প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
যুক্তরাজ্যে বৈধভাবে বসবাসরত বিদেশি কর্মীদের স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি পাওয়ার নিয়ম আরও কঠোর করার পরিকল্পনা নিয়ে নতুন করে ভাবার ইঙ্গিত দিয়েছেন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ। লেবার পার্টির অভ্যন্তরে একাধিক এমপি ও ট্রেড ইউনিয়নের আপত্তির মধ্যে তাঁর এই বক্তব্য এসেছে। তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
সোমবার লিভারপুলে লেবার পার্টির বার্ষিক সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যে মাহমুদ বলেন, প্রস্তাবিত অভিবাসন সংস্কারের কিছু অংশকে অনেকে ন্যায্য মনে করছেন না। সরকার বৈধভাবে যুক্তরাজ্যে আসা অভিবাসীদের স্বার্থ এবং ব্রিটিশ নাগরিকদের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রেখে চূড়ান্ত অবস্থান নেবে।
বিষয়টি মূলত ‘ইনডেফিনিট লিভ টু রেইন’ বা আইএলআর ঘিরে। এটি এমন একটি অভিবাসন মর্যাদা, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণকারী ব্যক্তি যুক্তরাজ্যে অনির্দিষ্টকাল বসবাসের সুযোগ পান এবং কাজ ও পড়াশোনার অধিকার বজায় রাখতে পারেন। সরকারের প্রস্তাবিত ‘earned settlement’ ব্যবস্থায় স্থায়ী বসবাসের অনুমতি নির্দিষ্ট সময় পূর্ণ হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাওয়ার পরিবর্তে আবেদনকারীর অবদান, আচরণ ও অন্যান্য শর্ত বিবেচনার কথা বলা হয়েছে।
বর্তমান ব্যবস্থায় অধিকাংশ যোগ্য অভিবাসী পাঁচ বছর পর স্থায়ী বসবাসের অনুমতির জন্য আবেদন করার সুযোগ পান। তবে সরকার গত বছর প্রকাশিত অভিবাসন শ্বেতপত্রে এই সময়সীমা সাধারণভাবে ১০ বছরে বাড়ানোর পরিকল্পনা জানিয়েছিল। পরে ‘earned settlement’ পরামর্শ প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন শ্রেণির অভিবাসীর জন্য আলাদা সময়সীমা ও শর্ত নিয়ে আলোচনা হয়।
বিশেষ করে স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা খাতে কাজ করা বিদেশি কর্মীদের নিয়ে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থার একটি অংশে অপেক্ষার সময় ১৫ বছর পর্যন্ত হতে পারে—এমন পরিকল্পনা নিয়ে লেবার পার্টির ভেতরে আপত্তি তৈরি হয়েছে। এ নিয়ে হাউজিং সেক্রেটারি অ্যাঞ্জেলা রেনারসহ কয়েকজন লেবার এমপি এবং ট্রেড ইউনিয়নগুলো উদ্বেগ জানিয়েছে।
রেনার ও ইউনিয়ন নেতাদের বক্তব্যের মূল উদ্বেগ হলো, যেসব বিদেশি কর্মী আগের নিয়মের ওপর ভিত্তি করে যুক্তরাজ্যে এসেছেন, তাদের ক্ষেত্রে পরে নিয়ম কঠোর করা হলে সেটি অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে পরিচর্যা খাতে বিদেশি কর্মীদের ওপর এর প্রভাব বেশি পড়তে পারে বলে ইউনিয়নগুলো মনে করছে। ইউনিসনের মহাসচিব আন্দ্রেয়া ইগানও প্রস্তাবিত পরিবর্তন নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন।
তবে সরকারের যুক্তি হলো, স্থায়ীভাবে বসবাসের অধিকার পাওয়ার বিষয়টি শুধু যুক্তরাজ্যে নির্দিষ্ট সময় অবস্থানের ওপর নির্ভর না করে একজন ব্যক্তির দেশটির প্রতি দীর্ঘমেয়াদি অবদান ও একীভূত হওয়ার বিষয়গুলোর সঙ্গেও যুক্ত হওয়া উচিত। ২০২৫ সালের লেবার পার্টির সম্মেলনে মাহমুদ জানিয়েছিলেন, সরকার পাঁচ বছর থেকে ১০ বছরে আইএলআরের সময় বাড়ানোর পাশাপাশি কাজ, জাতীয় বিমায় অবদান, ইংরেজি ভাষা, অপরাধমূলক রেকর্ড এবং সমাজে অবদানের মতো বিষয় বিবেচনার প্রস্তাব করছে।
তবে প্রস্তাবিত সংস্কার এখনো কার্যকর হয়নি। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি ব্রিটিশ পার্লামেন্টের হোম অ্যাফেয়ার্স কমিটিতে দেওয়া বক্তব্যে মাহমুদ জানিয়েছিলেন, সরকার ‘earned settlement’ নীতি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কাজ করছে এবং পরিবর্তিত নিয়ম যথাসময়ে প্রকাশ করা হবে। এর আগে এ বিষয়ে সরকারের পরামর্শ প্রক্রিয়াও সম্পন্ন হয়েছে।
লেবার সম্মেলনে মাহমুদের সাম্প্রতিক বক্তব্য তাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তিনি সরাসরি পুরো পরিকল্পনা বাতিলের ঘোষণা দেননি। বরং বলেছেন, সরকার এমন একটি অবস্থানে পৌঁছাবে যেখানে বৈধভাবে যুক্তরাজ্যে আসা মানুষের প্রতি ন্যায়বিচার এবং ব্রিটিশ নাগরিকদের প্রতি ন্যায়বিচারের মধ্যে ভারসাম্য থাকবে। ফলে চূড়ান্ত নীতিতে আগের প্রস্তাবের কিছু অংশ পরিবর্তিত হতে পারে—এমন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামও জানিয়েছেন, বিষয়টি এখনো পরামর্শ ও পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিভিন্ন পক্ষের মতামত বিবেচনা করেই অভিবাসন নীতিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ফলে অ্যাঞ্জেলা রেনারের আপত্তির কারণেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পরিকল্পনা থেকে সরে গেছেন—এমন সরল ব্যাখ্যাকে তিনি সমর্থন করেননি।
অভিবাসন নীতির এই পরিবর্তন যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বিপুলসংখ্যক বিদেশি কর্মীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে পরিচর্যা, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে কর্মরত ব্যক্তিদের ভবিষ্যৎ বসবাসের পরিকল্পনার সঙ্গে স্থায়ী বসবাসের নিয়ম সরাসরি সম্পর্কিত। একই সঙ্গে এসব খাতের জনবল চাহিদা এবং বিদেশি কর্মীদের ওপর নির্ভরতার বিষয়টিও নীতি আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে।
অন্যদিকে সরকার অভিবাসন ব্যবস্থায় নিয়ন্ত্রণ ও ন্যায্যতার মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার কথা বলছে। একই সম্মেলনে মাহমুদ বৈধ অভিবাসন ও আশ্রয় ব্যবস্থায় নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি মানবিক ও আইনসম্মত পথ রাখার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন। সরকার আফগান নারী ও মেয়ে এবং ফিলিস্তিনিদের জন্য পুনর্বাসন ব্যবস্থাও পুনরায় চালুর ঘোষণা দিয়েছে।
সব মিলিয়ে যুক্তরাজ্যের স্থায়ী বসবাসের নিয়ম নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি। পাঁচ বছর থেকে ১০ বছর করার প্রস্তাব এবং কিছু কর্মীর ক্ষেত্রে আরও দীর্ঘ অপেক্ষার সম্ভাবনা নিয়ে রাজনৈতিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা অব্যাহত রয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্যে নীতির কিছু অংশ পুনর্বিবেচনার ইঙ্গিত মিললেও, কোন শ্রেণির অভিবাসীর জন্য কী নিয়ম কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও পরবর্তী অভিবাসন বিধির ওপর।


