প্রকাশ: ২৫ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট বিভাগে হামের প্রকোপ ক্রমেই উদ্বেগজনক রূপ নিচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও তিন শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় জনমনে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। শিশুদের মৃত্যুর এই ধারাবাহিকতা শুধু স্বাস্থ্যখাতের জন্য নয়, পুরো সমাজের জন্যই গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সোমবার (২৫ মে) সকালে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। সর্বশেষ তিন শিশুর মৃত্যুর পর চলতি বছরে সিলেট বিভাগে হামে আক্রান্ত হয়ে বা হামের উপসর্গ নিয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৫ জনে।
স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মারা যাওয়া তিন শিশুর মধ্যে দুজন সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং একজন শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। নিহত শিশুদের মধ্যে রয়েছে সুনামগঞ্জ জেলার দোয়ারাবাজার উপজেলার আফসরনগর এলাকার রমজান আলীর ১৪ মাস বয়সী ছেলে মহসিন, সিলেট সদর উপজেলার পীরেরগাঁও এলাকার মাজেদের আট মাস বয়সী ছেলে মাজহারুল এবং মৌলভীবাজার সদর উপজেলার বড়কাপন এলাকার মিলু মিয়ার মাত্র চার মাস বয়সী কন্যাশিশু তানিয়া।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, শিশু তিনজনই জ্বর, শ্বাসকষ্ট, শরীরে লালচে দানা এবং দুর্বলতাসহ হামের বিভিন্ন উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। তাদের অবস্থা দ্রুত অবনতি হওয়ায় নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হলেও শেষ পর্যন্ত বাঁচানো সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে অল্প বয়সী শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় তারা দ্রুত জটিলতায় আক্রান্ত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন অন্তত ২৭০ জন রোগী। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৫৮ জন সন্দেহভাজন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় আরও পাঁচজনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৫ মে পর্যন্ত সিলেট বিভাগে মোট ১৬৪ জন ল্যাব-নিশ্চিত হাম রোগী শনাক্ত হয়েছেন।
তবে স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, বাস্তবে আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। কারণ অনেক রোগী প্রাথমিক পর্যায়ে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নিচ্ছেন অথবা পরীক্ষার আওতায় আসছেন না। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে সচেতনতার অভাব, দারিদ্র্য এবং স্বাস্থ্যসেবায় সীমিত প্রবেশাধিকারের কারণে প্রকৃত পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চিকিৎসকদের মতে, হাম সাধারণত ভাইরাসজনিত একটি অত্যন্ত সংক্রামক রোগ। এটি মূলত শিশুদের বেশি আক্রান্ত করলেও টিকাবিহীন যেকোনো বয়সী মানুষও আক্রান্ত হতে পারেন। শুরুতে জ্বর, কাশি, সর্দি ও চোখ লাল হওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। পরে শরীরে লালচে দানা ওঠে। অনেক ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, শ্বাসকষ্ট কিংবা মস্তিষ্কে সংক্রমণের মতো জটিলতা তৈরি হয়ে মৃত্যুঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, টিকাদান কার্যক্রমে ঘাটতি এবং অনেক পরিবারের অবহেলা পরিস্থিতিকে আরও সংকটময় করে তুলছে। স্বাস্থ্যকর্মীরা জানান, অনেক অভিভাবক এখনও শিশুদের নিয়মিত টিকা দিতে অনীহা প্রকাশ করেন অথবা সময়মতো স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যান না। ফলে শিশুরা ঝুঁকির মধ্যে থেকে যাচ্ছে।
সিলেটের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিশুদের অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেক পরিবার প্রথমদিকে সাধারণ জ্বর বা ঠান্ডা ভেবে স্থানীয় ফার্মেসি থেকে ওষুধ খাইয়েছেন। পরে অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতালে নিয়ে আসেন। এতে চিকিৎসা শুরু হতে দেরি হওয়ায় জটিলতা বাড়ছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের মতো সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে দ্রুত শনাক্তকরণ, আক্রান্তকে আলাদা রাখা এবং গণটিকাদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একইসঙ্গে শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করা এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশ বজায় রাখাও প্রয়োজন। তারা সতর্ক করে বলেন, একটি শিশু আক্রান্ত হলে পরিবারের অন্য শিশুরাও দ্রুত সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে।
এদিকে সিলেট বিভাগে একের পর এক শিশুমৃত্যুর ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও উদ্বেগ বাড়ছে। অনেকেই স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা, টিকাদান কার্যক্রমের কার্যকারিতা এবং জনসচেতনতার ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। সচেতন মহল বলছে, শুধু হাসপাতালে চিকিৎসা দিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা সম্ভব নয়; গ্রামপর্যায়ে ব্যাপক সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইতোমধ্যে হাসপাতালগুলোতে বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। আক্রান্ত শিশুদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করতে মাঠপর্যায়ে কাজ করছে স্বাস্থ্যকর্মীরা। পাশাপাশি অভিভাবকদের আতঙ্কিত না হয়ে শিশুদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
সিলেটের জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকরা মনে করছেন, করোনা মহামারির পর অনেক এলাকায় নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছিল। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এখন দৃশ্যমান হতে পারে। কারণ টিকাবঞ্চিত শিশুদের সংখ্যা বাড়লে হাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
মানবিক দিক থেকেও এই পরিস্থিতি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। যেসব পরিবার তাদের শিশু সন্তানকে হারিয়েছে, তাদের কান্না ও শোক পুরো সমাজকে নাড়িয়ে দিচ্ছে। মাত্র কয়েক মাস কিংবা এক বছরের শিশুর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, একটি সমাজের অপূরণীয় ক্ষতি। চিকিৎসকরা বলছেন, সময়মতো টিকা ও দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হাম প্রতিরোধযোগ্য।
সিলেটের সচেতন নাগরিকরা এখন দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপের দাবি জানাচ্ছেন। তারা বলছেন, পরিস্থিতি অবহেলা করার সুযোগ নেই। কারণ শিশুদের জীবন রক্ষা করতে হলে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। স্বাস্থ্যখাতের পাশাপাশি পরিবার ও সমাজকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
সিলেটে একের পর এক শিশুমৃত্যুর এই ঘটনা আবারও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে—জনস্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু হাসপাতাল নয়, প্রতিটি পরিবারকেও সচেতন হতে হবে। শিশুদের সুস্থ ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে টিকাদান, সচেতনতা এবং দ্রুত চিকিৎসার কোনো বিকল্প নেই।


