ভিসা পেতে ভুয়া নির্যাতনের অভিযোগ, উদ্বেগ যুক্তরাজ্যে

প্রকাশ: ১৮  এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।

যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ পেতে একদল অভিবাসীর বিরুদ্ধে পারিবারিক সহিংসতার ভুয়া অভিযোগ তোলার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি-এর এক বিস্তৃত অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, প্রকৃত নির্যাতনের শিকারদের সুরক্ষা দিতে তৈরি করা আইনি ব্যবস্থাকেই এখন একটি অসাধু চক্র নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে। ফলে একদিকে যেমন প্রকৃত ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে নির্দোষ অনেক ব্রিটিশ নাগরিকও মিথ্যা অভিযোগের শিকার হয়ে জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছেন।

অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যের হোম অফিস পারিবারিক সহিংসতার শিকার অভিবাসীদের জন্য একটি বিশেষ সুবিধা চালু করেছিল, যার মাধ্যমে তারা দ্রুত স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পেতে পারেন। এই ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য ছিল এমন অভিবাসীদের সুরক্ষা দেওয়া, যারা ব্রিটিশ নাগরিক সঙ্গীর ওপর নির্ভরশীল অবস্থায় নির্যাতনের শিকার হন এবং সম্পর্ক ভেঙে গেলে ঝুঁকির মধ্যে পড়েন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সুবিধাকেই কিছু অসাধু ব্যক্তি ও চক্র প্রতারণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার শুরু করেছে।

বিবিসির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, অনেক অভিবাসী প্রথমে ব্রিটিশ নাগরিকদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন বা বিয়ে করেন। এরপর যুক্তরাজ্যে প্রবেশের পর, সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে বা পরিকল্পিতভাবে সঙ্গীর বিরুদ্ধে পারিবারিক সহিংসতার অভিযোগ তোলেন। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে তারা দ্রুত আইনি সুবিধা গ্রহণ করে দেশটিতে স্থায়ী হওয়ার পথ তৈরি করেন।

এই পুরো প্রক্রিয়ায় কিছু অসাধু আইনি পরামর্শকও জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অনলাইনে সক্রিয় কিছু ব্যক্তি অভিবাসীদের সরাসরি ভুয়া গল্প বানিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেন। এমনকি নির্যাতনের কোনো প্রমাণ না থাকলেও কীভাবে ‘মানসিক নির্যাতন’ বা ‘আবেগগত চাপ’ দেখিয়ে একটি বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ তৈরি করা যায়, সে বিষয়ে বিস্তারিত পরামর্শ দেওয়া হয়।

একটি ঘটনায় দেখা যায়, একজন তথাকথিত অভিবাসন পরামর্শদাতা ৯০০ পাউন্ডের বিনিময়ে একটি সম্পূর্ণ ভুয়া নির্যাতনের অভিযোগ তৈরি করে দেওয়ার প্রস্তাব দেন। তিনি ক্লায়েন্টকে আশ্বস্ত করেন যে, হোম অফিসকে বোঝানোর জন্য একটি ‘গল্প’ বানানো হবে এবং সেটির ভিত্তিতে আবেদন করলে অনুমোদন পাওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি। পরবর্তীতে জানা যায়, ওই ক্লায়েন্ট আসলে ছদ্মবেশে থাকা এক অনুসন্ধানী সাংবাদিক ছিলেন।

আইনজীবীদের মতে, এই ধরনের প্রতারণা সম্ভব হচ্ছে মূলত যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার দুর্বলতার কারণে। অনেক ক্ষেত্রে সামান্য প্রমাণ বা একতরফা অভিযোগের ভিত্তিতেই আবেদন গ্রহণ করা হচ্ছে। ফলে প্রকৃত তদন্তের আগেই আবেদনকারীরা প্রাথমিক সুবিধা পেয়ে যাচ্ছেন। বিশেষ করে পারিবারিক সহিংসতার অভিযোগে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কারণে অনেক সময় বিস্তারিত যাচাই করা সম্ভব হয় না।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই ধরনের আবেদনের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক বছরে পাঁচ হাজার ৫০০-এর বেশি অভিবাসী পারিবারিক সহিংসতার অভিযোগের ভিত্তিতে স্থায়ী বসবাসের আবেদন করেছেন, যা মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে ৫০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বৃদ্ধির হার সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

এই পরিস্থিতির মানবিক দিকটিও অত্যন্ত জটিল। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, অনেক ব্রিটিশ নাগরিক অজান্তেই এমন সম্পর্কের মধ্যে জড়িয়ে পড়ছেন, যা পরবর্তীতে তাদের জন্য ভয়াবহ অভিজ্ঞতা হয়ে দাঁড়ায়। একাধিক ঘটনায় দেখা গেছে, সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর অভিবাসী সঙ্গী উল্টো নির্যাতনের অভিযোগ এনে নিজেকে ভুক্তভোগী হিসেবে উপস্থাপন করছেন।

এমনই এক ভুক্তভোগীর অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে, যেখানে এক ব্রিটিশ নারী অভিযোগ করেন, তার সাবেক স্বামী তার বিরুদ্ধে মিথ্যা নির্যাতনের অভিযোগ এনে যুক্তরাজ্যে থাকার সুযোগ পেয়েছেন। যদিও পুলিশ তদন্তে তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি, তবুও সেই অভিযোগই আইনি প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত হয়েছে। এই ঘটনাকে তিনি নিজের জীবনের সবচেয়ে কঠিন অভিজ্ঞতা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অভিবাসন আইনে এই ধরনের আবেদনের ক্ষেত্রে অপরাধ প্রমাণ হওয়া বাধ্যতামূলক নয়, যা অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে। অনেক ক্ষেত্রে শুধু অভিযোগের ভিত্তিতেই প্রাথমিক সুবিধা দেওয়া হয়, যা পরে স্থায়ী বসবাসের পথে রূপ নেয়।

এ বিষয়ে যুক্তরাজ্যের মন্ত্রী জেস ফিলিপস বলেছেন, প্রকৃত নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের রক্ষার জন্য তৈরি করা এই ব্যবস্থার অপব্যবহার অত্যন্ত লজ্জাজনক। তিনি স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছেন, ভুয়া অভিযোগের মাধ্যমে যুক্তরাজ্যে থাকার চেষ্টা করলে আবেদন বাতিল করা হবে এবং সংশ্লিষ্টদের বহিষ্কার করা হবে। একই সঙ্গে প্রতারণায় জড়িত ভুয়া আইনজীবী বা পরামর্শদাতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান তিনি।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নতুন করে নীতিমালা পর্যালোচনা করছে বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে অভিবাসন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, অতিরিক্ত কঠোরতা প্রয়োগ করলে প্রকৃত ভুক্তভোগীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। তাই একটি ভারসাম্যপূর্ণ এবং কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

সব মিলিয়ে যুক্তরাজ্যে ভিসা ও স্থায়ী বসবাসের সুযোগকে ঘিরে এই নতুন বাস্তবতা অভিবাসন নীতির জটিলতাকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে। মানবিক সহায়তার উদ্দেশ্যে তৈরি একটি ব্যবস্থা যখন প্রতারণার হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন তা শুধু আইনি কাঠামোকেই নয়, বরং সমাজের আস্থাকেও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

ফাহিমা হত্যার বিচার ১৫ দিনের মধ্যে শেষ করতে হবে: ডা. শফিকুর রহমান

প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

জাফলং ভ্রমণেই শেষ যাত্রা, নদীতে ডুবে কিশোরের মৃত্যু

প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে ৬০ কিমি বেগে ঝড়ের সতর্কতা

প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

কালনী নদী এখন প্লাস্টিকের ভাগাড়

প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

দেশ ভালো নেই’—সিলেটে ডা. শফিকুরের মন্তব্য

প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিষয়বস্তু

জাফলং ভ্রমণেই শেষ যাত্রা, নদীতে ডুবে কিশোরের মৃত্যু

প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে ৬০ কিমি বেগে ঝড়ের সতর্কতা

প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

কালনী নদী এখন প্লাস্টিকের ভাগাড়

প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

দেশ ভালো নেই’—সিলেটে ডা. শফিকুরের মন্তব্য

প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ছাতক বড় কাপন পয়েন্টে সংঘর্ষ, আহত অন্তত ১৫

প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেট রেলস্টেশন এলাকায় শিশুধর্ষণের অভিযোগ, আটক ১

প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ