প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সুনামগঞ্জের শান্ত একটি গ্রাম মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে গেছে এক মর্মান্তিক ঘটনায়। পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে ঘরের ধান রক্ষার চেষ্টা করতে গিয়ে বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছে নবম শ্রেণির স্কুলছাত্রী আখি। রবিবার বিকেলে সদর উপজেলার গৌরাঙ্গ ইউনিয়নের নলুয়ারপাড় গ্রামে ঘটে এই হৃদয়বিদারক ঘটনা। কিশোরী মেয়ের এমন আকস্মিক মৃত্যুতে পরিবার, স্বজন ও পুরো এলাকায় নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।
নিহত আখি (১৫) স্থানীয় জাহির উদ্দিনের মেয়ে এবং ইয়াকুব উল্লাহ পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্রী ছিল। পরিবারের সদস্যরা জানান, আখি ছিল অত্যন্ত শান্ত স্বভাবের ও মেধাবী একজন শিক্ষার্থী। লেখাপড়ার পাশাপাশি পরিবারের কাজেও নিয়মিত সহযোগিতা করত সে। তার স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে ভালো কিছু করা এবং বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটানো। কিন্তু প্রকৃতির নির্মম এক আঘাতে মুহূর্তেই থেমে গেল সেই স্বপ্নের পথচলা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রবিবার বিকেলের দিকে হঠাৎ করেই আকাশ কালো হয়ে আসে। কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হয় ঝড়ো হাওয়া ও বৃষ্টি। গ্রামের মানুষ তখন দ্রুত ঘরে ফিরতে শুরু করেন। এ সময় বাড়ির সামনের খলায় শুকাতে দেওয়া ধান বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে আখিও দ্রুত ধান সরাতে বের হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বৃষ্টির মধ্যে ধান গোছানোর একপর্যায়ে হঠাৎ বিকট শব্দে বজ্রপাত হয়। মুহূর্তেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আখি। পরিবারের সদস্যরা ছুটে গিয়ে তাকে অচেতন অবস্থায় দেখতে পান। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় দ্রুত তাকে উদ্ধার করে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
হাসপাতালে আখির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই পরিবারের সদস্যদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। মায়ের কান্না আর স্বজনদের বিলাপে উপস্থিত অনেকেই চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। যে মেয়ে কিছুক্ষণ আগেও পরিবারের কাজে ব্যস্ত ছিল, সে আর কখনো ঘরে ফিরবে না—এই বাস্তবতা যেন কেউ মেনে নিতে পারছিলেন না।
স্থানীয় প্রতিবেশীরা জানান, আখি খুবই ভদ্র ও পরিশ্রমী মেয়ে ছিল। পড়াশোনার পাশাপাশি পরিবারের কাজেও তার আগ্রহ ছিল। গ্রামের অনেকেই তাকে ভবিষ্যতের জন্য আশাবাদী একটি মেয়ে হিসেবে দেখতেন। তার এমন মৃত্যু পুরো এলাকাকে শোকাহত করে তুলেছে।
সুনামগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রতন শেখ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, বজ্রপাতে এক স্কুলছাত্রীর মৃত্যুর খবর পুলিশ পেয়েছে। তিনি জানান, পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ না থাকায় প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। তিনি ঘটনাটিকে অত্যন্ত দুঃখজনক বলে উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশে প্রতি বছর বজ্রপাতে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে। বিশেষ করে হাওরাঞ্চল ও খোলা মাঠপ্রধান এলাকায় ঝড়বৃষ্টির সময় বজ্রপাতের ঝুঁকি বেশি থাকে। কৃষিকাজ, মাছ ধরা কিংবা খোলা জায়গায় কাজ করার সময় অনেক মানুষ আকস্মিক বজ্রপাতে হতাহত হন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বজ্রপাতের প্রবণতা ও তীব্রতা বেড়েছে।
আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, কালবৈশাখী মৌসুমে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হলে এবং বজ্রসহ বৃষ্টি শুরু হলে খোলা জায়গা এড়িয়ে চলা জরুরি। বিশেষ করে মাঠ, জলাশয় কিংবা ধাতব বস্তু সংলগ্ন স্থানে অবস্থান করা ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু গ্রামাঞ্চলে অনেক সময় জীবিকার তাগিদে কিংবা ঘরের প্রয়োজনীয় কাজ করতে গিয়ে মানুষ ঝুঁকি নিয়েই বাইরে বের হন। ফলে দুর্ঘটনার শিকার হন অনেকে।
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে কৃষিনির্ভর মানুষের জীবনযাত্রা প্রকৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। ধান শুকানো, ফসল তোলা কিংবা মাঠের কাজের সময় আবহাওয়ার আচমকা পরিবর্তন অনেক সময় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। স্থানীয়দের মতে, সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি বজ্রপাতের সময় করণীয় বিষয়ে আরও কার্যকর প্রচারণা প্রয়োজন।
এদিকে আখির সহপাঠী ও শিক্ষকরাও তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক বলেন, আখি নিয়মিত ক্লাস করত এবং পড়াশোনায় মনোযোগী ছিল। তার মৃত্যু শুধু পরিবারের নয়, বিদ্যালয়ের জন্যও বড় ক্ষতি। সহপাঠীরাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোক প্রকাশ করেছে। অনেকেই লিখেছে, হাসিখুশি আখির এমন বিদায় তারা মেনে নিতে পারছে না।
মানবিক এই ঘটনাটি আবারও স্মরণ করিয়ে দিল, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সামনে মানুষ কতটা অসহায়। এক মুহূর্তের বজ্রপাত কেড়ে নিতে পারে একটি পরিবারের স্বপ্ন, একটি মায়ের সন্তান, একটি বিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থীকে। তাই সচেতনতা এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
সুনামগঞ্জের নলুয়ারপাড় গ্রামে এখন শুধু শোক আর নীরবতা। যে উঠানে আখি খেলাধুলা করত, যে খলায় ধান গোছাতে গিয়ে সে প্রাণ হারাল, সেখানে এখন স্বজনদের কান্না আর স্মৃতির ভার। পরিবারটি এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না, তাদের প্রিয় আখি আর কখনো ফিরে আসবে না।


