প্রকাশ: ২৫ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট মহানগরীর দক্ষিণ সুরমায় একটি কুরিয়ার সার্ভিস অফিসের সামনে থেকে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় অবৈধ ‘হাইব্রিড বোম’ ও অন্যান্য পণ্য উদ্ধারের ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। রবিবার (২৪ মে) বিকেলে পরিচালিত পুলিশের অভিযানে প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকার এসব পণ্য উদ্ধার করা হয়। এ সময় একজনকে আটক করা হয়েছে। ঘটনাটি ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ও কৌতূহল তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে উদ্ধার হওয়া ‘হাইব্রিড বোম’ নামের সামগ্রী নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সিলেট মহানগর পুলিশের দক্ষিণ সুরমা থানার একটি দল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কদমতলী এলাকায় জননী কুরিয়ার সার্ভিস অফিসের সামনে অভিযান পরিচালনা করে। বিকেল আনুমানিক ৪টার দিকে কুরিয়ার অফিসসংলগ্ন পাঁকা রাস্তার উপর সন্দেহজনক কিছু পণ্য দেখতে পেয়ে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে তল্লাশি চালায়। পরে সেখান থেকে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় অবৈধ পণ্য জব্দ করা হয় এবং ঘটনাস্থল থেকে সুমন মিয়া (২৮) নামের এক যুবককে আটক করা হয়।
আটককৃত সুমন মিয়া সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার কালিকৃষ্ণপুর এলাকার বাসিন্দা। তিনি ওই এলাকার মো. মহরম আলীর ছেলে বলে জানিয়েছে পুলিশ। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি উদ্ধার হওয়া পণ্যের বিষয়ে অসংলগ্ন তথ্য দেন বলে জানা গেছে। তবে পুলিশ ধারণা করছে, সীমান্তপথ ব্যবহার করে ভারতীয় এসব পণ্য দেশে এনে বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহের একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে এবং আটক ব্যক্তি সেই চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন।
অভিযানে উদ্ধার হওয়া সামগ্রীর মধ্যে ছিল ৪৮০ পিস কিও-কারভিন অলিভ অয়েল, ৩০০০ পিস ‘হাইব্রিড বোম’, ৬০০ পিস স্কিন শাইন ক্রিম এবং ৭৬০ প্যাকেট ইলেকট্রিক স্পার্কলার্স বা তারা বাতি। পুলিশ জানিয়েছে, এসব পণ্যের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৩ লাখ ২৮ হাজার ৩২০ টাকা। উদ্ধার হওয়া পণ্যগুলোর অধিকাংশই ভারতীয় উৎপাদিত এবং বাংলাদেশে অবৈধভাবে প্রবেশ করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশেষ করে ‘হাইব্রিড বোম’ নামের সামগ্রীটি নিয়ে জনমনে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যদিও এটি কী ধরনের পণ্য এবং কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়, সে বিষয়ে পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানায়নি, তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এ ধরনের সামগ্রী সাধারণত উচ্চ শব্দ বা আলোকসজ্জাসংক্রান্ত কাজে ব্যবহৃত হতে পারে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছে, কারণ অবৈধ বিস্ফোরক জাতীয় বা ঝুঁকিপূর্ণ সামগ্রী নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাজারে ছড়িয়ে পড়লে তা জননিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পথচারীরা জানান, কুরিয়ার সার্ভিসকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময় নানা ধরনের পণ্য আসা-যাওয়া করলেও এত বড় পরিমাণ অবৈধ সামগ্রী উদ্ধারের ঘটনা আগে শোনা যায়নি। অভিযানের সময় এলাকাজুড়ে কৌতূহলী মানুষের ভিড় জমে যায়। অনেকেই বলছেন, সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় সিলেট অঞ্চলে ভারতীয় পণ্যের অবৈধ প্রবেশ দীর্ঘদিনের সমস্যা। তবে সম্প্রতি এসব কার্যক্রম আরও বেড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা জানান, সীমান্ত এলাকা ব্যবহার করে চোরাচালানকারীরা প্রায়ই প্রসাধনী, আতশবাজি, ইলেকট্রনিক সামগ্রী এবং অন্যান্য নিষিদ্ধ পণ্য দেশের ভেতরে প্রবেশ করায়। পরে সেগুলো কুরিয়ার সার্ভিস বা পরিবহন ব্যবস্থার মাধ্যমে বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে মাঝে মাঝে এসব পণ্য জব্দ হলেও মূল চক্রের অনেকেই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে, সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) মো. মনজুরুল আলম জানিয়েছেন, উদ্ধার হওয়া পণ্যের ঘটনায় দক্ষিণ সুরমা থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইন, ১৯৭৪ এর সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলার নথিভুক্ত নম্বর ২৫ এবং তারিখ ২৪ মে ২০২৬। আটক ব্যক্তিকে আইনানুগ প্রক্রিয়া শেষে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সীমান্তপথে অবৈধ পণ্য প্রবেশ রোধে পুলিশ, বিজিবি ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সমন্বিতভাবে কাজ করছে। যারা চোরাচালান ও অবৈধ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিশেষ করে কুরিয়ার সার্ভিস বা পরিবহন ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে কেউ যাতে অবৈধ পণ্য পরিবহন করতে না পারে, সেদিকে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অবৈধ পণ্যের চোরাচালান নতুন কোনো বিষয় নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে প্রসাধনী, আতশবাজি, ইলেকট্রনিক সামগ্রী ও রাসায়নিক জাতীয় পণ্যের অবৈধ বাণিজ্য বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব পণ্য একদিকে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি করছে, অন্যদিকে মাননিয়ন্ত্রণহীন পণ্য বাজারে ছড়িয়ে পড়ে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি তৈরি করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অবৈধ চোরাচালান রোধে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানই যথেষ্ট নয়; সীমান্ত নজরদারি জোরদার, কুরিয়ার ও পরিবহন খাতের পর্যবেক্ষণ বৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের সচেতনতা বাড়ানোও জরুরি। কারণ একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে নানা কৌশলে এসব পণ্য বাজারজাত করে আসছে।
সিলেটের সচেতন মহল মনে করছে, দক্ষিণ সুরমায় এই অভিযান আবারও দেখিয়ে দিয়েছে যে, চোরাচালান চক্র এখনও সক্রিয় এবং তারা নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকাকে ব্যবহার করছে। তাই জননিরাপত্তা ও বাজার ব্যবস্থাকে সুরক্ষিত রাখতে আরও কঠোর নজরদারি ও নিয়মিত অভিযান প্রয়োজন।
এই ঘটনার পর স্থানীয়দের প্রত্যাশা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শুধু আটক ব্যক্তির মধ্যেই তদন্ত সীমাবদ্ধ না রেখে পুরো চক্রকে শনাক্ত করবে। কারণ মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনা না গেলে অবৈধ পণ্যের এই প্রবাহ বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়বে।


