প্রকাশ: ০৭ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বর্ণি এলাকার বিস্তীর্ণ ভূমিজুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা আধুনিক স্থাপনাগুলো একসময় ছিল নতুন স্বপ্নের প্রতীক। তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান, তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রত্যাশা নিয়ে নির্মিত হয়েছিল সিলেট হাইটেক পার্ক। বিশাল ভবন, প্রশস্ত সড়ক, আধুনিক অবকাঠামো আর পরিকল্পিত প্লট দেখে যে কেউ মনে করতে পারেন এটি দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় প্রযুক্তিনগরী। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। দীর্ঘদিন ধরে কার্যক্রমহীন অবস্থায় পড়ে থাকা পার্কটি যেন ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছিল এক নীরব, প্রাণহীন স্থাপনায়।
তবে দীর্ঘ অনিশ্চয়তার পর আবারও আশার আলো দেখা যাচ্ছে। সরকারিভাবে পার্কটিকে পুনরায় সচল করতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা গেলে সিলেট হাইটেক পার্ক আবারও প্রযুক্তিখাতের সম্ভাবনাময় কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
৩৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই হাইটেক পার্কের আয়তন প্রায় ১৬৩ একর। ২০২১ সালের ১২ ডিসেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে এর উদ্বোধন করেন। সে সময় বলা হয়েছিল, এটি হবে সিলেট অঞ্চলের তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের দ্বার। হাজারো তরুণ-তরুণী তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক চাকরি ও উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ পাবেন। স্থানীয় অর্থনীতিতেও আসবে বড় ধরনের পরিবর্তন।
কিন্তু উদ্বোধনের কয়েক বছর পরও সেই প্রত্যাশা বাস্তবে রূপ নেয়নি। পার্কের ভেতরে এখনো কর্মচাঞ্চল্যের বদলে বিরাজ করছে নীরবতা। অধিকাংশ প্লট ও ভবন কার্যত ব্যবহারহীন পড়ে আছে। হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান নামমাত্র কার্যক্রম চালালেও পূর্ণাঙ্গ শিল্প বা প্রযুক্তি কার্যক্রম শুরু হয়নি।
বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত আটটি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ৪৩ দশমিক ৮ একর জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া তিনটি প্রতিষ্ঠানকে ৯ হাজার ১০ বর্গফুট স্পেস বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এসব বরাদ্দের পরও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম শুরু করেনি। বর্তমানে কেবল একটি প্রতিষ্ঠান সীমিত পরিসরে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
পার্কে কার্যক্রম পরিচালনাকারী র্যাংগস ইলেকট্রনিক্স লিমিটেডের এজিএম মোরশেদ আলম বলেন, শুরুতে তাদেরকে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, গ্যাস ও নিরাপত্তা সুবিধার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তারা কোনো সুবিধাই পর্যাপ্তভাবে পাচ্ছেন না। তিনি বলেন, “লাইনে গ্যাস না থাকায় আমাদের সিলিন্ডারের গ্যাস দিয়ে উৎপাদন চালাতে হচ্ছে। এতে ব্যয় বাড়ছে এবং ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। আয় থেকে ব্যয়ই বেশি হয়ে যাচ্ছে।”
তিনি আরও জানান, শিল্প প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য স্থিতিশীল ইউটিলিটি সেবা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই নিশ্চয়তা না থাকায় নতুন বিনিয়োগকারীরাও আগ্রহ হারাচ্ছেন।
বাংলাদেশে তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে এগিয়ে নিতে ২০১৭ সালে দেশের ১২টি জেলায় আইটি ও হাইটেক পার্ক স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী তিন বছরের মধ্যে প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সাত বছর পরও অধিকাংশ প্রকল্পের অগ্রগতি আশানুরূপ হয়নি। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, সামগ্রিক অগ্রগতি মাত্র ৩৬ শতাংশ। কোনো কোনো জেলায় এই অগ্রগতি আরও কম।
সিলেটের পার্কটি তুলনামূলকভাবে কিছুটা এগিয়ে থাকলেও কার্যকর উৎপাদন বা প্রযুক্তি কার্যক্রমের ক্ষেত্রে সেটি এখনো পিছিয়ে। অবকাঠামোগত দুর্বলতা, বিনিয়োগকারীদের অনাগ্রহ, নীতিগত জটিলতা এবং প্রয়োজনীয় সেবার অভাবকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
এই অবস্থায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়া এবং সার্বিক অগ্রগতি সন্তোষজনক না থাকায় অন্তর্বর্তী সরকার সিলেটসহ চারটি জেলার হাইটেক পার্ক প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়। এতে স্থানীয়দের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়। কারণ, এই পার্ক ঘিরে সিলেটবাসী বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম বড় ধরনের কর্মসংস্থানের স্বপ্ন দেখছিল।
তবে সম্প্রতি প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী ও স্থানীয় সংসদ সদস্য আরিফুল হক চৌধুরী পার্কটি পরিদর্শন করেন। পরিদর্শন শেষে তিনি পার্কের বর্তমান অবস্থা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার তাগিদ দেন। তিনি বলেন, “পুরো বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে বর্তমান অবস্থা মূল্যায়ন করা হবে। এরপর মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে কীভাবে এটি কার্যকর করা যায় সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”
এদিকে পার্কটিকে সচল করতে সরকারিভাবে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সিলেট হাইটেক পার্কের সহকারী পরিচালক এসএম আল মামুন। তিনি বলেন, “সরকার হাইটেক পার্ক উন্নয়নের জন্য একটি কমিটি করেছে। কমিটির কিছু সুপারিশ ও সিদ্ধান্ত ইতোমধ্যে হয়েছে। এখন সেভাবেই কাজ এগিয়ে যাচ্ছে।”
তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরাও মনে করছেন, শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই হাইটেক পার্ক সফল হয় না। প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা, বিনিয়োগবান্ধব নীতি এবং দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ফরহাদ রাব্বি বলেন, “সিলেটের হাইটেক পার্কের জন্য আলাদা নীতিমালা প্রয়োজন। এখানে কী ধরনের প্রযুক্তি শিল্প গড়ে তোলা হবে, সেটি স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে মিল রেখে নির্ধারণ করতে হবে।”
তার মতে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনের জন্য কর ছাড়, সহজ অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ-গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় শুধু অবকাঠামো তৈরি করে রাখলে বিনিয়োগকারীরা এগিয়ে আসবেন না।
স্থানীয় তরুণদের মধ্যেও এই পার্ক নিয়ে এখনো আশাবাদ রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এটি সিলেট অঞ্চলের অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে দক্ষ তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হলে বিদেশমুখী প্রবণতাও কমতে পারে।
দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে সিলেট হাইটেক পার্কে আবারও প্রাণ ফিরবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। তবে সরকার, বিনিয়োগকারী এবং স্থানীয় অংশীজনদের সমন্বিত উদ্যোগ সফল হলে একসময় এই নীরব প্রকল্পই হয়তো সিলেটের প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থানের নতুন কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।


