প্রকাশ: ০৭ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট নগরীতে এক বছর বয়সী একটি মালিকবিহীন বকনা বাছুরকে ঘিরে তৈরি হয়েছে ভিন্নধর্মী এক মানবিক গল্প। সাধারণত চুরি, ছিনতাই কিংবা অপরাধসংক্রান্ত খবরের মধ্যেই পুলিশের নাম বেশি আলোচিত হয়। কিন্তু এবার একটি হারিয়ে যাওয়া বাছুরের প্রকৃত মালিককে খুঁজে বের করতে আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি দিয়ে আলোচনায় এসেছে সিলেট মহানগর পুলিশ (এসএমপি)। ঘটনাটি স্থানীয়দের মধ্যে যেমন কৌতূহল সৃষ্টি করেছে, তেমনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও মানবিকতার এক ব্যতিক্রমী উদাহরণ হিসেবে প্রশংসা কুড়াচ্ছে।
বুধবার বিকেলে এসএমপির মিডিয়া সেল থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, দক্ষিণ সুরমা এলাকার ভার্থখলা পুরাতন পুলের কাছে একটি মালিকবিহীন বকনা বাছুর পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের মাধ্যমে খবর পেয়ে পুলিশ বাছুরটিকে উদ্ধার করে দক্ষিণ সুরমা পুলিশ ফাঁড়ির হেফাজতে নেয়। বর্তমানে সেটি পুলিশের তত্ত্বাবধানে নিরাপদে রয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বুধবার দুপুর প্রায় ২টার দিকে এলাকাবাসী বাছুরটিকে ঘোরাফেরা করতে দেখেন। আশপাশে অনেক খোঁজাখুঁজির পরও কোনো মালিকের সন্ধান না মেলায় বিষয়টি দক্ষিণ সুরমা থানাকে জানানো হয়। পরে পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে বাছুরটিকে উদ্ধার করেন।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, যদি কোনো ব্যক্তি ওই বাছুরটির প্রকৃত মালিক হয়ে থাকেন, তাহলে দক্ষিণ সুরমা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে অনুরোধ জানানো হয়েছে। এ জন্য যোগাযোগ নম্বরও প্রকাশ করেছে এসএমপি।
এমন একটি সংবাদ প্রকাশের পর নগরজুড়ে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুলিশের এই উদ্যোগকে মানবিক ও দায়িত্বশীল আচরণের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করছেন। আবার কেউ কেউ মজা করে মন্তব্য করলেও অধিকাংশ মানুষই বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। কারণ, সাধারণত পথ হারানো বা মালিকবিহীন গবাদিপশু নিয়ে প্রশাসনের সরাসরি উদ্যোগ খুব কমই দেখা যায়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, বাছুরটি হয়তো কোনো হাটে নেওয়ার পথে হারিয়ে গেছে অথবা কোনোভাবে দলছুট হয়ে পড়েছে। কেউ কেউ ধারণা করছেন, এটি হয়তো চুরি হওয়া কোনো গরুর বাচ্চাও হতে পারে। তাই প্রকৃত মালিক শনাক্ত করতে পুলিশের এমন প্রকাশ্য উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন তারা।
দক্ষিণ সুরমা এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা জানান, পুলিশ বাছুরটিকে শুধু উদ্ধার করেই দায়িত্ব শেষ করেনি; বরং সেটির দেখভাল ও নিরাপত্তাও নিশ্চিত করছে। স্থানীয়রা বলছেন, প্রাণীর প্রতিও সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধের এই আচরণ সাধারণ মানুষের আস্থা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।
একজন ব্যবসায়ী বলেন, “অনেক সময় হারিয়ে যাওয়া গরু বা বাছুর আর ফিরে পাওয়া যায় না। পুলিশ যদি এমন উদ্যোগ নেয়, তাহলে প্রকৃত মালিক অন্তত আশার জায়গা পায়।”
সামাজিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে গ্রামীণ ও প্রান্তিক পরিবারের জন্য গবাদিপশু শুধু সম্পদ নয়, বরং জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একটি গরু বা বাছুর হারিয়ে যাওয়া মানে অনেক পরিবারের জন্য বড় আর্থিক ক্ষতি। বিশেষ করে নিম্নআয়ের পরিবারগুলো গবাদিপশু পালনের মাধ্যমে সংসারের খরচ চালায় এবং ভবিষ্যতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করে। তাই হারিয়ে যাওয়া একটি বাছুরকে কেন্দ্র করে পুলিশের এমন উদ্যোগ সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন এলাকায় গবাদিপশু চুরি বাড়ছে। বিশেষ করে ঈদুল আজহা সামনে এলে গরু ও বাছুর চুরির ঘটনা অনেক সময় বেড়ে যায়। এ কারণে মালিকবিহীন প্রাণী পাওয়া গেলে তার প্রকৃত উৎস খুঁজে বের করা জরুরি। অন্যথায় চোরচক্র বা অবৈধ ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা থাকার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
সিলেট মহানগর পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, বিষয়টিকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। একটি প্রাণী যদি কারও জীবিকার অংশ হয়ে থাকে, তাহলে সেটিকে মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেওয়াও সামাজিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। তিনি বলেন, “আমরা চাই প্রকৃত মালিক যেন দ্রুত যোগাযোগ করেন। প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে বাছুরটি তার মালিকের কাছে হস্তান্তর করা হবে।”
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই পুলিশের এই উদ্যোগকে ইতিবাচক পুলিশিংয়ের উদাহরণ হিসেবে দেখছেন। কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন, “মানুষের পাশাপাশি প্রাণীর প্রতিও দায়িত্বশীল আচরণ সমাজে ইতিবাচক বার্তা দেয়।” আবার অনেকে মনে করছেন, এ ধরনের ছোট ছোট মানবিক উদ্যোগ পুলিশের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সম্পর্ক আরও আন্তরিক করতে সহায়ক হতে পারে।
বিশ্লেষকরা আরও বলছেন, আধুনিক পুলিশিং শুধু অপরাধ দমনেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং জনসেবা, মানবিক সহায়তা ও সামাজিক আস্থা তৈরি করাও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। হারিয়ে যাওয়া শিশু উদ্ধার, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো কিংবা মালিকবিহীন প্রাণীকে নিরাপদে রাখা—এসব কর্মকাণ্ড আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ইতিবাচক ভাবমূর্তি গঠনে ভূমিকা রাখে।
বর্তমানে বাছুরটি দক্ষিণ সুরমা পুলিশ ফাঁড়ির তত্ত্বাবধানে রয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, প্রকৃত মালিক উপযুক্ত প্রমাণসহ যোগাযোগ করলে প্রয়োজনীয় যাচাই শেষে বাছুরটি বুঝিয়ে দেওয়া হবে। তবে এখন পর্যন্ত কেউ মালিকানা দাবি করে যোগাযোগ করেছেন কি না, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।
একটি সাধারণ বাছুরকে ঘিরে শুরু হওয়া এই ঘটনা শেষ পর্যন্ত শুধু হারিয়ে যাওয়া প্রাণীর গল্প হয়ে থাকেনি; বরং এটি মানবিক দায়িত্ববোধ, সামাজিক সহমর্মিতা এবং ইতিবাচক পুলিশি উদ্যোগের এক ব্যতিক্রমী উদাহরণ হয়ে উঠেছে।


