প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
দেশের কারাগারগুলোতে ধারণক্ষমতার তুলনায় বন্দির সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। ৭৫টি কারাগারে যেখানে ৪৫ হাজার ১৮৬ জন বন্দি রাখার সক্ষমতা রয়েছে, সেখানে ২৯ সেপ্টেম্বরের হিসাবে বন্দির সংখ্যা ১ লাখ ৬ হাজারের বেশি। অর্থাৎ নির্ধারিত ধারণক্ষমতার তুলনায় বন্দির সংখ্যা দুই গুণেরও বেশি। সাম্প্রতিক সময়ে বন্দির সংখ্যা লাখের ঘর ছাড়ানোর পাশাপাশি কারাগারে চিকিৎসা, অ্যাম্বুলেন্স ও জনবল সংকট নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
কারাগারে বন্দিদের একটি অংশ বিভিন্ন অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত হলেও বিপুলসংখ্যক মানুষ বিচারাধীন অবস্থায় সেখানে রয়েছেন। জামিন না পাওয়া আসামিদের পাশাপাশি রাজনৈতিক মামলায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিরাও কারাগারে আছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র ও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এর ফলে কারাগারগুলোর ওপর আবাসন, খাবার, চিকিৎসা ও নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন সেবার চাপ বেড়েছে।
কারা অধিদপ্তরের হিসাবে দেশে বর্তমানে ৭৫টি কারাগার রয়েছে। এর মধ্যে ১৫টি কেন্দ্রীয় ও ৬০টি জেলা কারাগার। এসব কারাগারে বন্দি ধারণক্ষমতা ৪৫ হাজার ১৮৬ জন। কিন্তু ২৯ সেপ্টেম্বরের হিসাবে বন্দির সংখ্যা ১ লাখ ৬ হাজার ছাড়িয়েছে। অর্থাৎ গড়ে নির্ধারিত জায়গার তুলনায় প্রায় আড়াই গুণ বন্দি রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে কারাগারে বন্দিদের মৃত্যুর সংখ্যাও আলোচনায় এসেছে। কারা অধিদপ্তর ও হাসপাতাল-সংশ্লিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১ সাল থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় পাঁচ বছর নয় মাসে ১ হাজার ২৩৫ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে অন্তত ৩০০ জন কারাগার থেকে হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান।
চলতি বছরের শুরু থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় নয় মাসে অন্তত ২৫১ জন বন্দির মৃত্যুর তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে। এ হিসাবে চলতি বছরে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ২৮ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে। আগের প্রায় পাঁচ বছর নয় মাসের মাসিক গড়ের তুলনায় এই হার বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কারাগারে বন্দির সংখ্যা বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণের কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সাম্প্রতিক সময়ে গ্রেপ্তার বেড়েছে বলে কারা সূত্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। মাদক, ছিনতাই, সাইবার অপরাধসহ বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তারের পাশাপাশি রাজনৈতিক মামলায়ও অনেককে আটক করা হয়েছে। বিচারপ্রক্রিয়া চলাকালে জামিন না পাওয়ায় অনেক বন্দিকে দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকতে হচ্ছে।
ওয়ার্ল্ড প্রিজন ব্রিফের তথ্যেও বাংলাদেশের কারাগারে বন্দির সংখ্যা বৃদ্ধির দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা দেখা যায়। সংস্থাটির সর্বশেষ তথ্যে সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ বাংলাদেশের কারাগারে বন্দির সংখ্যা ১ লাখ ২ হাজার ১৮০ জন দেখানো হয়েছে। এর মধ্যে বিচারাধীন বা রিমান্ডে থাকা বন্দির হার ৬৬ দশমিক ৯ শতাংশ।
কারাগারে এত বেশি বন্দি থাকার ফলে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হয়ে উঠেছে তাদের চিকিৎসা ও দৈনন্দিন জীবনযাপনের সুযোগ। কারা অধিদপ্তরের মিশনের মধ্যে বন্দিদের নিরাপদ আটক, শৃঙ্খলা বজায় রাখা, মানবিক আচরণ এবং যথাযথ বাসস্থান, খাবার, চিকিৎসা ও স্বজন ও আইনজীবীদের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ নিশ্চিত করার কথা রয়েছে। একই সঙ্গে বন্দিদের সমাজে পুনর্বাসনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও উৎসাহ দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
কিন্তু ধারণক্ষমতার দ্বিগুণের বেশি বন্দি থাকায় এসব সেবা বাস্তবে কতটা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে অসুস্থ বন্দিদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সংকটের চিত্র আরও স্পষ্ট।
কারা হাসপাতালগুলোর জন্য অনুমোদিত চিকিৎসকের পদ রয়েছে ১৪৮টি। কিন্তু স্থায়ী চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র দুজন—একজন মানিকগঞ্জ জেলা কারাগারে এবং অন্যজন রাজশাহী কারা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে। অন্যদিকে বিভিন্ন জেলার সিভিল সার্জনের কার্যালয় থেকে অস্থায়ী ভিত্তিতে চিকিৎসক পাঠানো হলেও তারা প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টার বেশি কারাগারে থাকেন না বলে কারা সূত্র জানিয়েছে।
ফলে দিনের পরবর্তী সময়ে কোনো বন্দি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে দ্রুত চিকিৎসা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষায়িত চিকিৎসার প্রয়োজন হলে বন্দিদের বাইরের হাসপাতালে পাঠাতে হয়। কিন্তু সেখানেও রয়েছে পরিবহন সংকট।
দেশের ৭৫টি কারা হাসপাতালের জন্য অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে মাত্র ২৭টি। কোনো কারাগার থেকে অসুস্থ বন্দিকে বাইরের হাসপাতালে পাঠানোর প্রয়োজন হলে অনেক সময় নির্ধারিত অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া যায় না। তখন অন্য যানবাহন ভাড়া করে বন্দিকে হাসপাতালে নিতে হয়। এসব যানবাহনে সবসময় জরুরি অক্সিজেন দেওয়ার ব্যবস্থাও থাকে না।
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের চিকিৎসক বিনীতা রায় জানিয়েছেন, সেখানে সাড়ে ১৩ হাজারের মতো বন্দি রয়েছেন। হাসপাতালটিতে সাতজন চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে দুজন চিকিৎসক সংযুক্ত আছেন। বিশেষায়িত চিকিৎসার সুযোগ না থাকায় গুরুতর অসুস্থ বন্দিদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, জাতীয় কিডনি রোগ ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন বিশেষায়িত হাসপাতালে পাঠাতে হয়।
কারাগারগুলোতে চিকিৎসক সংকট শুধু সাধারণ চিকিৎসাতেই সীমাবদ্ধ নয়। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি কারাগারে একজন মানসিক চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তা নেই। প্রায় তিন হাজার নারী বন্দির জন্যও কোনো গাইনি চিকিৎসক নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কারা হাসপাতালের এই সীমাবদ্ধতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অতিরিক্ত বন্দির চাপ। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বিপুলসংখ্যক বন্দির জন্য সীমিত চিকিৎসক ও চিকিৎসা-সুবিধা থাকায় প্রতিটি রোগীকে প্রয়োজনীয় সময় দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। একই পরিস্থিতি দেশের অন্যান্য কারাগারেও কমবেশি রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
আন্তর্জাতিকভাবেও কারাগারে বন্দিদের চিকিৎসা ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করার বিষয়টি স্বীকৃত। ২০১৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ নেলসন ম্যান্ডেলা রুলস নামে পরিচিত ‘United Nations Standard Minimum Rules for the Treatment of Prisoners’ গ্রহণ করে। এতে বন্দিদের মর্যাদা রক্ষা, মানবিক আচরণ এবং স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য ন্যূনতম মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে।
জাতিসংঘের নেলসন ম্যান্ডেলা রুলস অনুযায়ী, জরুরি পরিস্থিতিতে বন্দিদের দ্রুত চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ থাকতে হবে। যাদের বিশেষায়িত চিকিৎসা বা অস্ত্রোপচার প্রয়োজন, তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান বা বেসামরিক হাসপাতালে স্থানান্তরের ব্যবস্থা থাকতে হবে। কারা হাসপাতাল থাকলে সেটিও পর্যাপ্ত জনবল ও সরঞ্জাম দিয়ে পরিচালনার কথা বলা হয়েছে।
মানবাধিকারকর্মী মো. নুর খান বন্দিদের অতিরিক্ত ভিড় ও চিকিৎসা সংকট নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় হেফাজতে থাকা বন্দিদের খাবার, বিশ্রাম ও চিকিৎসার প্রয়োজনীয় সুযোগ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। বিশেষ করে রাতে কোনো বন্দি গুরুতর অসুস্থ হলে চিকিৎসক ও পরিবহন সংকটের কারণে চিকিৎসা বিলম্বিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
তবে কারা কর্তৃপক্ষও সংকটের বিষয়টি অস্বীকার করেনি। ভারপ্রাপ্ত কারা মহাপরিদর্শক কর্নেল মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল বলেছেন, কোনো বন্দির মৃত্যু কাম্য নয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বন্দির সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে মৃত্যুর সংখ্যাও বেড়েছে। কারা হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক, নার্স ও অ্যাম্বুলেন্সের সংকট রয়েছে। অস্থায়ী ভিত্তিতে আসা চিকিৎসকেরাও দীর্ঘ সময় হাসপাতালে থাকেন না। গুরুতর অসুস্থ বন্দিকে বাইরের হাসপাতালে পাঠাতে গাড়ি ভাড়া করার ক্ষেত্রে দেরি হওয়ায় চিকিৎসা পেতে বিলম্ব হয়।
কারাগার মূলত সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের শাস্তি কার্যকরের পাশাপাশি বিচারাধীন ব্যক্তিদের নিরাপদ হেফাজত নিশ্চিত করার জায়গা। কিন্তু কারাগারে থাকা মানেই মৌলিক চিকিৎসা ও মানবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া নয়। বরং রাষ্ট্রের হেফাজতে থাকার কারণে বন্দিদের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার দায়িত্ব আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বর্তমানে দেশের কারাগারে ধারণক্ষমতার দ্বিগুণের বেশি মানুষ থাকায় সংকটটি কেবল জায়গার অভাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চিকিৎসক, নার্স, অ্যাম্বুলেন্স, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং দ্রুত হাসপাতালে স্থানান্তরের মতো মৌলিক সেবার ঘাটতি। ফলে কারাগারে বন্দির সংখ্যা বৃদ্ধির কারণ যেমন পর্যালোচনা করা প্রয়োজন, তেমনি বিচারাধীন বন্দিদের জামিন ও বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং কারা স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতাও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার।
কারাগারের ভেতরের মানুষগুলো সমাজের বাইরে নন; একসময় তারা সমাজেই ফিরে আসবেন। তাই নিরাপত্তার পাশাপাশি মানবিক পরিবেশ, পর্যাপ্ত চিকিৎসা এবং আইন অনুযায়ী মর্যাদা নিশ্চিত করা শুধু বন্দিদের অধিকার রক্ষার বিষয় নয়, এটি একটি কার্যকর ও দায়িত্বশীল বিচারব্যবস্থারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।


