প্রকাশ: ৫ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নারী ভোটারদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে আশা করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তবে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে নারীদের উপস্থিতি বাড়লেও প্রার্থী হিসেবে নারীদের অংশগ্রহণ আশানুরূপ নাও হতে পারে—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। তাঁর মতে, সামাজিক সংস্কৃতি, প্রচলিত বিশ্বাস ও নানা ধরনের কাঠামোগত বাধা এখনো নারীদের নির্বাচনি রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হওয়ার পথে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে আছে।
সোমবার (৫ অক্টোবর) নির্বাচন কমিশনের ইলেক্টোরাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের (ইটিআই) সম্মেলন কক্ষে নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম ও নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় জেন্ডার সমতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আয়োজিত এক পর্যালোচনা কর্মশালায় সিইসি এসব কথা বলেন। কর্মশালার মূল আলোচ্য ছিল নির্বাচন কমিশনের জন্য প্রস্তুত করা খসড়া ‘জেন্ডার সমতা কৌশল’। সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত নিয়ে কৌশলটি চূড়ান্ত করার লক্ষ্যেই এ আয়োজন করা হয়।
সিইসি বলেন, গণতন্ত্রের কার্যকর বিকাশে নারীর অংশগ্রহণ অপরিহার্য। শুধু ভোটার হিসেবে নারীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করলেই গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ পূর্ণতা পায় না; নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার বিভিন্ন স্তরেও নারীদের অংশগ্রহণ প্রয়োজন। তাঁর মতে, দেশের জনগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধেককে রাজনৈতিক ও নির্বাচনি প্রক্রিয়ার বাইরে রেখে একটি শক্তিশালী ও বিশ্বাসযোগ্য গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা কঠিন।
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে সিইসি বলেন, নারী ভোটারদের ব্যাপক অংশগ্রহণের আশা থাকলেও নারী প্রার্থীর সংখ্যা কম হতে পারে। এর পেছনে সামাজিক সংস্কৃতি ও প্রচলিত বিশ্বাসের প্রভাব রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, সমাজে কোনো পরিবর্তন সহজে আসে না; পরিবর্তনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সচেতনতা ও উদ্যোগ প্রয়োজন।
এ কারণে শুধু নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ উদ্যোগের ওপর নির্ভর না করে বৃহৎ পরিসরে সচেতনতামূলক প্রচার চালানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সিইসি। নারীদের নির্বাচনি অংশগ্রহণ বাড়াতে বাস্তব তথ্য ও গবেষণার ভিত্তিতে নীতি প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
কর্মশালায় আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল নারী ভোটার ও নারী প্রার্থীদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা। নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় নারীরা যাতে নিরাপদ ও বাধাহীন পরিবেশে অংশ নিতে পারেন, সে জন্য আইন ও নীতিমালার পাশাপাশি বাস্তব পরিস্থিতিতেও পরিবর্তন আনার প্রয়োজনীয়তা উঠে আসে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্য, হয়রানি এবং রাজনৈতিক চাপ নারীদের নির্বাচনি অংশগ্রহণকে নিরুৎসাহিত করতে পারে বলে আলোচনায় গুরুত্ব দেওয়া হয়।
জাতিসংঘের ইউএন উইমেনের কান্ট্রি প্রতিনিধি গীতাঞ্জলি সিং বলেন, নারীদের নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে হলে তাদের সামনে থাকা আর্থিক, সামাজিক ও প্রযুক্তিগত বাধা দূর করতে হবে। অর্থাৎ শুধু প্রার্থী হওয়ার সুযোগ তৈরি করাই যথেষ্ট নয়; প্রচার, যোগাযোগ, তথ্যপ্রাপ্তি এবং নির্বাচনি কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রেও নারীদের বাস্তব সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।
বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার কাঠামোতে নারীদের অংশগ্রহণের জন্য বিদ্যমান সুযোগের কথাও কর্মশালায় উঠে আসে। নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নারীদের যুক্ত হওয়ার অনেক সুযোগ রয়েছে। স্থানীয় সরকারে নারীদের জন্য সংরক্ষিত পদ রয়েছে এবং সেখানে ভালোভাবে কাজ করতে পারলে জাতীয় রাজনীতিতেও ভূমিকা রাখার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে সুযোগ থাকা এবং সেই সুযোগে নারীদের বাস্তব অংশগ্রহণের মধ্যে ব্যবধান রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, গত জাতীয় নির্বাচনেও নারী প্রার্থীর সংখ্যা কম ছিল। দলীয় রাজনীতি এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে পারলে নির্বাচনে নারী প্রার্থীর সংখ্যাও বাড়তে পারে।
এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সিদ্ধান্ত অনেক সময় দলীয় মনোনয়ন ও সাংগঠনিক কাঠামোর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। দলীয় নেতৃত্বে নারীর প্রতিনিধিত্ব এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীদের উপস্থিতি বাড়লে নির্বাচনে নারী প্রার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীদের বিরুদ্ধে ছড়ানো ভুয়া তথ্য ও অপতথ্যের বিষয়েও সতর্ক করেছেন। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ছড়ানো বিভ্রান্তিকর তথ্য নারী প্রার্থী ও ভোটারদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই নির্বাচনি পরিবেশে তথ্যের সত্যতা যাচাই এবং অপতথ্য মোকাবিলায় কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার নারী ভোটারদের নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, নারী ভোটার ও প্রার্থীদের হয়রানি বন্ধ করার পাশাপাশি নারী প্রার্থীদের জন্য সমান প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ভয়, চাপ বা বৈষম্য যাতে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সে বিষয়েও কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।
অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনার তাহমিদা আহমেদ নারীর অধিকার ও নিরাপত্তার বিষয়টিকে আরও বিস্তৃতভাবে দেখার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তাঁর মতে, দেশে নারীর অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন আইন থাকলেও বাস্তব পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা ও সুশাসনের ঘাটতি রয়েছে। ফলে নারীদের বৃহত্তর পরিসরে নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে হলে সমস্যার গভীরে গিয়ে কারণ চিহ্নিত করতে হবে।
তিনি বলেন, শুধু সভা-সেমিনার বা শহরকেন্দ্রিক পরিকল্পনা দিয়ে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানো সম্ভব নয়। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল ও গ্রামের নারীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা, প্রতিবন্ধকতা এবং প্রয়োজন বুঝতে হবে। মাঠপর্যায়ে গিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেই কার্যকর কৌশল তৈরি করা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদও নারীর অধিকার সুরক্ষায় আইনের পাশাপাশি সামাজিক পরিবর্তনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, নারীদের সুরক্ষায় দেশে আইন রয়েছে; তবে শুধু আইন প্রণয়ন করলেই প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসে না। সামাজিক মানসিকতা ও আচরণেও পরিবর্তন প্রয়োজন।
বাংলাদেশে নির্বাচনি রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণের ইতিহাস দীর্ঘ হলেও প্রত্যক্ষ প্রতিযোগিতামূলক রাজনীতিতে নারীর উপস্থিতি এখনো নানা চ্যালেঞ্জের মুখে। পারিবারিক ও সামাজিক বাধা, অর্থনৈতিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, রাজনৈতিক নেটওয়ার্কে প্রবেশের অসুবিধা, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং অনলাইনে হয়রানির আশঙ্কা—এসব বিষয় নারী প্রার্থীদের জন্য অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে। এ কারণে নারী ভোটারের সংখ্যা বেশি হওয়ার সঙ্গে নারী প্রার্থীর সংখ্যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়বে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
জাতিসংঘ বাংলাদেশের সাম্প্রতিক জেন্ডার সমতা বিষয়ক তথ্যেও নারীর ক্ষমতায়ন ও অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে কাঠামোগত এবং সামাজিক বাধা মোকাবিলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সংস্থাটির মতে, নারীর সক্ষমতা, সম্পদ ও সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি বৈষম্যমূলক সামাজিক রীতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক বাধা মোকাবিলা করা প্রয়োজন।
এ অবস্থায় নির্বাচন কমিশনের প্রস্তাবিত ‘জেন্ডার সমতা কৌশল’ কতটা বাস্তবভিত্তিক ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। শুধু নীতিমালা তৈরি করলেই হবে না; মাঠপর্যায়ে তার বাস্তব প্রয়োগ, নারী প্রার্থীদের নিরাপত্তা, সমান প্রচারের সুযোগ, তথ্যপ্রাপ্তি এবং হয়রানি প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন সেই বাস্তবতা যাচাইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হতে পারে। ভোটার হিসেবে নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য ইতিবাচক হলেও নির্বাচনি প্রতিযোগিতায় তাঁদের প্রতিনিধিত্বও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভোটার হিসেবে অংশগ্রহণ এবং জনপ্রতিনিধি হিসেবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ—দুটি ভিন্ন স্তরের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ।
সিইসি যে আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন, তা মূলত এই ব্যবধানের দিকেই ইঙ্গিত করে। নারীরা বিপুল সংখ্যায় ভোট দিলেও যদি প্রার্থী হিসেবে তাঁদের উপস্থিতি সীমিত থাকে, তাহলে নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিত্বে সেই অংশগ্রহণের পূর্ণ প্রতিফলন নাও ঘটতে পারে।
তাই নারী প্রার্থীর সংখ্যা বাড়াতে নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল, স্থানীয় প্রশাসন, নাগরিক সমাজ এবং গণমাধ্যম—সব পক্ষের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নারী ভোটার ও প্রার্থীদের নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং সমান সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। সচেতনতা, তথ্যভিত্তিক নীতি এবং সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তনের সমন্বয় ঘটাতে পারলে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় নারীর অংশগ্রহণ আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে নারীর অংশগ্রহণের প্রশ্নটি শুধু নারী প্রার্থীর সংখ্যা বাড়ানোর বিষয় নয়; এটি গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্ব কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে, সেই প্রশ্নের সঙ্গেও জড়িত। নির্বাচন কমিশনের কর্মশালায় উঠে আসা আলোচনা সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে। এখন প্রস্তাবিত কৌশল কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনে তার প্রতিফলন কতটা দেখা যায়, সেদিকেই নজর থাকবে।


