প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও স্বজনদের ভোগান্তির সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে পরিচ্ছন্নতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন। হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড, বাথরুম, সিঁড়ি ও চলাচলের জায়গায় ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকা এবং দুর্গন্ধের অভিযোগ করেছেন রোগী ও স্বজনরা। কোথাও বাথরুমের পাশে রোগীর শয্যা, কোথাও আবার মেঝেতে থাকা রোগীর পাশ দিয়ে অন্যদের চলাচল করতে হচ্ছে। ফলে চিকিৎসার জন্য আসা মানুষকে অস্বস্তিকর পরিবেশের মধ্যেই থাকতে হচ্ছে বলে অভিযোগ তাঁদের।
চলতি মাসের শুরুতে হাসপাতাল পরিদর্শনে এসে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন সাত দিনের মধ্যে হাসপাতালের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রায় এক মাস পর হাসপাতালের কয়েকটি ওয়ার্ড ঘুরে রোগী ও স্বজনদের অভিযোগে আগের মতোই অপরিচ্ছন্নতার চিত্র পাওয়ার দাবি করা হয়েছে। যদিও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতার কাজ চলছে এবং আগের তুলনায় দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে।
রোববার দুপুরে হাসপাতালের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখা যায়, জরুরি বিভাগ দিয়ে প্রবেশের পর নিচতলার কয়েকটি স্থানে প্লাস্টিক ও পলিথিন পড়ে রয়েছে। সিঁড়ির বিভিন্ন কোণেও ময়লা-আবর্জনার সঙ্গে পানের পিক দেখা যায়। রোগী ও স্বজনদের নিয়মিত চলাচলের এসব জায়গায় বর্জ্য পড়ে থাকায় হাসপাতালের সামগ্রিক পরিবেশ নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
দ্বিতীয় তলার হৃদরোগ ওয়ার্ডে ছিল রোগীদের উল্লেখযোগ্য চাপ। নির্ধারিত শয্যার পাশাপাশি বারান্দা ও মেঝেতেও রোগীদের থাকতে দেখা যায়। ওয়ার্ডের বাথরুম থেকে দুর্গন্ধ ছড়ানোর অভিযোগ রয়েছে। কোথাও মেঝেতে জমে থাকা পানির সঙ্গে ধুলোবালি মিশে পিচ্ছিল পরিবেশ তৈরি হয়েছে। বাথরুমের কাছাকাছি জায়গাতেও রোগী ও স্বজনদের অবস্থান করতে দেখা গেছে।
ওই ওয়ার্ডের এক রোগীর স্বজন বলেন, বাথরুমের দুর্গন্ধের কারণে হাসপাতালে অবস্থান করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাঁর অভিযোগ, মেঝেতে থাকা রোগীদের পাশ দিয়ে বাথরুমে যেতে হয় এবং কখনো কখনো রোগীর শয্যার একেবারে কাছ দিয়ে মানুষের চলাচল করতে হয়। হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীদের জন্য এমন পরিবেশ বাড়তি অস্বস্তির কারণ বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
শুধু হৃদরোগ ওয়ার্ড নয়, ১১ নম্বর ওয়ার্ডের পুরুষ সার্জারি বিভাগেও মেঝে ও বাথরুমে ময়লা-আবর্জনা এবং দুর্গন্ধের অভিযোগ পাওয়া গেছে। সেখানে অস্ত্রোপচারের পর চিকিৎসাধীন স্বজনকে নিয়ে তিন দিন ধরে হাসপাতালে থাকা এক ব্যক্তি জানান, প্রয়োজন হলে চিকিৎসক ও নার্সদের ডাকা যায়। তবে তাঁদের সাড়া পাওয়ার সময় সব ক্ষেত্রে এক রকম নয় বলে তাঁর অভিজ্ঞতা।
১৩ নম্বর ওয়ার্ডের গাইনি বিভাগেও একই ধরনের পরিবেশ দেখা গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দ্বিতীয় তলার লেবার ওটির বারান্দায় নবজাতককে নিয়ে স্বজনদের অবস্থান করতে দেখা যায়। আশপাশে ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকার অভিযোগও রয়েছে। একই ভবনে চিকিৎসকদের ক্যানটিনের আশপাশের মেঝেতে পানের পিক, প্লাস্টিকের কাপসহ বিভিন্ন বর্জ্য পড়ে থাকতে দেখা গেছে।
হাসপাতালের নতুন ভবনের বহির্বিভাগে অবশ্য চিকিৎসাসেবা চলছিল। বিভিন্ন তলায় চিকিৎসক দেখানোর জন্য রোগীদের দীর্ঘ সারি ছিল। তবে ভবনের কিছু অংশে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের অভিযোগ রয়েছে। তৃতীয় তলায় চর্ম, যৌন ও মানসিক বিভাগের ব্যালকনির পাশে টিনের ছাউনিতে ময়লার স্তূপ দেখা গেছে। পুরুষ মেডিসিন বিভাগের বাথরুমগুলোর স্যাঁতসেঁতে ও জরাজীর্ণ অবস্থার কথাও উঠে এসেছে।
হাসপাতালের বিভিন্ন অংশে বাথরুমের দুর্গন্ধ নিয়ে রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ সবচেয়ে বেশি। চিকিৎসা নিতে আসা মানুষের জন্য হাসপাতালের বাথরুম পরিষ্কার রাখা এবং পর্যাপ্ত পানি ও পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে হৃদরোগী, অস্ত্রোপচারের পর চিকিৎসাধীন রোগী, প্রসূতি ও নবজাতকের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশের প্রয়োজন আরও বেশি।
চিকিৎসার পাশাপাশি রোগীদের খাবার সরবরাহ নিয়েও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন। নতুন ভবনের পুরুষ মেডিসিন বিভাগের এক রোগীর ভাষ্য, দুপুরের খাবারে ভাত, এক টুকরো মুরগি ও সবজি দেওয়া হয়। তবে মুরগি ও সবজি পরিবেশনের ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা হয় না বলে তিনি অভিযোগ করেন। খাবার আলাদা করে দেওয়ার অনুরোধ করলেও সব সময় তা মানা হয় না বলেও দাবি তাঁর।
তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগের একটি ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছে। হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন ও প্রশিক্ষণ) ডা. আবুল কালাম আজাদ দাবি করেন, পরিচ্ছন্নতায় দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন সকাল সাতটা থেকে আটটা পর্যন্ত নিয়মিত পরিচ্ছন্নতার কাজ চলে। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নির্দেশের পর হাসপাতালের জনবল ও যন্ত্রপাতির চাহিদা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে বলেও জানান তিনি। নতুন ক্যানসার ভবন চালুর জন্য প্রয়োজনীয় জনবলের চাহিদাও পাঠানো হয়েছে বলে জানান এই কর্মকর্তা।
পরিচ্ছন্নতার সীমাবদ্ধতার পেছনে জনবল সংকটকে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন ডা. আবুল কালাম আজাদ। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ২৬২ জন কর্মচারী পরিচ্ছন্নতার কাজে নিয়োজিত রয়েছেন। তবে হাসপাতালের প্রয়োজন অনুযায়ী এ কাজে ৫০০ থেকে ৬০০ জন কর্মী দরকার বলে তিনি মনে করেন।
হাসপাতালের উপপরিচালক হুমায়ুন কবিরও রোগীর অতিরিক্ত চাপের বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তাঁর ভাষ্য, হৃদরোগ ওয়ার্ডে ৪০ জন রোগী থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে সেখানে প্রায় ১২০ জন রয়েছেন। অতিরিক্ত রোগীর চাপের কারণে পরিচ্ছন্নতার কাজ করার কিছুক্ষণ পরই আবার ময়লা জমে যায় বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর মতে, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কয়েক দফায় হাসপাতাল পরিষ্কার করা হয়।
হুমায়ুন কবির আরও জানান, হাসপাতালটি ৯০০ শয্যার হলেও সেই অনুপাতে প্রয়োজনীয় জনবল নেই। বর্তমানে প্রায় ৫০০ শয্যার জন্য অনুমোদিত জনবল রয়েছে বলে তাঁর দাবি। অথচ প্রতিদিন প্রায় তিন হাজার রোগীকে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। ফলে অবকাঠামো ও জনবলের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। বাথরুমের দরজা ও জানালা সংস্কারের জন্য গণপূর্ত বিভাগের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলেও জানান তিনি।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে রোগীর অতিরিক্ত চাপ, জনবল ঘাটতি এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার বিষয়টি সামনে এসেছে। অন্যদিকে রোগী ও স্বজনদের অভিযোগে উঠে এসেছে ময়লা-আবর্জনা, দুর্গন্ধ এবং অপর্যাপ্ত জায়গার সমস্যা। ফলে ওসমানী হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা পরিস্থিতির উন্নয়নে শুধু নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নয়, রোগীর চাপ অনুযায়ী জনবল ও অবকাঠামো বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পরিদর্শনের পর দ্রুত সমস্যা সমাধানের নির্দেশ দেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে প্রত্যাশিত পরিবর্তন কতটা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। একটি সরকারি হাসপাতালের সেবার মান শুধু চিকিৎসক ও ওষুধের ওপর নির্ভর করে না; রোগীর জন্য নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করাও চিকিৎসাসেবার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সিলেট বিভাগের বিপুলসংখ্যক মানুষের চিকিৎসার অন্যতম প্রধান ভরসা। প্রতিদিন হাজারো মানুষ এখানে চিকিৎসার জন্য আসেন। তাঁদের অনেকেই দূরবর্তী উপজেলা ও জেলা থেকে এসে হাসপাতালে ভর্তি হন। ফলে হাসপাতালের পরিবেশের সামান্য সমস্যাও দীর্ঘ সময় অবস্থান করা রোগী ও স্বজনদের জন্য বড় ভোগান্তির কারণ হতে পারে।
এ অবস্থায় পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থার নিয়মিত তদারকি, প্রয়োজনীয় কর্মী নিয়োগ, বাথরুম ও অন্যান্য অবকাঠামো সংস্কার এবং রোগীর চাপ অনুযায়ী শয্যা ও সেবার সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে রোগীদের অভিযোগ শোনার কার্যকর ব্যবস্থা থাকলে সমস্যাগুলো দ্রুত শনাক্ত ও সমাধান করা সম্ভব হতে পারে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নির্দেশের পর কর্তৃপক্ষ যে উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে, তার বাস্তব ফল কতটা দৃশ্যমান হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। রোগী ও স্বজনদের প্রত্যাশা—চিকিৎসার পাশাপাশি হাসপাতালের পরিবেশও যেন তাঁদের সুস্থ হয়ে ওঠার পথে নতুন কোনো ভোগান্তির কারণ না হয়।


