প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
তুরস্কের বাজারে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানিতে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা দিয়েছে। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর—এই তিন মাসে দেশটিতে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে তুরস্কে বাংলাদেশ থেকে ২১ কোটি ৫ লাখ ৪০ হাজার মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই রপ্তানি আয় ছিল ১০ কোটি ৫২ লাখ ১০ হাজার ডলার। ফলে এক বছরের ব্যবধানে তুরস্কের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়েছে ১০০ দশমিক ১১ শতাংশ।
বাংলাদেশের সামগ্রিক পণ্য রপ্তানির প্রবৃদ্ধির তুলনায় তুরস্কের বাজারে এই প্রবৃদ্ধির হার বেশ উল্লেখযোগ্য। একই সময়ে দেশের মোট পণ্য রপ্তানি আয় হয়েছে ১ হাজার ৩০৯ কোটি ৪১ লাখ ৩০ হাজার মার্কিন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১ হাজার ২৩১ কোটি ৩১ লাখ ৭০ হাজার ডলার। অর্থাৎ তিন মাসে দেশের সামগ্রিক পণ্য রপ্তানি বেড়েছে ৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ। সেই তুলনায় তুরস্কে বাংলাদেশের রপ্তানি বৃদ্ধির হার ছিল অনেক বেশি।
রপ্তানির এই প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও খাতসংশ্লিষ্টরা। দীর্ঘদিন ধরে তৈরি পোশাক বাংলাদেশের রপ্তানির প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করলেও নতুন বাজারে প্রবেশ এবং প্রচলিত বাজারে পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই বাড়ছে। তুরস্কের বাজারে রপ্তানি বৃদ্ধির বর্তমান প্রবণতা সেই সুযোগকে নতুন করে সামনে এনেছে।
তুরস্কে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি পণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক। দেশটির বাজারে বাংলাদেশি তৈরি পোশাকের চাহিদা বৃদ্ধির পাশাপাশি পাট ও পাটজাত পণ্য, জুতা, অপটিক্যাল সামগ্রী এবং চিকিৎসা ও বস্ত্রশিল্পে ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জাম রপ্তানিরও সুযোগ রয়েছে। ফলে শুধু তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভর না করে অন্যান্য পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ করা গেলে তুরস্কে বাংলাদেশের রপ্তানি আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসানের মতে, তুরস্কে মানুষের আয় ও জীবনযাত্রার মান বাড়ার সঙ্গে দেশটির স্থানীয় শ্রমবাজারেও পরিবর্তন এসেছে। দেশটির শ্রমিকদের একটি অংশ ধীরে ধীরে তৈরি পোশাকশিল্প থেকে সরে যাওয়ায় স্থানীয় উৎপাদনে এক ধরনের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। এই ঘাটতি পূরণে বিদেশি পোশাকের ওপর নির্ভরতা এবং আমদানির চাহিদা বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিকে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের জন্য সম্ভাবনাময় হিসেবে দেখছেন তিনি। তার মতে, বাংলাদেশের বড় উৎপাদন সক্ষমতা, মানসম্পন্ন পণ্য, তুলনামূলক প্রতিযোগিতামূলক মূল্য এবং নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহের সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে তুরস্কের বাজারে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করা সম্ভব। তবে বাজারের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে শুধু প্রচলিত পণ্যের রপ্তানি বাড়ালেই হবে না, একই সঙ্গে পণ্যের বৈচিত্র্য ও মূল্য সংযোজনের ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
বিশ্ববাজারে পোশাকের চাহিদা ক্রমেই বৈচিত্র্যময় হচ্ছে। ক্রেতারা এখন শুধু কম দামের পোশাকের দিকে তাকিয়ে নেই; গুণগত মান, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন, দ্রুত সরবরাহ এবং নির্দিষ্ট ধরনের কাপড় ও নকশার চাহিদাও বাড়ছে। বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য তুরস্কের বাজারে উচ্চমূল্যের পোশাক, মানবসৃষ্ট তন্তু এবং কারিগরি বস্ত্রের মতো পণ্যে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে পাট ও পাটজাত পণ্য, জুতা এবং অন্যান্য সম্ভাবনাময় পণ্যের বাজারও অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে ব্যবসায়িক যোগাযোগ আরও বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা, ক্রেতা-বিক্রেতা বৈঠক, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দলের সফর এবং সরাসরি বাণিজ্যিক যোগাযোগের মাধ্যমে বাংলাদেশি পণ্যের পরিচিতি বাড়ানো যেতে পারে। নতুন ক্রেতা তৈরি এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য এ ধরনের উদ্যোগ বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে।
দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়েও বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশি তৈরি পোশাক খাতের প্রতিনিধিরা তুরস্কের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানো এবং বস্ত্র খাতে কৌশলগত সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। এ ধরনের আলোচনায় বাংলাদেশে মানবসৃষ্ট তন্তু ও কারিগরি বস্ত্র খাতে যৌথ বিনিয়োগের সম্ভাবনা, তুরস্ক থেকে কাঁচামাল ও আধুনিক বস্ত্রযন্ত্র আমদানি এবং দ্রুত পণ্য পরিবহনের জন্য তুরস্কের বিমান ও লজিস্টিক অবকাঠামো ব্যবহারের বিষয়ও উঠে এসেছে।
তুরস্কের শক্তিশালী শিল্পভিত্তি বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্যও সম্ভাবনার নতুন ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। দেশটি থেকে উন্নতমানের কাঁচামাল, অর্গানিক তুলা এবং আধুনিক বস্ত্রযন্ত্র আমদানির সুযোগ তৈরি হলে বাংলাদেশের উৎপাদনকারীরা আরও উচ্চমূল্যের ও প্রযুক্তিনির্ভর পণ্য উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়াতে পারেন। একই সঙ্গে দুই দেশের উদ্যোক্তাদের মধ্যে যৌথ উদ্যোগ বাড়লে প্রযুক্তি, দক্ষতা ও বাজারসংযোগের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশ ও তুরস্কের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যকে আরও বড় পরিসরে নেওয়ার লক্ষ্যও রয়েছে। গত জুনে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের বাংলাদেশ সফরের সময় দুই দেশের বর্তমান প্রায় ১৩০ কোটি ডলারের বাণিজ্য ২০০ কোটি ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে আলোচনা হয়। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে উভয় দেশের ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের জন্য আরও অনুকূল পরিবেশ তৈরি, বাণিজ্য বাধা কমানো এবং পণ্য ও বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্র খুঁজে বের করার প্রয়োজন রয়েছে।
ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাসান আরিফও তুরস্কের বাজারে রপ্তানি বৃদ্ধির এই প্রবণতাকে ধরে রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তার মতে, পণ্যভিত্তিক রপ্তানি সক্ষমতা এবং তুরস্কের ক্রেতাদের চাহিদা বিশ্লেষণ করে নতুন সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। প্রচলিত তৈরি পোশাকের পাশাপাশি পাট ও পাটজাত পণ্য, জুতা, বিভিন্ন তৈরি পণ্য, অপটিক্যাল সামগ্রী, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং বস্ত্রশিল্পের বিভিন্ন সরঞ্জামের বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ খুঁজে দেখা প্রয়োজন।
তুরস্কে রপ্তানি বৃদ্ধির এই চিত্র বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্যও একটি ইতিবাচক সম্ভাবনার বার্তা দিচ্ছে। একটি নির্দিষ্ট বাজারে হঠাৎ রপ্তানি বাড়া যেমন আশাব্যঞ্জক, তেমনি সেই প্রবৃদ্ধিকে দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা, বৈশ্বিক অর্থনীতির পরিবর্তন, উৎপাদন ব্যয়, কাঁচামালের দাম এবং ক্রেতাদের চাহিদার পরিবর্তনের মতো নানা বিষয় রপ্তানির ধারাবাহিকতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
এ কারণে তুরস্কের বাজারে বর্তমান প্রবৃদ্ধিকে স্থায়ী করতে হলে শুধু রপ্তানির পরিমাণ বাড়ানোর দিকে নজর দিলেই হবে না; পণ্যের মান, নকশা, মূল্য সংযোজন, সময়মতো সরবরাহ এবং বাজারভিত্তিক উৎপাদন সক্ষমতার উন্নয়নও জরুরি। একই সঙ্গে সরকারি সহায়তা, বেসরকারি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ এবং দুই দেশের ব্যবসায়িক যোগাযোগকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে তুরস্কে বাংলাদেশের রপ্তানি ১০০ শতাংশের বেশি বেড়ে যাওয়া নতুন বাজার সম্প্রসারণের সম্ভাবনাকে স্পষ্ট করেছে। তৈরি পোশাকের শক্ত অবস্থান ধরে রাখার পাশাপাশি পণ্য বৈচিত্র্য, যৌথ বিনিয়োগ এবং নতুন ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে পারলে এই বাজার বাংলাদেশের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বর্তমান প্রবৃদ্ধিকে দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক সাফল্যে রূপ দিতে পারলে শুধু তুরস্কের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কই গভীর হবে না, একই সঙ্গে ২০০ কোটি ডলারের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের লক্ষ্যে পৌঁছানোর পথও আরও সুগম হতে পারে।


