প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
নিখোঁজ বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলী-এর সন্ধান ও নিরাপদ প্রত্যাবর্তন কামনায় সিলেটে আয়োজিত দোয়া মাহফিল ঘিরে আবারও আলোচনায় এসেছে দেশের বহুল আলোচিত ‘গুম’ ইস্যু। দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে নিখোঁজ থাকা এই রাজনৈতিক নেতাকে ঘিরে পরিবারের বেদনা, দলীয় কর্মীদের আবেগ এবং রাজনৈতিক বক্তব্য—সব মিলিয়ে অনুষ্ঠানে তৈরি হয় এক আবেগঘন পরিবেশ।
শুক্রবার জুমার নামাজের পর হযরত শাহজালাল (রঃ) দরগাহ মসজিদ প্রাঙ্গণে সিলেট জেলা বিএনপির উদ্যোগে এই দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পানি সম্পদ মন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। এছাড়া স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মী, ইলিয়াস আলীর পরিবারের সদস্যসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, ২০১২ সালে নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে আজও ইলিয়াস আলীর কোনো সন্ধান মেলেনি। এই দীর্ঘ সময়জুড়ে তার পরিবার যেমন প্রতীক্ষার প্রহর গুনছে, তেমনি রাজনৈতিক অঙ্গনেও বিষয়টি একাধিকবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। দোয়া মাহফিলে উপস্থিত অনেকেই তার রাজনৈতিক অবদান স্মরণ করেন এবং তার আত্মত্যাগের কথা তুলে ধরেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেন, গুমের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে সরকার ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে এবং এ ধরনের ঘটনার বিচার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তিনি দাবি করেন, গুমের শিকার পরিবারের কষ্ট সরকার অনুভব করে এবং যথাযথ তদন্ত ও বিচার বিশ্লেষণের মাধ্যমে সত্য উদঘাটনে কাজ করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ইলিয়াস আলী ছিলেন একজন ত্যাগী ও গণতন্ত্রকামী নেতা, যিনি দেশের মানুষের অধিকার ও অবাধ নির্বাচনের দাবিতে সোচ্চার ছিলেন। তার রাজনৈতিক জীবনের নানা দিক তুলে ধরে তিনি বলেন, ছাত্ররাজনীতি থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে ইলিয়াস আলীর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বক্তব্যের একপর্যায়ে তিনি অভিযোগ করেন, ইলিয়াস আলী ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের শিকার’ হয়েছেন—যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক ও আলোচনা চলছে।
অনুষ্ঠানে বক্তারা আরও উল্লেখ করেন, দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গুম হওয়া ব্যক্তিদের সন্ধান পাওয়া এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। তারা বলেন, একটি রাষ্ট্রের জন্য এ ধরনের ঘটনা শুধু মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়, বরং আইনের শাসনের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ।
দোয়া মাহফিলে ইলিয়াস আলীর পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতি পুরো পরিবেশকে আরও আবেগঘন করে তোলে। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এত বছর পরও তারা আশাবাদী—একদিন সত্য উদঘাটিত হবে এবং তারা প্রিয়জনের খবর জানতে পারবেন। উপস্থিত অনেকে তাদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করেন এবং দোয়ার মাধ্যমে ইলিয়াস আলীর নিরাপদ প্রত্যাবর্তন কামনা করেন।
রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি অনুষ্ঠানে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও উঠে আসে। বক্তব্যে বিএনপির দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম, দলীয় নেতাকর্মীদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের বিষয়ও উল্লেখ করা হয়। বক্তারা দাবি করেন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে, যার মধ্যে ইলিয়াস আলীর ঘটনাটি অন্যতম।
একই অনুষ্ঠানে ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরা হয়। সিলেট অঞ্চলের উন্নয়ন, বিশেষ করে নদী খনন ও ক্রীড়া কার্যক্রম প্রসারের বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানানো হয়। এ প্রসঙ্গে তারেক রহমান-এর সম্ভাব্য সিলেট সফরের কথাও উল্লেখ করা হয়।
এছাড়া ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে জিয়াউর রহমান-এর সিলেট সফরের কথাও স্মরণ করা হয় এবং দলীয় ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা তুলে ধরা হয়। বক্তারা বলেন, বিএনপি সবসময় সিলেটবাসীর পাশে ছিল এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।
সব মিলিয়ে দোয়া মাহফিলটি শুধু একটি ধর্মীয় আয়োজনই ছিল না, বরং এটি হয়ে উঠেছিল একটি রাজনৈতিক ও মানবিক বার্তার প্ল্যাটফর্ম। এখানে যেমন নিখোঁজ এক নেতার জন্য প্রার্থনা করা হয়েছে, তেমনি তার ঘটনাকে ঘিরে রাষ্ট্র, রাজনীতি এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্নও নতুন করে সামনে এসেছে।
দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত থাকা এই গুমের ঘটনা আবারও প্রমাণ করে, এমন ইস্যুগুলোর সমাধান না হলে তা সমাজে অনিশ্চয়তা ও অবিশ্বাসের জন্ম দেয়। তাই সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের প্রতি আহ্বান—নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সত্য উদঘাটন করা হোক এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হোক।

