প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ঘিরে তৈরি হওয়া অচলাবস্থা তৃতীয় দিনেও কাটেনি। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনতা থেকে কলেজকে মুক্ত করে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) অধীনে নেওয়া অথবা প্রতিষ্ঠানটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রভাব পড়েছে পুরো ক্যাম্পাসের স্বাভাবিক কার্যক্রমে। প্রশাসনিক ভবনে প্রায় ৩৫ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর অধ্যক্ষসহ ২০ শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী মুক্ত হলেও মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত তাঁরা ক্যাম্পাসের বাইরে যেতে পারেননি। প্রধান ফটকসহ বিভিন্ন ভবনে তালা থাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে আছে।
ঘটনার সূত্রপাত রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) সকালে। শিক্ষার্থীরা কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনতা থেকে কলেজকে মুক্ত করার দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। একপর্যায়ে প্রশাসনিক ভবনের প্রধান ফটকে তালা দেওয়া হলে সেখানে অধ্যক্ষ, শিক্ষক এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আটকা পড়েন। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, প্রশাসনিক ভবনে মোট ২০ জন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী অবস্থান করছিলেন। তাঁদের মধ্যে অধ্যক্ষের দায়িত্বে থাকা মো. আসাদুজ্জামান, ১৪ জন শিক্ষক এবং ছয়জন কর্মকর্তা-কর্মচারী ছিলেন।
টানা সময় ধরে অবরুদ্ধ থাকার পর সোমবার রাতে প্রশাসনিক ভবনের তালা খুলে দেওয়া হয়। প্রায় ৩৩ থেকে ৩৫ ঘণ্টা পর তাঁরা ভবন থেকে বের হওয়ার সুযোগ পান। তবে এতে পরিস্থিতির পুরোপুরি সমাধান হয়নি। শিক্ষার্থীরা কলেজের প্রধান ফটকসহ বিভিন্ন একাডেমিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে রাখায় শিক্ষক-কর্মকর্তারা ক্যাম্পাসের ভেতরেই অবস্থান করতে বাধ্য হন। মঙ্গলবার দুপুরেও একই পরিস্থিতি ছিল বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।
আন্দোলনের কারণে শুধু প্রশাসনিক কাজ নয়, কলেজের নিয়মিত একাডেমিক কার্যক্রমও বন্ধ রয়েছে। ক্লাস, পরীক্ষা, ল্যাবরেটরির কাজসহ প্রশাসনিক কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রমও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। টানা কয়েক দিনের এই পরিস্থিতিতে শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক কাজের পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের মূল দাবি, সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজকে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রশাসনিক কাঠামো থেকে বের করে পুরোপুরি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে নেওয়া। সেটি সম্ভব না হলে কলেজটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। এর পাশাপাশি কলেজের বিজ্ঞানাগার ও খেলার মাঠের সংকট সমাধানের দাবিও রয়েছে।
২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠিত সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে বর্তমানে তিনটি বিভাগে পাঁচটি ব্যাচে প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থী রয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটির একাডেমিক কার্যক্রম শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরিচালিত হলেও প্রশাসনিক কার্যক্রম কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে। শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের অসন্তোষের অন্যতম জায়গা এই দ্বৈত কাঠামো। তাঁদের বক্তব্য, একটি প্রকৌশল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে সমন্বয় থাকা প্রয়োজন।
অচলাবস্থা নিরসনে সোমবার স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একাধিক দফায় আলোচনা করা হয়। বিকেলে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ১০ সদস্যের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক করেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। পরে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী, জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মামুনসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা কলেজ ক্যাম্পাসে গিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গেও কথা বলেন।
বৈঠকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আগামী তিন মাসের মধ্যে কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের প্রক্রিয়া শুরুর উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানানো হয়। একই সঙ্গে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনতা থেকে কলেজকে মুক্ত করার উদ্যোগ এবং বিজ্ঞানাগার ও খেলার মাঠের সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হয়। তবে শিক্ষার্থীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি—কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. আসাদুজ্জামানের বদলির প্রজ্ঞাপন বাতিল—নিয়ে তাৎক্ষণিক কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারেনি প্রশাসন।
এই জায়গাতেই আলোচনার অমীমাংসিত অবস্থার সৃষ্টি হয়। শিক্ষার্থীরা তাঁদের সব দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার অবস্থান নেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আলোচনার মাধ্যমে ক্লাসে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হলেও শিক্ষার্থীদের মধ্যে আন্দোলন প্রত্যাহারের বিষয়ে ঐকমত্য তৈরি হয়নি। ফলে বৈঠক শেষ হওয়ার পরও ক্যাম্পাসের তালা খোলেনি এবং শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিক হয়নি।
সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, প্রশাসন আন্তরিকতার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করেছে এবং তাঁদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছে। তিনি শিক্ষার্থীদের আন্দোলন থেকে সরে এসে শ্রেণিকক্ষে ফেরার আহ্বান জানান। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের একটি অংশ আন্দোলন প্রত্যাহারে আগ্রহী হলেও অন্য একটি অংশ এতে রাজি হয়নি।
অন্যদিকে, কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, বিভিন্ন স্থানে তালা থাকায় শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা ক্যাম্পাসের বাইরে যেতে পারছেন না। স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠকেও সমাধান না হওয়ায় অচলাবস্থা অব্যাহত রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, কীভাবে শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সমন্বয় করা হবে। শিক্ষার্থীরা দ্রুত একটি আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত চান। অন্যদিকে স্থানীয় প্রশাসনের আশ্বাস বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। ফলে শুধু স্থানীয় পর্যায়ের আলোচনা দিয়ে সংকটের তাৎক্ষণিক সমাধান কতটা সম্ভব, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ সময় ধরে ক্লাস, পরীক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য যেমন অনিশ্চয়তা তৈরি করে, তেমনি শিক্ষক ও কর্মচারীদের জন্যও স্বাভাবিক দায়িত্ব পালনের পরিবেশ ব্যাহত করে। বিশেষ করে প্রকৌশল শিক্ষার মতো ব্যবহারিক ও ল্যাবনির্ভর শিক্ষায় দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থার প্রভাব আরও বিস্তৃত হতে পারে। তাই দাবি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের একাডেমিক সময়সূচি কীভাবে দ্রুত স্বাভাবিক করা যায়, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের বর্তমান পরিস্থিতি এখন আর শুধু একটি ক্যাম্পাসভিত্তিক আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে একটি প্রকৌশল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কাঠামো, ভবিষ্যৎ পরিচয় ও শিক্ষার্থীদের একাডেমিক প্রত্যাশার প্রশ্ন। তবে অচলাবস্থা নিরসনের জন্য আলোচনার পথ খোলা রাখা এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের অংশগ্রহণে বাস্তবসম্মত সমাধানে পৌঁছানোই এখন সবচেয়ে জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মঙ্গলবার পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা আন্দোলন অব্যাহত রাখার অবস্থানে রয়েছেন। ফলে কলেজের প্রধান ফটক ও ভবনগুলোর তালা কবে খুলবে, ক্লাস-পরীক্ষা কখন শুরু হবে এবং প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়ে কবে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত আসবে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপরই নির্ভর করছে সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের এই অচলাবস্থা কত দ্রুত কাটে।


