ঢাকা আঞ্চলিক মহাসড়কের পুরাতন অংশটি কুশিয়ারা নদীর তীরঘেঁষে হামরকোনা ও দাউদপুর গ্রামের মধ্য দিয়ে বর্তমান মহাসড়কের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। ১৯৭৭ সালে ভয়াবহ বন্যার সময় প্রবল স্রোতে সড়কটির বড় অংশ ভেঙে যায়। পরে প্রায় এক কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিম দিকে ব্রাহ্মণগ্রাম পয়েন্ট দিয়ে নতুন সড়ক নির্মাণ করে মহাসড়ক স্থানান্তর করা হয়।
তবে পুরোনো সড়কটি পরবর্তীতে স্থানীয় মানুষের চলাচলের জন্য মেরামত করা হয়। হামরকোনা, দাউদপুর, নাদামপুর, শেখহাটি, ব্রাহ্মণগ্রাম ও মোবারকপুরসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে এই সড়ক ব্যবহার করে আসছেন। ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোগে বিভিন্ন সময়ে মাটি ভরাট ও ইট সলিংয়ের কাজও করা হয়। কিন্তু প্রতি বর্ষা মৌসুমেই পানির তীব্র স্রোতে সড়কে ভাঙন দেখা দেয়। এতে স্থানীয়রা প্রায়ই বন্যা ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার শঙ্কায় থাকতেন।
স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দাবি ও ভোগান্তির পর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২২-২৩ এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সড়কটি সংস্কার, নদীতীরে বল্লী স্থাপন এবং গাইড ওয়াল নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সওজ বিভাগ। দুই ধাপে প্রায় দুই কোটি ১৭ লাখ টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। তখন এলাকাবাসী আশাবাদী হয়েছিলেন যে বহু বছরের দুর্ভোগ হয়তো শেষ হতে যাচ্ছে।
কিন্তু বাস্তবতা সেই আশাকে টিকতে দেয়নি। সংস্কারকাজ শেষ হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই গাইড ওয়াল ও সড়কের বিভিন্ন অংশে ফাটল দেখা দেয়। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে তা ধসে পড়তে শুরু করে। বর্তমানে সড়কের একাধিক অংশ মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। অনেক জায়গায় পাকা সড়কের নিচের মাটি সরে গিয়ে ফাঁপা হয়ে পড়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কাজের মান নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন ছিল। এলাকাবাসীর ভাষ্য অনুযায়ী, নির্মাণকাজের সময় নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে এবং প্রকৌশলগত মানদণ্ড যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। সে সময় স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও কাজের অনিয়ম নিয়ে আলোচনা হয়েছিল।
হামরকোনা গ্রামের প্রবাসী রুবেল আহমদ বলেন, গত বছর বর্ষার সময় থেকেই ধস শুরু হয়। পরে তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগে বাঁশ পুঁতে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু চলতি বছর আবার অতিবৃষ্টি শুরু হলে বদ্ধ ফিশারির পানি ফুলে-ফেঁপে ওঠে এবং পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে যায়।
তিনি বলেন, “এখন মানুষ খুব আতঙ্কে আছে। সড়কটি পুরোপুরি ভেঙে গেলে আশপাশের গ্রামগুলো বন্যাকবলিত হয়ে পড়বে। আমরা চাই দ্রুত স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক।”
স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও সদর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সাবেক সদস্য আবুল হোসেন বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় স্থানীয়ভাবে অনেক অভিযোগ উঠেছিল। তিনি দাবি করেন, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে কাজের অনিয়ম ধামাচাপা দেওয়া হয়েছিল।
এদিকে সড়কের বর্তমান অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অভিভাবক ও শিক্ষকরাও। প্রতিদিন শত শত শিক্ষার্থী এই রাস্তা দিয়ে স্কুল-কলেজে যাতায়াত করে। অনেক অভিভাবক আশঙ্কা করছেন, যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, শুধু যোগাযোগ নয়, এই সড়ক এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও জড়িত। কৃষিপণ্য পরিবহন, বাজারে যাতায়াত এবং জরুরি সেবার জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। সড়কটি বন্ধ হয়ে গেলে কয়েকটি গ্রামের মানুষ মারাত্মক দুর্ভোগে পড়বেন।
মৌলভীবাজার সওজ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. কায়সার হামিদ বলেন, বিভিন্ন ধাপে হামরকোনা-দাউদপুর অংশে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। তবে সড়কের পাশের অংশ অত্যন্ত গভীর হওয়ায় এবং পানির তীব্র স্রোতের কারণে গাইড ওয়াল ও সড়কের কিছু অংশ ধসে পড়েছে।
তিনি জানান, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে স্থানীয়রা বলছেন, শুধু আশ্বাসে আর কাজ হবে না। বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই জরুরি ভিত্তিতে স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন। অন্যথায় যেকোনো সময় বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নদী বা জলাশয়সংলগ্ন এলাকায় সড়ক নির্মাণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, সঠিক নকশা এবং মানসম্পন্ন উপকরণ ব্যবহার অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় অল্প সময়ের মধ্যেই অবকাঠামো ঝুঁকির মুখে পড়ে।
হামরকোনার মানুষ এখন নতুন করে কোনো প্রতিশ্রুতি নয়, বরং কার্যকর উদ্যোগ দেখতে চান। কারণ তাদের কাছে এই সড়ক শুধু একটি যোগাযোগমাধ্যম নয়, বরং প্রতিদিনের জীবনযাত্রার নিরাপত্তা ও টিকে থাকার অন্যতম ভরসা।


