প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলায় বনবিভাগের এক অভিযানে পাচারকৃত আকাশমনি গাছের গোলকাঠসহ একটি সিএনজি অটোরিকশা জব্দের ঘটনা স্থানীয়ভাবে বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ভোরের নীরবতা ভেঙে চালানো এই অভিযানে বন কর্মকর্তাদের তৎপরতা যেমন নজর কেড়েছে, তেমনি অবৈধ বনজ সম্পদ পাচার চক্রের সক্রিয়তা নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বনবিভাগ সূত্রে জানা গেছে, শনিবার ভোরে উপজেলার পুটিজুরি বিট এলাকার ৭৭ মুখ নামক স্থানে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে নেতৃত্ব দেন বিট কর্মকর্তা মিনহাজ উদ্দিন। তার সঙ্গে বনবিভাগের একটি টিম অংশ নেয়, যারা আগে থেকেই সম্ভাব্য পাচার রুট চিহ্নিত করে অবস্থান নেয়। দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকায় কাঠ পাচারের অভিযোগ থাকায় বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছিল।
অভিযানের একপর্যায়ে একটি সিএনজি অটোরিকশাকে সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তল্লাশি চালিয়ে দেখা যায়, গাড়িটির ভেতরে লুকিয়ে রাখা হয়েছে আকাশমনি গাছের সাতটি গোলকাঠ। পরিমাপ করে দেখা যায়, মোট কাঠের পরিমাণ ১১ দশমিক ৮৯ ঘনফুট। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, এসব কাঠ স্থানীয় বনাঞ্চল থেকে অবৈধভাবে কেটে সংগ্রহ করা হয়েছে এবং অন্যত্র পাচারের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল।
তবে বন কর্মকর্তাদের উপস্থিতি টের পেয়ে কাঠ পাচারকারীরা দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে পালিয়ে যায়। ফলে কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি। এ ঘটনায় বনবিভাগের কর্মকর্তারা দুঃখ প্রকাশ করলেও তারা জানান, অভিযানের মূল উদ্দেশ্য ছিল পাচারকৃত কাঠ উদ্ধার করা এবং সেই লক্ষ্য পূরণ হয়েছে। পাশাপাশি জড়িতদের শনাক্ত করতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
শায়েস্তাগঞ্জ রেঞ্জ কর্মকর্তা তোফায়েল আহমেদ চৌধুরী জানান, বনবিভাগ নিয়মিতভাবে এ ধরনের অভিযান পরিচালনা করছে। তিনি বলেন, “গোপন সংবাদের ভিত্তিতে আমরা দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করি এবং কাঠসহ একটি সিএনজি জব্দ করতে সক্ষম হই। তবে জড়িত ব্যক্তিরা পালিয়ে গেছে। আমরা তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে কাজ করছি।”
তিনি আরও জানান, জব্দ করা কাঠ ও সিএনজি বর্তমানে রেঞ্জ কার্যালয়ের হেফাজতে রাখা হয়েছে এবং এ বিষয়ে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বন আইনে মামলা দায়েরের প্রস্তুতিও চলছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পুটিজুরি ও আশপাশের এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বনজ সম্পদ পাচারের একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে। তারা গভীর রাতে বা ভোরের দিকে বনাঞ্চল থেকে গাছ কেটে বিভিন্ন পরিবহনে করে অন্যত্র নিয়ে যায়। অনেক সময় স্থানীয়দের অগোচরে এসব কার্যক্রম পরিচালিত হয়, আবার কখনো স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রছায়াতেও এ ধরনের কর্মকাণ্ড ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরিবেশবিদদের মতে, আকাশমনি গাছ দ্রুত বর্ধনশীল হলেও নির্বিচারে কাটার ফলে বনাঞ্চলের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। এ ধরনের অবৈধ কার্যক্রম শুধু পরিবেশের জন্যই নয়, বরং স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। তারা মনে করেন, নিয়মিত অভিযান এবং কঠোর নজরদারি ছাড়া এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, বনভূমি রক্ষায় শুধু প্রশাসনের উদ্যোগই যথেষ্ট নয়, স্থানীয় জনগণের সচেতনতা এবং অংশগ্রহণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বনজ সম্পদ রক্ষায় সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা গেলে পাচারকারীদের কার্যক্রম অনেকটাই কমে আসবে।
এদিকে সাম্প্রতিক এই অভিযানকে বনবিভাগের একটি ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন সচেতন মহল। তবে তারা মনে করছেন, শুধু কাঠ জব্দ করলেই হবে না, বরং এর সঙ্গে জড়িত মূল হোতাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। তা না হলে এ ধরনের ঘটনা বারবার ঘটতে থাকবে।
সব মিলিয়ে হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জে এই অভিযান আবারও প্রমাণ করেছে, বনজ সম্পদ রক্ষায় প্রশাসনের নজরদারি জোরদার করা জরুরি। একই সঙ্গে পরিবেশ রক্ষায় সবাইকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বনভূমি শুধু কাঠের উৎস নয়, এটি একটি দেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ—এ সত্য উপলব্ধি করেই ভবিষ্যতের পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।


