প্রকাশ: ১৭ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
গ্রীষ্মের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে, কিন্তু সেই অনুপাতে উৎপাদন সক্ষমতা না বাড়ায় জাতীয় গ্রিডে তৈরি হয়েছে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি। ফলে আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে লোডশেডিং পরিস্থিতি, যা শহর থেকে গ্রাম—সর্বত্রই ভোগান্তি বাড়াচ্ছে।
বিদ্যুৎ খাতের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, বর্তমানে পিক আওয়ারে, বিশেষ করে সন্ধ্যার সময়, দেশের বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৫ হাজার থেকে সাড়ে ১৫ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাচ্ছে। তবে উৎপাদন সেই চাহিদার তুলনায় কম থাকায় প্রায় দুই হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, যা সরাসরি লোডশেডিংয়ের মাধ্যমে সামাল দিতে হচ্ছে।
চাহিদা বৃদ্ধির এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে চলতি মৌসুমে দেশের বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রীষ্মের তীব্র গরম, কৃষি সেচের চাহিদা এবং শিল্প খাতে বাড়তি ব্যবহারের কারণে বিদ্যুৎ খাতে চাপ ক্রমেই বাড়ছে।
এ অবস্থায় শহরাঞ্চলে তুলনামূলকভাবে কম সময়ের জন্য লোডশেডিং করা হলেও মফস্বল ও গ্রামীণ এলাকাগুলোতে ঘন ঘন এবং দীর্ঘ সময়ের বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিচ্ছে। অনেক এলাকায় দিনে একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় জনজীবনে চরম অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং কৃষিকাজেও এর প্রভাব পড়ছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির একাধিক কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ বরাদ্দ না পাওয়ায় বাধ্য হয়েই বিভিন্ন এলাকায় রেশনিং পদ্ধতিতে লোডশেডিং করতে হচ্ছে। তাদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে কয়লাভিত্তিক কিছু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জ্বালানি সংকট এবং কয়েকটি ইউনিটের রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। যদিও এরই মধ্যে কিছু কেন্দ্র পুনরায় উৎপাদনে ফিরেছে, তবুও সরবরাহ পরিস্থিতি পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়নি।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে। বিপিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহরুল ইসলাম বলেন, কয়লাভিত্তিক কিছু ইউনিট সাময়িকভাবে রক্ষণাবেক্ষণে থাকায় উৎপাদনে ঘাটতি তৈরি হয়েছিল। এর মধ্যে আদানি পাওয়ার ও রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কয়েকটি ইউনিট পুনরায় চালু হয়েছে। তবে এসএস পাওয়ার ও মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্রে কয়লা সরবরাহের সংকট এখনো পুরোপুরি কাটেনি।
তিনি আরও জানান, ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতেও দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি ঘাটতি রয়েছে। বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে এসব কেন্দ্রের প্রয়োজনীয় তেল আমদানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোও পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। সব মিলিয়ে সামগ্রিক উৎপাদন ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে।
পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার রাতের দিকে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল প্রায় ১২ হাজার ৯০০ মেগাওয়াট, যেখানে উৎপাদন হয় ১২ হাজার ৪৬২ মেগাওয়াট। ফলে প্রায় ৪১৮ মেগাওয়াট ঘাটতি সামাল দিতে লোডশেডিং করতে হয়। একই দিন দিনের বিভিন্ন সময়ে ঘাটতি ১ হাজার থেকে প্রায় ১ হাজার ৯০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত ওঠানামা করেছে।
এর আগের দিনও একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা যায়, যেখানে চাহিদা ও উৎপাদনের ব্যবধান অনুযায়ী ৫০০ থেকে প্রায় ১ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হয়। ফলে টানা কয়েকদিন ধরেই বিদ্যুৎ সরবরাহে অস্থিতিশীলতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
বিপিডিবি সূত্র জানিয়েছে, রক্ষণাবেক্ষণে থাকা কয়লাভিত্তিক ইউনিটগুলো আবারও উৎপাদনে ফিরেছে। বিশেষ করে আদানি পাওয়ার থেকে এক হাজার ৪৮০ মেগাওয়াট এবং রামপাল কেন্দ্র থেকে এক হাজার ১০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে। এতে পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতির দিকে যাচ্ছে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে এসএস পাওয়ার প্লান্ট এবং কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ী তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র এখনো সম্পূর্ণভাবে স্থিতিশীল উৎপাদনে ফিরতে পারেনি। মাতারবাড়ী কেন্দ্রের জন্য কয়লাবাহী একটি জাহাজ ইতোমধ্যে পৌঁছালেও পুরোপুরি উৎপাদন স্বাভাবিক হতে আরও কিছু সময় লাগতে পারে বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র মালিকরা জানিয়েছেন, সরকারের কাছে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার বকেয়া পাওনা থাকায় জ্বালানি তেল আমদানিতে সমস্যা হচ্ছে। ফলে অনেক কেন্দ্র সীমিত পরিসরে উৎপাদন চালিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছে। বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র মালিকদের সংগঠন বিআইপিপিএ জানিয়েছে, বর্তমান মজুদ দিয়ে রেশনিং করে আগামী মে মাস পর্যন্ত উৎপাদন চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা বলছেন, গ্রীষ্মের এই সময়ে চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্য রক্ষা না হলে লোডশেডিং আরও তীব্র হতে পারে। বিশেষ করে শিল্প উৎপাদন, কৃষি সেচ এবং নগর জীবনে এর প্রভাব বহুমাত্রিক হয়ে উঠতে পারে।
তারা মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সমাধানের জন্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, কেন্দ্রগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী করা জরুরি। অন্যথায় প্রতি বছর গ্রীষ্ম মৌসুমে একই ধরনের সংকট পুনরাবৃত্তি হতে পারে।
সব মিলিয়ে দেশের বিদ্যুৎ খাতে বিদ্যমান এই ঘাটতি জনজীবনে নতুন করে চাপ তৈরি করেছে। পরিস্থিতি দ্রুত উন্নতি না হলে আগামী দিনগুলোতে লোডশেডিং আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।


