প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
হবিগঞ্জ থেকে মৌলভীবাজার হয়ে সিলেটসহ বিভিন্ন রুটে বাস চলাচল নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ আবারও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠেছে। হবিগঞ্জের বাস আটকে রাখা, ভাঙচুর এবং শ্রমিকদের ওপর হামলার অভিযোগ তুলে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে জেলায় অনির্দিষ্টকালের পরিবহন ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে হবিগঞ্জ মোটর গ্রুপ। সংগঠনটির দাবি, একাধিক দফায় সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়া হলেও হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের মধ্যে বিরোধ পুরোপুরি মীমাংসা হয়নি। এরই ধারাবাহিকতায় নতুন করে ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
হবিগঞ্জ মোটর গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক আবু মঈন চৌধুরী সোহেল ধর্মঘটের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, কর্মসূচি চলাকালে জেলার অভ্যন্তরীণ ও দূরপাল্লার সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকবে। ফলে ধর্মঘট কার্যকর হলে হবিগঞ্জের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন এলাকার সড়ক যোগাযোগে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে নিয়মিত যাতায়াতকারী শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, রোগী ও সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পরিবহন মালিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, হবিগঞ্জ-শ্রীমঙ্গল-মৌলভীবাজার-শেরপুর-সিলেট রুটে দীর্ঘদিন ধরে হবিগঞ্জের পরিবহন মালিকেরা বাস পরিচালনা করে আসছেন। তবে গত বছরের অক্টোবর থেকে মৌলভীবাজারের মালিক-শ্রমিকদের একটি অংশ বাস চলাচলে বাধা দিচ্ছে বলে অভিযোগ করে আসছেন হবিগঞ্জের পরিবহন নেতারা। এ নিয়ে দুই জেলার পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে বিরোধের সূত্রপাত হয়।
পরবর্তীতে বিরোধ নিরসনে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পর্যায়ে একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হয়। হবিগঞ্জ মোটর গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক জানান, জাতীয় সংসদের হুইপ জি কে গউছের হস্তক্ষেপে একপর্যায়ে বিষয়টির সমাধান হয়েছিল। তখন হবিগঞ্জের বাসগুলো আগের মতো নির্ধারিত রুটে চলাচল করবে বলে সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে আবারও বাস চলাচল নিয়ে নতুন করে বিরোধ তৈরি হয় বলে দাবি করছেন হবিগঞ্জের পরিবহন নেতারা।
তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১০ মে কোনো ধরনের পূর্ব যোগাযোগ ছাড়াই মৌলভীবাজারের এসএমএস মালিক-শ্রমিকদের পক্ষ থেকে শেরপুর এলাকায় হবিগঞ্জের একটি বাস আটকে দেওয়া হয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই জেলার পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের মধ্যে উত্তেজনা আবারও বেড়ে যায়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পরে প্রশাসনিক পর্যায়ে বৈঠকের উদ্যোগ নেওয়া হয়। গত ১২ জুন সিলেট বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে দুই জেলার পরিবহন বিরোধ নিয়ে আলোচনা হয়। হবিগঞ্জ মোটর গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, হুইপ জি কে গউছের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে সংসদ সদস্য সাখাওয়াত হাসান জীবন, আব্দুল মালেক, নাসের রহমান ও এমরান আহমেদ উপস্থিত ছিলেন। সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ূম চৌধুরী, বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট তিন জেলার পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের নেতারাও বৈঠকে অংশ নেন।
বৈঠকে হবিগঞ্জ থেকে সিলেট হয়ে মৌলভীবাজারের পথে বাস চলাচল স্বাভাবিক রাখার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে জানান হবিগঞ্জের পরিবহন নেতারা। তবে একই সঙ্গে শ্রীমঙ্গলে হবিগঞ্জের বাস যাত্রী ওঠানো বা নামানোর জন্য কোনো স্টপেজ দিতে পারবে না—এমন সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছিল বলে তাঁরা জানান।
ওই সিদ্ধান্তের পর কিছুদিন বাস চলাচল স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু সেপ্টেম্বরে এসে পরিস্থিতি আবার বদলে যায়। হবিগঞ্জ মোটর গ্রুপের অভিযোগ, গত ১১ সেপ্টেম্বর মৌলভীবাজারের এসএমএস মালিক-শ্রমিকদের পক্ষ থেকে হবিগঞ্জের ২২টি বাস আটকে রাখা হয়। এর পর ওই পথে বাস চলাচল আবার বন্ধ হয়ে যায় বলে দাবি সংগঠনটির।
পরিবহন মালিকদের মধ্যে বিরোধ মেটাতে এরপর কেন্দ্রীয় পর্যায়েও উদ্যোগ নেওয়া হয়। ঢাকায় একটি সমঝোতা বৈঠকের মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হলেও তাতেও স্থায়ী সমাধান হয়নি বলে দাবি করেছেন হবিগঞ্জের পরিবহন নেতারা। তাঁদের অভিযোগ, সমঝোতার পরও হবিগঞ্জের বাস চলাচলে বাধা দেওয়ার ঘটনা ঘটছে।
হবিগঞ্জ মোটর গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক আবু মঈন চৌধুরী সোহেলের অভিযোগ, বারবার সমঝোতা ও বৈঠক হলেও তাঁদের বাস আটকে দেওয়ার ঘটনা বন্ধ হয়নি। একই সঙ্গে বাস ভাঙচুর এবং শ্রমিকদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এসব ঘটনার প্রতিবাদ এবং হবিগঞ্জের বাস চলাচলের নিশ্চয়তা চেয়েই অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে পরিবহন বিরোধের অন্য পক্ষের বক্তব্য বা অভিযোগের বিষয়ে এই প্রতিবেদনে বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে বাস আটকে রাখা, ভাঙচুর কিংবা শ্রমিকদের ওপর হামলার অভিযোগগুলোকে সংশ্লিষ্ট পক্ষের দাবি হিসেবেই দেখা হচ্ছে। বিরোধের স্থায়ী সমাধানের জন্য দুই জেলার পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনের পাশাপাশি প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পরিবহন খাতের এমন বিরোধ শুধু মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর। হবিগঞ্জ থেকে মৌলভীবাজার, শ্রীমঙ্গল ও সিলেটগামী অসংখ্য মানুষ প্রতিদিন বাসে যাতায়াত করেন। তাঁদের কেউ কর্মস্থলে, কেউ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, কেউ চিকিৎসার প্রয়োজনে কিংবা ব্যবসায়িক কাজে এসব রুট ব্যবহার করেন। অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট দীর্ঘ হলে তাঁদের বিকল্প পরিবহনের ওপর নির্ভর করতে হতে পারে।
বিশেষ করে আন্তজেলা পরিবহন বন্ধ হয়ে গেলে যাত্রীদের অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় করে গন্তব্যে পৌঁছাতে হতে পারে। রোগী ও তাঁদের স্বজনদের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। হবিগঞ্জ থেকে সিলেটের বিভিন্ন হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়মিত রোগী যাতায়াত করেন। আবার মৌলভীবাজার ও শ্রীমঙ্গল থেকেও হবিগঞ্জে বিভিন্ন কাজে মানুষ আসেন। ফলে একটি রুটের পরিবহন বিরোধ বৃহত্তর অঞ্চলের জনজীবনে প্রভাব ফেলতে পারে।
পরিবহন খাতের বিরোধের ক্ষেত্রে যাত্রীদের স্বাভাবিক চলাচল নিশ্চিত করার পাশাপাশি মালিক ও শ্রমিকদের অভিযোগও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। অতীতে একাধিক বৈঠকে সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়া হলেও যদি একই ধরনের বিরোধ পুনরায় তৈরি হয়, তাহলে শুধু সাময়িক সিদ্ধান্ত নয়, দীর্ঘমেয়াদি একটি কার্যকর সমঝোতা কাঠামো প্রয়োজন হতে পারে।
এ জন্য প্রশাসনের উদ্যোগে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে আবারও আলোচনায় বসার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। কোন রুটে কার বাস চলবে, কোথায় যাত্রী ওঠানামার অনুমতি থাকবে, কোনো পক্ষ অন্য পক্ষের গাড়ি আটকে রাখতে পারবে কি না এবং বিরোধ দেখা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে কীভাবে সমাধান করা হবে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত থাকলে ভবিষ্যতে উত্তেজনা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
একই সঙ্গে বাস ভাঙচুর বা শ্রমিকদের ওপর হামলার অভিযোগ থাকলে সেসব ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তও গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন। অন্যদিকে কোনো পক্ষের অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে সেটিও যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া দরকার।
হবিগঞ্জ মোটর গ্রুপের ঘোষিত ধর্মঘট শেষ পর্যন্ত কতদিন স্থায়ী হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে অনির্দিষ্টকালের কর্মসূচি দীর্ঘ হলে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির মুখে পড়বেন সাধারণ যাত্রীরাই। তাই পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের বিরোধের দ্রুত ও টেকসই সমাধানের পাশাপাশি জেলার অভ্যন্তরীণ ও আন্তজেলা সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক রাখার বিষয়টিও প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
দীর্ঘদিনের এই বিরোধ যেন নতুন করে আরও বড় আকার না নেয়, সে জন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সংযত ভূমিকা এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের উদ্যোগ প্রয়োজন। আগের সমঝোতাগুলো যেহেতু স্থায়ী সমাধান আনতে পারেনি, এবার কোনো সিদ্ধান্ত হলে তা বাস্তবায়ন ও তদারকির কার্যকর ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা জরুরি। এতে একদিকে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে স্বাভাবিক যাতায়াতের সুযোগ ফিরে পাবেন হবিগঞ্জসহ বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের সাধারণ মানুষ।


