প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (সিকৃবি) পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে এক সাংবাদিককে হেনস্তা, গালিগালাজ, হুমকি এবং ছবি ও ভিডিও মুছে ফেলতে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে। ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিক সমিতি নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। অন্যদিকে অভিযুক্তদের একজন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, ঘটনার সময় তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন না।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন উপাচার্যকে অভ্যর্থনা দেওয়ার পর ছাত্রদলের দুই পক্ষের মধ্যে একটি বিষয় নিয়ে বাগ্বিতণ্ডার সূত্রপাত হয় বলে বিভিন্ন সূত্রের প্রতিবেদনে জানা গেছে। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে। এ সময় ঘটনাস্থলে থাকা সাংবাদিকরা পরিস্থিতির ছবি ও ভিডিও ধারণ এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করেন।
ঘটনাস্থলে পেশাগত দায়িত্ব পালন করছিলেন সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির অর্থ সম্পাদক ও রাইজিংবিডির সিকৃবি প্রতিনিধি আইনুল হক। তাঁর অভিযোগ, পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ার খবর পেয়ে তিনি সেখানে গিয়ে ছবি, ভিডিও ও তথ্য সংগ্রহ করছিলেন। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক জাহিদ হাসান ফাহাদ, আনাম সরকার মুন, সদস্য রাজেশ বাছাড়সহ কয়েকজন তাঁর দিকে আক্রমণাত্মকভাবে এগিয়ে আসেন।
আইনুল হকের ভাষ্য অনুযায়ী, একপর্যায়ে তাঁকে গালিগালাজ করা হয় এবং জোর করে তাঁর মুঠোফোন থেকে ধারণ করা ছবি ও ভিডিও মুছে ফেলতে বাধ্য করা হয়। তাঁর অভিযোগ, সাংবাদিকের পেশাগত দায়িত্ব পালনে এমন হস্তক্ষেপ গণমাধ্যমকর্মীদের কাজের পরিবেশকে বাধাগ্রস্ত করার পাশাপাশি কোনো ঘটনার তথ্য সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রেও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে।
ঘটনার পর সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি (সিকৃবিসাস) এ ঘটনার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানায়। সংগঠনটির পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। একই অভিযোগ ও প্রতিক্রিয়ার তথ্য একাধিক স্থানীয় সংবাদমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়েছে।
তবে অভিযোগের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক সানাউল হোসেন সনি ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, ঘটনার সময় তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। তাঁর ভাষ্য, পঞ্চম তলায় কয়েকজনের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়েছিল এবং ওই সাংবাদিক ঘটনার ভিডিও ধারণ করছিলেন। তিনি সাংবাদিককে হেনস্তা বা তাঁর ফোন থেকে ছবি-ভিডিও মুছে দেওয়ার ঘটনায় নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
ঘটনাটি এমন সময়ে ঘটল, যখন সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্যকে ঘিরে ক্যাম্পাসে নানা কার্যক্রম চলছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব নোটিশ অনুযায়ী, অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সফি উল্যাহ মজুমদার ২৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় অডিটোরিয়ামে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। এর আগের দিন তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার খবর প্রকাশিত হয়।
নতুন উপাচার্যের অভ্যর্থনাকে কেন্দ্র করেই ছাত্রদলের দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধের সূত্রপাত হয়েছিল কি না, কিংবা ঘটনার পেছনে নির্দিষ্ট কোনো কারণ ছিল কি না, তা নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনা পাওয়া গেছে। তবে ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাংবাদিককে হেনস্তার অভিযোগটি নিয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্তের ফল পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগের প্রতিটি দিক স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র পরামর্শ ও নির্দেশনা দপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক জসিম উদ্দিন আহাম্মদ জানিয়েছেন, এ বিষয়ে বিচার চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারের কাছে লিখিত অভিযোগ দিতে হবে। এরপর তদন্ত কমিটি গঠন করে বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সাংবাদিকের কাজ মূলত কোনো ঘটনার তথ্য সংগ্রহ করা, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য নেওয়া এবং তা যাচাই করে পাঠকের কাছে তুলে ধরা। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ থাকা গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে কোনো ঘটনা নিয়ে অভিযোগ উঠলে অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য নেওয়া এবং যথাযথ প্রক্রিয়ায় বিষয়টি যাচাই করাও জরুরি।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্তের কথা বলা হয়েছে। অভিযোগ জমা পড়ার পর তদন্তে কী তথ্য পাওয়া যায় এবং ঘটনার সঙ্গে কারা কীভাবে জড়িত ছিলেন, সেটিই পরবর্তী সময়ে বিষয়টির বাস্তব চিত্র স্পষ্ট করতে পারে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকবে। আবার অভিযোগের কোনো অংশ সত্য না হলে সেটিও তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়ার কথা।
এদিকে ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর অভ্যন্তরীণ বিরোধের সময় সাংবাদিকদের দায়িত্ব পালনে যেন কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়েও সংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সাংবাদিকতা সংশ্লিষ্টরা। কারণ একটি ক্যাম্পাসে কোনো বিরোধ বা সংঘাতের ঘটনা ঘটলে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও প্রশাসনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের কাছেও সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করেন সাংবাদিকরা।
সিকৃবিতে মঙ্গলবারের ঘটনাকে ঘিরে এখন পর্যন্ত সাংবাদিকের অভিযোগ, অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তদন্তের আশ্বাস—এই তিনটি বিষয়ই সামনে এসেছে। অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণের জন্য আনুষ্ঠানিক তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিষয়টি কীভাবে অনুসন্ধান করে এবং পরবর্তী সময়ে কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।


