প্রকাশ: ১৭ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটে জ্বালানি তেল সরবরাহ ব্যবস্থায় রেশনিং পদ্ধতির কারণে নতুন করে চাপ ও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন পেট্রোল পাম্প মালিকরা। তাদের দাবি, ডিপোতে পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও সরকারি নির্ধারিত সীমিত সরবরাহ নীতির কারণে চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি বিতরণ সম্ভব হচ্ছে না। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে অচিরেই সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মতো এখানেও পাম্পগুলোতে তেলশূন্য পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পাম্প মালিকদের অভিযোগ, বর্তমান রেশনিং ব্যবস্থা বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তারা বলছেন, জ্বালানি ডিপোগুলোতে পর্যাপ্ত তেল মজুত থাকলেও নির্দিষ্ট সীমার বাইরে সরবরাহ না দেওয়ায় বাজারে কৃত্রিম সংকটের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে সাধারণ গ্রাহক থেকে শুরু করে পরিবহন খাত পর্যন্ত নানা ধরনের ভোগান্তির মুখে পড়তে হচ্ছে।
গত বৃহস্পতিবার দুপুরে এই রেশনিং সমস্যার সমাধান নিয়ে সিলেটের জেলা প্রশাসকের সঙ্গে বৈঠক করেন সিলেট বিভাগ পেট্রোল পাম্প অ্যান্ড ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃবৃন্দ। বৈঠকে সরকারি তিনটি জ্বালানি ডিপোর ডিপো ম্যানেজার এবং সহকারী ডিপো ম্যানেজার উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার উপায় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, সিলেট বিভাগের চারটি জেলায় মোট ১১৪টি পেট্রোল পাম্প রয়েছে। এর মধ্যে শুধু সিলেট জেলায়ই রয়েছে ৭০টি পাম্প এবং মহানগর এলাকায় ৪৫টি পাম্প। এসব পাম্পে দৈনিক গড়ে প্রায় ১১ লাখ লিটার জ্বালানির চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে বড় অংশই ডিজেল, যা প্রায় ৮ লাখ লিটার পর্যন্ত পৌঁছায়। বাকি অংশ পেট্রোল ও অকটেনের চাহিদা পূরণে ব্যবহৃত হয়। তবে বর্তমানে এই চাহিদার তুলনায় প্রায় অর্ধেক জ্বালানি সরবরাহ করা হচ্ছে বলে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ।
পাম্প মালিকরা মনে করছেন, ডিপোগুলোতে ঘাটতি না থাকলেও নীতিগত সীমাবদ্ধতার কারণে সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাদের দাবি, রেশনিং ব্যবস্থা তুলে দিলে দ্রুতই বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে এবং সংকটের আশঙ্কা দূর হবে।
জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, দেশে জ্বালানির মধ্যে ডিজেলের চাহিদা সবচেয়ে বেশি এবং এটি প্রায় সম্পূর্ণই আমদানিনির্ভর। তবে সিলেট অঞ্চলে স্থানীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকেও সীমিত পরিমাণে কিছু জ্বালানি উৎপাদন হয়। প্রতিদিন এখান থেকে প্রায় ৬০০ ব্যারেল অকটেন, সাড়ে ৩ হাজার ব্যারেল পেট্রোল এবং ১৫০ ব্যারেল কেরোসিন উৎপাদন করা হয়। তবে এই স্থানীয় উৎপাদন সামগ্রিক চাহিদার তুলনায় খুবই সামান্য হওয়ায় আমদানি নির্ভরতা থেকেই যাচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, নীতিগত জটিলতার কারণে একটি কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে, যা মূলত সরবরাহ ব্যবস্থার ভারসাম্য নষ্ট করছে। তারা মনে করেন, ডিপোতে পর্যাপ্ত মজুত থাকার পরও সীমিত বরাদ্দের কারণে বাজারে চাপ তৈরি হচ্ছে এবং এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে পরিবহন খাতে।
সিলেট বিভাগ পেট্রোল পাম্প অ্যান্ড ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধি ব্যারিস্টার রিয়াসাদ আজিম আদদান বলেন, রেশনিং পদ্ধতির কারণে পাম্পগুলো নির্দিষ্ট সীমার বেশি তেল বিক্রি করতে পারছে না। এতে ব্যবসায়ীরা ক্ষতির আশঙ্কায় ডিপো থেকে তেল উত্তোলন কমিয়ে দিয়েছেন, ফলে অনেক পাম্পে সরবরাহ কমে গিয়ে তেলশূন্য পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ডিপোতে তেল মজুত থাকা সত্ত্বেও গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করা যাচ্ছে না, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। তার মতে, এটি সম্পূর্ণভাবে নীতিগত অব্যবস্থাপনার ফল, যার কারণে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে।
অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জুবায়ের আহমদ চৌধুরী জানান, বর্তমান পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। বৈঠকে ব্যবসায়ী প্রতিনিধি ও ডিপোর কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। জেলা প্রশাসক বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন সংস্থা যমুনা অয়েল লিমিটেডের সেলস অফিসার বেনজির আহমদ বলেন, ডিপোতে জ্বালানি মজুত থাকলেও সরকার নির্ধারিত রেশনিং নীতির বাইরে সরবরাহ করার কোনো সুযোগ নেই। ফলে নির্ধারিত সীমার মধ্যেই পাম্পগুলোতে তেল সরবরাহ করা হচ্ছে।
স্থানীয় পরিবহন চালক ও সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যেও এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অনেকেই বলছেন, জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা থাকলে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে, যার প্রভাব সরাসরি নিত্যপণ্যের বাজারেও পড়তে পারে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, জ্বালানি খাতের মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রে নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া জরুরি। সরবরাহ ব্যবস্থায় ভারসাম্য না থাকলে তা সরাসরি জনজীবনে প্রভাব ফেলে।
সব মিলিয়ে সিলেটের জ্বালানি খাতে রেশনিং নীতি নিয়ে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত সমাধান না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের। ব্যবসায়ী, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগই এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ হিসেবে দেখছেন সবাই।


