প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
জুলাই জাতীয় সনদকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলমান বিতর্ক ও পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের মধ্যেই সিলেটে জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি পালন করেছে জেলা স্বেচ্ছাসেবক দল। বিএনপির বিরুদ্ধে “মিথ্যা প্রচারণা” ও “অপপ্রচারের” প্রতিবাদ জানিয়ে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় লিফলেট বিতরণ করেন সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। একইসঙ্গে জুলাই সনদের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে জনমত গঠনেরও চেষ্টা করা হয়।
বৃহস্পতিবার বিকেলে সিলেট নগরীর ব্যস্ততম কোর্ট পয়েন্ট ও বন্দরবাজার এলাকায় এই কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। লিফলেট বিতরণ কার্যক্রমে নেতৃত্ব দেন সিলেট জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক আব্দুল আহাদ খান জামাল এবং সদস্য সচিব শাকিল মুর্শেদ। এ সময় বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী নগরীর বিভিন্ন সড়কে সাধারণ মানুষের মাঝে লিফলেট বিতরণ করেন এবং জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপির অবস্থান ব্যাখ্যা করেন।
স্থানীয়ভাবে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই কর্মসূচিকে ঘিরে নগরীতে সাধারণ মানুষের মধ্যেও কৌতূহল লক্ষ্য করা যায়। কোর্ট পয়েন্ট ও বন্দরবাজার এলাকায় পথচারী, ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ লিফলেট সংগ্রহ করেন এবং নেতাকর্মীদের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় রাজনীতিতে “জুলাই সনদ” একটি আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে। ফলে এ নিয়ে মাঠপর্যায়ে প্রচারণা কর্মসূচি রাজনৈতিক দলগুলোর কৌশলগত অবস্থানেরই অংশ।
লিফলেট বিতরণ শেষে বন্দরবাজার এলাকায় এক সংক্ষিপ্ত সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সভাপতির বক্তব্যে জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক আব্দুল আহাদ খান জামাল বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে বিএনপি আন্তরিক এবং দলটি এ বিষয়ে অঙ্গীকারবদ্ধ। তিনি দাবি করেন, সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষরের মাধ্যমে যে সনদ তৈরি হয়েছে, বিএনপি তা অক্ষরে অক্ষরে মানতে চায়।
তিনি আরও বলেন, গণভোটের প্রশ্নপত্রের কিছু বিষয় নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করা হচ্ছে। বিশেষ করে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন ও অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান গঠনের বিষয়ে জুলাই সনদে যে নীতিমালা উল্লেখ রয়েছে, বিএনপি তা অনুসরণ করতে চায়। তবে গণভোটের চারটি প্রশ্নের মধ্যে “খ” নম্বর প্রশ্নটি জুলাই সনদের ১৮ ও ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদের পরিপন্থি বলে দাবি করেন তিনি। তার ভাষায়, এই প্রশ্নকে ব্যবহার করে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চলছে।
বক্তব্যে তিনি আরও অভিযোগ করেন, “একাত্তরের পরাজিত শক্তি” পরিকল্পিতভাবে বিএনপির বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। তার দাবি, জুলাই সনদ নিয়ে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা হচ্ছে। তিনি নেতাকর্মীদের এসব প্রচারণার বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকার আহ্বান জানান এবং জনগণকে “সত্য তথ্য” জানার অনুরোধ করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই সনদ এখন জাতীয় রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সনদের ব্যাখ্যা ও বাস্তবায়ন নিয়ে ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরছে। বিশেষ করে নির্বাচন ব্যবস্থা, সাংবিধানিক কাঠামো এবং উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠার মতো বিষয়গুলো নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক ক্রমেই বাড়ছে। বিএনপি ইতোমধ্যে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে বলেও দলটির নেতারা বিভিন্ন সময়ে উল্লেখ করেছেন।
স্বেচ্ছাসেবক দলের এই কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা। তাদের মধ্যে জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক দেলোয়ার হোসেন চৌধুরী, আব্দুর রউফ, কায়সান মাহমুদ সুমন, আহ্বায়ক কমিটির সদস্য খন্দকার ফয়েজ আহমদ, প্রভাষক মাকসুদ আলম, সাইফুল আলম কোরেশী, সেলিম আহমদ, আয়াত আলী প্রিন্সসহ বিভিন্ন উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতারা অংশ নেন। উপস্থিত নেতারা বলেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অপপ্রচারের জবাব জনগণের কাছে গিয়ে দিতে হবে এবং জুলাই সনদের প্রকৃত উদ্দেশ্য তুলে ধরতে হবে।
সিলেটের রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরেই বিএনপি ও তাদের অঙ্গসংগঠনগুলো সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। বিশেষ করে জাতীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে সামনে রেখে বিভিন্ন ইস্যুতে মাঠপর্যায়ে কর্মসূচি পালন বাড়ানো হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, লিফলেট বিতরণ কর্মসূচির মাধ্যমে একদিকে যেমন দলীয় নেতাকর্মীদের সক্রিয় রাখা হয়, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের মধ্যেও রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়।
তবে জুলাই সনদ নিয়ে দেশের রাজনৈতিক মহলে এখনও স্পষ্ট ঐকমত্য তৈরি হয়নি। বিভিন্ন দল ও নাগরিক সংগঠন সনদের কিছু বিষয়কে স্বাগত জানালেও কিছু ধারার সমালোচনাও করছে। বিশেষ করে নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা, সাংবিধানিক সংস্কার এবং ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। ফলে এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সচেতন মহলের মতে, রাজনৈতিক মতপার্থক্য গণতান্ত্রিক রাজনীতির অংশ হলেও বিভ্রান্তিকর তথ্য বা উত্তেজনাকর প্রচারণা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে পারে। তাই রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত দায়িত্বশীল আচরণ করা এবং জনগণের সামনে স্পষ্ট ও তথ্যভিত্তিক বক্তব্য উপস্থাপন করা।
সব মিলিয়ে, সিলেটে জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের লিফলেট বিতরণ কর্মসূচি শুধু একটি সাংগঠনিক কার্যক্রমেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা জাতীয় রাজনৈতিক আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছে। জুলাই সনদ ঘিরে আগামী দিনে রাজনৈতিক দলগুলোর তৎপরতা আরও বাড়তে পারে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


