প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে সাম্প্রতিক সময়ে ঊর্ধ্বমুখী অবস্থান দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত দেশের মোট বা গ্রস বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৬ দশমিক ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাবপদ্ধতি অনুযায়ী, অর্থাৎ বিপিএম৬ (Balance of Payments and International Investment Position Manual) পদ্ধতিতে এই রিজার্ভের পরিমাণ ৩১ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলার।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ একটি দেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক। আমদানি ব্যয় পরিশোধ, বৈদেশিক ঋণের দায় মেটানো এবং আন্তর্জাতিক লেনদেনে প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রার জোগান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে থাকা রিজার্ভ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে অস্থিরতা দেখা দিলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ ব্যবহার করে বাজারে ডলার সরবরাহের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গ্রস রিজার্ভ এবং বিপিএম৬ পদ্ধতিতে হিসাব করা রিজার্ভের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাসিক তথ্যভান্ডারে গ্রস রিজার্ভকে দেশের মোট আন্তর্জাতিক রিজার্ভ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে বিপিএম৬ পদ্ধতিতে আন্তর্জাতিকভাবে তুলনাযোগ্য একটি নির্দিষ্ট হিসাব কাঠামো অনুসরণ করা হয়। ফলে একই সময়ে রিজার্ভের দুটি আলাদা সংখ্যা প্রকাশিত হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক মাসিক তথ্যেও রিজার্ভ বৃদ্ধির ধারাটি দেখা যায়। আগস্ট ২০২৬ শেষে গ্রস রিজার্ভ ছিল ৩৭ দশমিক ৩৫২ বিলিয়ন ডলার এবং বিপিএম৬ অনুযায়ী ছিল ৩২ দশমিক ৪৪২ বিলিয়ন ডলার। জুলাই শেষে গ্রস রিজার্ভ ছিল ৩৬ দশমিক ৪২২ বিলিয়ন ডলার এবং বিপিএম৬ পদ্ধতিতে ৩১ দশমিক ৫৭৮ বিলিয়ন ডলার।
এর আগে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ মাস জুনে গ্রস রিজার্ভ ছিল ৩৭ দশমিক ৫৭৮ বিলিয়ন ডলার। ওই সময় বিপিএম৬ অনুযায়ী রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩২ দশমিক ৯০৭ বিলিয়ন ডলার। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকাশিত পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, গত এক বছরের তুলনায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে।
রিজার্ভের এই অবস্থানের পেছনে বৈদেশিক মুদ্রার বিভিন্ন উৎসের ভূমিকা রয়েছে। রপ্তানি আয়, প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্স, বৈদেশিক বিনিয়োগ ও অন্যান্য বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার জোগানকে প্রভাবিত করে। একই সঙ্গে আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক লেনদেন রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি করে। ফলে নির্দিষ্ট একটি সময়ে রিজার্ভের পরিমাণ বাড়া বা কমার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করতে পারে।
রিজার্ভের পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারেও বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যক্রম সক্রিয় রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২৯ সেপ্টেম্বর ডলারের আন্তঃব্যাংক বাজারে সর্বোচ্চ দর ছিল ১২২ টাকা ৮৫ পয়সা এবং সর্বনিম্ন ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা। একই দিনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকাশিত ডলারের রেফারেন্স রেটও ১২৩ টাকার আশপাশে ছিল।
এর আগে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথমবারের মতো নিলামের মাধ্যমে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করে। ১৪ সেপ্টেম্বরের ওই নিলামে ছয়টি ব্যাংকের কাছে ১ কোটি ১৫ লাখ ডলার বিক্রি করা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই পদক্ষেপের লক্ষ্য ছিল বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে ডলারের দামের ওপর চাপ কমানো এবং বাজারে প্রয়োজনীয় তারল্য নিশ্চিত করা।
অর্থনীতিবিদদের কাছে রিজার্ভের পরিমাণের পাশাপাশি এর গুণগত দিকও গুরুত্বপূর্ণ। শুধু মোট রিজার্ভ কত—এটি দিয়ে দেশের বৈদেশিক লেনদেনের সক্ষমতার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না। রিজার্ভের কত অংশ ব্যবহারযোগ্য, আগামী দিনে কী পরিমাণ বৈদেশিক দায় পরিশোধ করতে হবে এবং আমদানি ব্যয়ের তুলনায় রিজার্ভ কতটা পর্যাপ্ত—এসব বিষয়ও অর্থনীতির বৈদেশিক অবস্থান মূল্যায়নে বিবেচনা করা হয়।
এই কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক গ্রস রিজার্ভের পাশাপাশি আইএমএফের বিপিএম৬ পদ্ধতিতে হিসাব করা রিজার্ভের তথ্যও প্রকাশ করে। আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও অর্থনীতিবিদেরা দেশগুলোর বৈদেশিক সম্পদের তুলনামূলক বিশ্লেষণে এ ধরনের মানসম্মত হিসাব ব্যবহার করতে পারেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব তথ্যভান্ডারেও দুই পদ্ধতির হিসাব আলাদাভাবে দেখানো হচ্ছে।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে গ্রস রিজার্ভ ছিল ৩১ দশমিক ৪২৭ বিলিয়ন ডলার এবং বিপিএম৬ অনুযায়ী ছিল ২৬ দশমিক ৬০৪ বিলিয়ন ডলার। এক বছর পর ২০২৬ সালের আগস্ট শেষে গ্রস রিজার্ভ ৩৭ দশমিক ৩৫২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে মোট রিজার্ভের অবস্থানে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে।
তবে সেপ্টেম্বরের সর্বশেষ অবস্থান আগস্টের শেষের তুলনায় কিছুটা কম। ২৯ সেপ্টেম্বরের তথ্য অনুযায়ী গ্রস রিজার্ভ ৩৬ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলার এবং বিপিএম৬ অনুযায়ী ৩১ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ আগস্টের শেষের তুলনায় দুই হিসাবেই কিছুটা হ্রাস দেখা গেছে। এই পরিবর্তন বৈদেশিক লেনদেন, আমদানি পরিশোধ, রেমিট্যান্স ও অন্যান্য বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহের সময়ভেদে ওঠানামার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। নির্দিষ্ট সময়ের পরিবর্তনের কারণ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সময়ের বিস্তারিত লেনদেনের তথ্য বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের স্থিতিশীলতা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। জ্বালানি, শিল্পের কাঁচামাল, খাদ্যপণ্য, মূলধনি যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির জন্য বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন হয়। রিজার্ভে পর্যাপ্ত মজুত থাকলে আন্তর্জাতিক দায় ও আমদানি ব্যয় পরিশোধের সক্ষমতা বজায় রাখতে সহায়তা করে। অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহে বড় ধরনের চাপ তৈরি হলে রিজার্ভের ওপরও তার প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, বর্তমানে দেশের গ্রস বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি রয়েছে। একই সঙ্গে আইএমএফের বিপিএম৬ পদ্ধতিতে হিসাব করা রিজার্ভও ৩১ বিলিয়ন ডলারের ওপরে।
অর্থনীতির জন্য এই পরিসংখ্যান গুরুত্বপূর্ণ হলেও রিজার্ভের ভবিষ্যৎ অবস্থান নির্ভর করবে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ধারাবাহিকতা, আমদানি ব্যয়, রেমিট্যান্স প্রবাহ, রপ্তানি আয় এবং আন্তর্জাতিক দায় পরিশোধের ওপর। তাই একটি নির্দিষ্ট দিনের রিজার্ভের পরিমাণের পাশাপাশি ধারাবাহিক প্রবণতা এবং বৈদেশিক লেনদেনের সামগ্রিক পরিস্থিতিও নজরে রাখা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাবে, ২৯ সেপ্টেম্বর দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৬ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলার। আর আইএমএফের বিপিএম৬ পদ্ধতিতে এই পরিমাণ ৩১ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলার। দেশের বৈদেশিক অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক লেনদেনের পরিস্থিতি বোঝার ক্ষেত্রে এখন এই দুই হিসাবই গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।


