প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের জৈন্তাপুরে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা হয়েছে। মামলায় ১৫ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও ২৫ থেকে ৩০ জনকে আসামি করা হয়েছে। এ মামলায় চারজনকে আটক করে আদালতে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
জৈন্তাপুর মডেল থানার উপপরিদর্শক (নিরস্ত্র) মো. রফিকুল ইসলাম বাদী হয়ে গত ২১ সেপ্টেম্বর মামলাটি করেন। থানার মামলা নম্বর ২৪। মামলায় সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯-এর সংশোধিত বিভিন্ন ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
পুলিশ ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২০ সেপ্টেম্বর রাত ১১টা ৪৫ মিনিটের দিকে জৈন্তাপুর থানাধীন সারিঘাট বাজার এলাকায় অবস্থান করছিল পুলিশ। এ সময় গোপন সংবাদের মাধ্যমে পুলিশ জানতে পারে, জৈন্তাপুর ইউনিয়নের মোকামবাড়ি এলাকার আলুবাগানসংলগ্ন জৈন্তাপুর-গোয়াইনঘাট সীমান্তবর্তী নলজুরী ব্রিজ এলাকায় কয়েকজন লোক সমবেত হয়েছেন।
এরপর ২১ সেপ্টেম্বর রাত ১২টা ৩৫ মিনিটের দিকে পুলিশ ঘটনাস্থলের দিকে গেলে সেখানে থাকা কয়েকজন ব্যক্তি মশাল হাতে বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে বিভিন্ন দিকে চলে যান বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে স্থানীয় লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে সেখানে উপস্থিত কয়েকজনের পরিচয় শনাক্ত করা হয় বলে পুলিশের দাবি।
মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, ওই ব্যক্তিরা দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি, সরকারি কার্যক্রমে বাধা এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও অবকাঠামোয় ক্ষয়ক্ষতির উদ্দেশ্যে ষড়যন্ত্র করছিলেন। এজাহারে আরও দাবি করা হয়েছে, লন্ডনপ্রবাসী আওয়ামী লীগ নেতা হিসেবে উল্লেখ করা গোলাপ মিয়ার অর্থায়নে ওই ব্যক্তিরা সেখানে সমবেত হয়েছিলেন। তবে এসব অভিযোগ পুলিশের এজাহারে করা হয়েছে; অভিযোগগুলোর সত্যতা তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।
মামলায় নাম উল্লেখ করা ১৫ জন হলেন রাজু আহমদ (৩২), শাহিন আহমদ (২৯), সৈয়দ শামিম আহমদ (৩২), আব্দুস সামাদ (৩২), মানিক আহমদ চৌধুরী (৩৮), উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক রাজা (৪০), আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল জব্বার (৫২), উপজেলা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক শাহিন আহমদ (৩৮), জলিল আহমদ (৪২), ফতেপুর ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি আজিজুর রহমান (৪০), উপজেলা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক কুতুব উদ্দিন (৪০), আব্দুল জলিল (৫৫), রাসেল আহমদ (৩৮), নজরুল ইসলাম (৪৫) এবং হারুন মিয়া (৫০)।
পুলিশ জানিয়েছে, মামলার চার আসামিকে গত দুই দিনে অভিযান চালিয়ে আটক করা হয়েছে। তাঁরা হলেন উপর শ্যামপুর গ্রামের শাহিন আহমদ (২৯), আদর্শ গ্রামের আব্দুল জলিল (৫৫), আসামপাড়া গুচ্ছগ্রামের হারুন মিয়া (৫০) এবং একই মামলার ইউপি সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা মনসুর আহমদ। তাঁদের আদালতে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন জৈন্তাপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মাহবুবুর রহমান মোল্লা।
ওসি মাহবুবুর রহমান মোল্লা বলেন, জৈন্তাপুরের শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং যেকোনো ধরনের নাশকতা ও সন্ত্রাসবিরোধী কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মামলার নথি সম্পর্কে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এর আগে একই মামলায় আব্দুল জলিল (৬০) নামে আরও একজনকে ২১ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তাঁর নিজ বাড়ি থেকে গ্রেপ্তারের কথা পুলিশের আদালতে দেওয়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল। ওই প্রতিবেদনে তদন্ত চলমান থাকার কথা জানিয়ে তদন্তের স্বার্থে তাঁকে জেলহাজতে রাখার আবেদন করা হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন জৈন্তাপুর মডেল থানার উপপরিদর্শক (নিরস্ত্র) মো. দিদারুল আলম খান। তদন্তের মাধ্যমে মামলায় উত্থাপিত অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি যাচাই করা হবে বলে আইনগত প্রক্রিয়া অনুযায়ী আশা করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ঘিরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটছে। সেপ্টেম্বর মাসেও বিভিন্ন স্থানে মিছিল বা সমাবেশের অভিযোগে এসব সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা ও গ্রেপ্তারের খবর এসেছে।
সিলেটেও এ ধরনের তৎপরতা ঘিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান চলছে। চলতি মাসের শুরুতে সিলেট মহানগরীতে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের মিছিলের প্রস্তুতির অভিযোগে কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশিত হয়েছিল। সেসব ঘটনাতেও সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করা হয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে কোনো মামলায় আসামি হওয়া বা গ্রেপ্তার হওয়া নিজেই অপরাধ প্রমাণের সমান নয়। তদন্ত শেষে পুলিশ অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করবে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ও অন্যান্য আইনগত প্রক্রিয়ার পর আদালতের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই অভিযোগের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে। ফলে জৈন্তাপুরের এই মামলায় পুলিশের এজাহারে উল্লেখ করা অভিযোগগুলোকেও সেই আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যেই বিবেচনা করতে হবে।
এদিকে স্থানীয় পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং সম্ভাব্য সহিংসতা বা নাশকতা ঠেকাতে পুলিশি তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে জৈন্তাপুর থানা। মামলার তদন্ত এগিয়ে গেলে ঘটনার সঙ্গে কারা কীভাবে জড়িত ছিলেন এবং এজাহারে উল্লেখ করা অভিযোগের কতটা সত্যতা রয়েছে, সে বিষয়ে আরও তথ্য সামনে আসতে পারে।
বর্তমানে মামলার চার আসামিকে আদালতে পাঠানো হয়েছে এবং তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। অজ্ঞাতনামা আসামিদের পরিচয় শনাক্ত এবং মামলার অভিযোগের বিষয়ে প্রমাণ সংগ্রহে পুলিশ কাজ করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। আদালতের পরবর্তী কার্যক্রম ও তদন্তের অগ্রগতির ওপরই এখন মামলাটির পরবর্তী আইনি গতিপথ নির্ভর করছে।


