প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন দিগন্ত উন্মোচনের পথে এগোচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত সিলেট-চারখাই-শেওলা মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্প। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অর্থনীতি, বাণিজ্য, পর্যটন এবং সীমান্ত যোগাযোগকে আরও গতিশীল করতে সরকার এই মেগা প্রকল্পে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের অনুমোদন দিয়েছে। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের প্রস্তাবের ভিত্তিতে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি এই বিশাল প্রকল্পের পূর্ত কাজের অনুমোদন দেয়, যা সিলেটবাসীর জন্য একটি বড় উন্নয়ন অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বুধবার (২০ মে) অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে প্রকল্পটির ব্যয় অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রকল্পের আওতায় সিলেট নগরীর কদমতলী এলাকা থেকে গোলাপগঞ্জ হয়ে চারখাই পর্যন্ত মহাসড়ককে ছয় লেনে উন্নীত করা হবে। একইসঙ্গে চারখাই থেকে শেওলা সেতু হয়ে শেওলা স্থলবন্দর পর্যন্ত সড়কও উন্নত ও প্রশস্ত করা হবে। পুরো মহাসড়কের দৈর্ঘ্য ধরা হয়েছে প্রায় ৪২ দশমিক ৯৮৫ কিলোমিটার।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সিলেট অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে সীমান্ত বাণিজ্যের ক্ষেত্রে শেওলা স্থলবন্দর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সড়কের ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি পেলে পণ্য পরিবহন সহজ হবে এবং সময় ও খরচ উভয়ই কমে আসবে। পাশাপাশি দেশের অন্যতম পর্যটন অঞ্চল সিলেটে যাতায়াত আরও দ্রুত ও নিরাপদ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রকল্পটি প্রথম জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ২০২৩ সালের ১১ এপ্রিল অনুমোদন পায়। প্রকল্পের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। এই দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরকে। প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে দুই হাজার ৫০৬ কোটি সাত লাখ ৩৬ হাজার ২৫৫ টাকা। এর একটি অংশ সরকারি অর্থায়নে এবং বাকিটা বিশ্বব্যাংকের ঋণ সহায়তায় বাস্তবায়ন করা হবে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সিলেট অঞ্চলে শিল্পায়ন ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম সম্প্রসারণে আধুনিক সড়ক অবকাঠামো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সিলেটের সঙ্গে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগ দীর্ঘদিন ধরেই যানজট ও সড়কের সীমাবদ্ধতার কারণে ভোগান্তির বিষয় হয়ে ছিল। বিশেষ করে গোলাপগঞ্জ, বিয়ানীবাজার ও সীমান্তবর্তী এলাকার ব্যবসায়ীরা উন্নত সড়ক ব্যবস্থার দাবি জানিয়ে আসছিলেন। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে প্রকল্পের কাজের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হলে তিনটি পৃথক লটে মোট ৪৭টি দরপ্রস্তাব জমা পড়ে। এর মধ্যে ৩৯টি প্রস্তাব কারিগরিভাবে গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়। পরে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি সর্বনিম্ন দরদাতাদের সুপারিশ করলে সরকারি ক্রয় কমিটি তা অনুমোদন করে।
প্রথম লটের কাজ পেয়েছে বাংলাদেশের মনিকো লিমিটেড এবং চীনের চায়না রেলওয়ে নম্বর ফোর ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ কোম্পানি লিমিটেডের যৌথ উদ্যোগ। এই অংশের কাজের ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ৯৯ কোটি ৫১ লাখ ৮৪ হাজার ৪২৬ টাকা। দ্বিতীয় লটের কাজ বাস্তবায়ন করবে চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশন, যার ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৮১৬ কোটি ৫৫ লাখ ৫১ হাজার ৮৩০ টাকা। আর তৃতীয় লটের দায়িত্ব পেয়েছে বাংলাদেশের এনডিই এবং চীনের আরবিসিজির যৌথ উদ্যোগ, যেখানে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৫৯০ কোটি টাকা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড় অবকাঠামো প্রকল্পে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ বাংলাদেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার প্রতিফলন। তবে একইসঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা এবং মান বজায় রাখার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে দেশের বিভিন্ন মেগা প্রকল্পে সময়ক্ষেপণ ও ব্যয় বৃদ্ধির অভিযোগ থাকায় এবারও সাধারণ মানুষের নজর থাকবে প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতির দিকে।
সিলেট-৬ আসনের সংসদ সদস্য ও সিলেট জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরী এই প্রকল্পের অনুমোদনকে এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, সিলেট অঞ্চলের উন্নয়নে সরকারের বিশেষ দৃষ্টি রয়েছে এবং এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে গোলাপগঞ্জ ও বিয়ানীবাজারের মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। একই সঙ্গে তিনি প্রকল্প অনুমোদনের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অবকাঠামো উন্নয়ন এখন দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনেও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। বড় প্রকল্পের মাধ্যমে একদিকে যেমন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড দৃশ্যমান হয়, অন্যদিকে তা স্থানীয় জনগণের রাজনৈতিক প্রত্যাশা ও জনমতের ওপরও প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে নির্বাচনি এলাকায় বড় বরাদ্দকে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিজেদের সাফল্য হিসেবে তুলে ধরতে চায়।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যেও প্রকল্পটি নিয়ে আশাবাদ তৈরি হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, সড়ক প্রশস্ত হলে শুধু যানজট কমবে না, বরং কৃষিপণ্য, শিল্পপণ্য এবং আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। সীমান্ত বাণিজ্য বাড়ার ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হতে পারে।
পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মতে, সিলেট দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন অঞ্চল হলেও উন্নত যোগাযোগ অবকাঠামোর অভাবে অনেক পর্যটক ভোগান্তিতে পড়েন। আধুনিক মহাসড়ক নির্মিত হলে জাফলং, বিছানাকান্দি, রাতারগুলসহ বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় যাতায়াত আরও সহজ হবে। এতে পর্যটন খাতে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
সব মিলিয়ে, সিলেট-চারখাই-শেওলা মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পকে শুধু একটি সড়ক নির্মাণ প্রকল্প হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। বরং এটি সিলেট অঞ্চলের অর্থনীতি, বাণিজ্য, পর্যটন এবং আঞ্চলিক সংযোগ উন্নয়নের একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এখন প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সঠিকভাবে বাস্তবায়নই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।


