প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলায় এক অন্তঃসত্ত্বা নারীর আল্ট্রাসনোগ্রাম রিপোর্ট ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে চরম বিভ্রান্তি ও আতঙ্কের ঘটনা, যা পরবর্তীতে পুনরায় পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে স্বস্তিতে রূপ নেয়। একটি ছোট্ট টাইপিং ভুল কীভাবে একটি পরিবারের মধ্যে গভীর উদ্বেগ, মানসিক চাপ এবং অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে—এই ঘটনাটি তারই বাস্তব উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
ভুক্তভোগী সামিরা বেগম (২৩), স্থানীয় মুছেগুল গ্রামের বাসিন্দা এবং এমদাদুল ইসলাম শাফির স্ত্রী। গত ১৪ এপ্রিল তিনি স্থানীয় শাহজালাল ডায়াগনস্টিক সেন্টার-এ আল্ট্রাসনোগ্রাম করান। রিপোর্টে চিকিৎসক ডা. অন্তরা রায় পূজা ‘সিঙ্গেল লাইভ প্রেগন্যান্সি’ এবং ভ্রূণের হৃদস্পন্দন ১৪৩ বিট পার মিনিট (বিপিএম) উল্লেখ করলেও, একই রিপোর্টে ‘ফিটাল মুভমেন্ট অ্যাবসেন্ট’ এবং ‘কার্ডিয়াক পালসেশন অ্যাবসেন্ট’ লেখা ছিল। এই পরস্পরবিরোধী তথ্যই মূলত বিভ্রান্তির সূত্রপাত ঘটায়।
সামিরার স্বামী এমদাদুল ইসলাম শাফি জানান, রিপোর্টটি হাতে পাওয়ার পর তারা বিষয়টি বুঝতে না পেরে স্থানীয় আরেক চিকিৎসক ডা. প্রিয়াংকা ভট্টাচার্য-এর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তবে সরাসরি না দেখিয়ে হোয়াটসঅ্যাপে রিপোর্ট পাঠানো হয়। রিপোর্টে ‘অ্যাবসেন্ট’ শব্দগুলো দেখে ওই চিকিৎসক প্রাথমিকভাবে গর্ভস্থ শিশুকে মৃত বলে ধারণা করেন এবং দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দেন।
এই একটি মুহূর্তেই পুরো পরিবারে নেমে আসে গভীর উদ্বেগ ও আতঙ্ক। স্বজনদের মধ্যে কান্না, দুশ্চিন্তা এবং অনিশ্চয়তা ভর করে। শাফির ভাষায়, সেই রাতটি ছিল তাদের জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোর একটি। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ক্লিনিকে ভর্তি হয়ে দ্রুত ডেলিভারি করানোর কথাও ভাবতে শুরু করেন তারা।
তবে পরদিন পরিস্থিতির মোড় ঘুরে যায়। তারা সিলেটের মা ও শিশু হাসপাতাল-এ পুনরায় আল্ট্রাসনোগ্রাম করান। সেখানে দেখা যায়, গর্ভস্থ শিশুর হার্টবিট স্বাভাবিক, ১৩৬ বিপিএম, এবং শিশুর নড়াচড়াও স্বাভাবিক রয়েছে। প্রায় ২৯ সপ্তাহ বয়সী ভ্রূণের অবস্থান ‘সেফালিক’, প্লাসেন্টা ‘অ্যান্টেরিয়র’ এবং গর্ভের পানির পরিমাণও স্বাভাবিক পাওয়া যায়। এতে করে পরিবারের মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসে।
এই ঘটনার পর শাহজালাল ডায়াগনস্টিক সেন্টার কর্তৃপক্ষ লিখিতভাবে দুঃখ প্রকাশ করে। তাদের ব্যাখ্যায় বলা হয়, এটি একটি অনিচ্ছাকৃত টাইপিং ভুল, যা ডাটা এন্ট্রি অপারেটরের অসাবধানতা এবং সফটওয়্যার ত্রুটির কারণে হয়েছে। রিপোর্টের মূল পর্যবেক্ষণে ‘লাইভ প্রেগন্যান্সি’ ও হৃদস্পন্দনের সঠিক তথ্য ছিল, কিন্তু ভুলক্রমে ‘প্রেজেন্ট’-এর জায়গায় ‘অ্যাবসেন্ট’ শব্দটি মুদ্রিত হয়।
চিকিৎসক ডা. অন্তরা রায় পূজা নিজেও বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, এটি সম্পূর্ণ টাইপিংজনিত ভুল। তিনি জানান, রিপোর্টের নিচের মন্তব্য অংশে সঠিক তথ্য উল্লেখ ছিল, যা ভালোভাবে লক্ষ্য করলে বিভ্রান্তি এড়ানো যেত। একই সঙ্গে তিনি পরামর্শ দেন, এ ধরনের ক্ষেত্রে পুনরায় পরীক্ষা করানো উচিত ছিল।
অন্যদিকে ডা. প্রিয়াংকা ভট্টাচার্য বলেন, রিপোর্টটি সরাসরি হাতে না পেয়ে এবং রোগীর স্বামীর কাছ থেকে শিশুর নড়াচড়া কমে যাওয়ার কথা শুনে তিনি দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন। পরে তিনি স্বীকার করেন, রিপোর্টটি আরও ভালোভাবে যাচাই করা উচিত ছিল এবং পুনরায় আল্ট্রাসনোগ্রামের পরামর্শ দেওয়া উচিত ছিল। তিনি বলেন, পরে শিশুর সুস্থতার খবর শুনে তিনি স্বস্তি পেয়েছেন।
এ বিষয়ে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক মত দেন, এই ঘটনাটি চিকিৎসা ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে সতর্কতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। তিনি বলেন, একটি রিপোর্ট তৈরির সময় যেমন সর্বোচ্চ সতর্কতা প্রয়োজন, তেমনি সেটি মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও গভীর মনোযোগ জরুরি। বিশেষ করে যখন রিপোর্টে পরস্পরবিরোধী তথ্য থাকে, তখন পুনরায় পরীক্ষা ছাড়া সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
এই ঘটনার মধ্য দিয়ে স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত ভুলের সম্ভাবনা এবং তার প্রভাব আবারও সামনে এসেছে। একটি ছোট ভুল কীভাবে একটি পরিবারের মানসিক স্বাস্থ্যে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে, তা এই ঘটনার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে। একই সঙ্গে এটি চিকিৎসক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং রোগী—সব পক্ষের জন্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হয়ে থাকছে।
সবশেষে বলা যায়, আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় প্রযুক্তির ব্যবহার যেমন দ্রুততা ও নির্ভুলতা বাড়িয়েছে, তেমনি সামান্য অসতর্কতাও বড় ধরনের বিভ্রান্তির কারণ হতে পারে। তাই প্রতিটি ধাপে দায়িত্বশীলতা ও সচেতনতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।


