প্রকাশ: ৫ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পরপর দুই রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ উঠেছে। স্বজনদের দাবি, গুরুতর অবস্থায় থাকা রোগীদের সময়মতো প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও অক্সিজেন দেওয়া হয়নি। এ অভিযোগকে কেন্দ্র করে রোববার রাতে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি একপর্যায়ে এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক ও নার্সদের সঙ্গে রোগীর স্বজনদের বাগ্বিতণ্ডা ও হট্টগোলের ঘটনা ঘটে।
ঘটনাটি ঘটে ৪ অক্টোবর রাত সাড়ে ৯টার দিকে চুনারুঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। খবর পেয়ে চুনারুঘাট থানা-পুলিশ এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা হাসপাতালে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। হট্টগোলের সময় দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক ও নার্সকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগও উঠেছে। তবে পুরো ঘটনার প্রকৃত কারণ ও চিকিৎসায় কোনো ধরনের গাফিলতি হয়েছিল কি না, তা তদন্তের পরই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।
হাসপাতাল সূত্র ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মিরাশি ইউনিয়নের আসলা গ্রামের আকবর আলীর মেয়ে তানজিলা আক্তার, বয়স ২০ বছর, শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা নিয়ে ২ অক্টোবর চুনারুঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হন। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শনিবার তাঁর শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছিল বলে স্বজনদের পক্ষ থেকে জানানো হয়।
তবে রোববার রাতে তাঁর শ্বাসকষ্ট আবার বেড়ে যায়। এ সময় স্বজনেরা দায়িত্বে থাকা নার্সকে দ্রুত অক্সিজেন দেওয়ার অনুরোধ করেন বলে অভিযোগ করেন। স্বজনদের দাবি, তাঁদের অনুরোধের পরও দ্রুত অক্সিজেনের ব্যবস্থা করা হয়নি। একপর্যায়ে তানজিলার মৃত্যু হয়।
তানজিলার মৃত্যুর ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর স্বজনদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়। একই সময়ে হাসপাতালে থাকা অন্য রোগী ও তাঁদের স্বজনদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, এর কিছুক্ষণ আগেও একই এলাকায় চিকিৎসাধীন আরেক রোগীর মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, ওই রোগীর ক্ষেত্রেও সময়মতো অক্সিজেন পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ‘সংবাদ’-এর প্রতিবেদনেও দুই রোগীর মৃত্যুর মধ্যে প্রায় আধা ঘণ্টার ব্যবধানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
পরপর দুই রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতাল প্রাঙ্গণে স্বজনদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। তাঁরা চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ তুলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। একপর্যায়ে হাসপাতালের ভেতরে হট্টগোল শুরু হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। পরে পুলিশ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি শান্ত করেন।
এ ঘটনায় দায়িত্ব পালনকারী চিকিৎসক ও নার্সদেরও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। হট্টগোলের সময় তাঁদের লাঞ্ছিত করার অভিযোগ রয়েছে। রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে স্বজনদের ক্ষোভের কারণ তদন্তের বিষয় হলেও কোনো হাসপাতালেই দায়িত্ব পালনরত চিকিৎসক বা নার্সের ওপর হামলা বা লাঞ্ছনা গ্রহণযোগ্য নয়। একই সঙ্গে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ উঠলে সেটিও যথাযথ প্রক্রিয়ায় তদন্ত করে সত্যতা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
চুনারুঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. মোজাম্মেল হোসেন জানিয়েছেন, রোগীর স্বজনেরা চিকিৎসায় অবহেলা এবং সময়মতো অক্সিজেন না দেওয়ার অভিযোগ করেছেন। অভিযোগের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং এ ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
চিকিৎসা অবহেলার অভিযোগের ক্ষেত্রে তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রতিটি দিক যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ। রোগীর শারীরিক অবস্থা, চিকিৎসকের দেওয়া নির্দেশনা, নার্সিং সেবা, অক্সিজেনের প্রয়োজনীয়তা ও প্রাপ্যতা, চিকিৎসার সময়সূচি এবং মৃত্যুর প্রকৃত কারণ—এসব বিষয় পর্যালোচনা করেই কোনো ধরনের গাফিলতি হয়েছিল কি না, তা নির্ধারণ করা সম্ভব। শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দায়ী করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি গুরুতর অভিযোগ উঠলে সেটিকে উপেক্ষা করাও উচিত নয়।
চুনারুঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স স্থানীয় মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি চিকিৎসাকেন্দ্র। উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে সাধারণত আশপাশের ইউনিয়ন ও গ্রাম থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ চিকিৎসা নিতে আসেন। বিশেষ করে শ্বাসকষ্টসহ জরুরি পরিস্থিতিতে রোগীর দ্রুত মূল্যায়ন ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে চিকিৎসাসেবা, অক্সিজেন সরবরাহ ও জরুরি ব্যবস্থাপনা যথাযথভাবে কার্যকর আছে কি না, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে।
চুনারুঘাটের এই ঘটনার মধ্য দিয়ে উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবায় রোগী ও স্বজনদের আস্থা এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের জবাবদিহির বিষয়টিও সামনে এসেছে। রোগীর স্বজনেরা যখন চিকিৎসার কোনো সিদ্ধান্ত বা সেবার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন, তখন তাঁদের সঙ্গে দায়িত্বশীল ও স্পষ্ট যোগাযোগ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। একইভাবে হাসপাতালের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি।
এর আগে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালেও রোগীর মৃত্যু বা চিকিৎসা নিয়ে অসন্তোষের পর স্বজনদের সঙ্গে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরোধের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় একদিকে রোগীর স্বজনদের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের প্রয়োজন হয়, অন্যদিকে স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে চুনারুঘাটের ঘটনাতেও উত্তেজনার পরিবর্তে তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদ্ঘাটনের পথেই এগোনো প্রয়োজন।
তানজিলা আক্তারসহ দুই রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় তাঁদের পরিবারের সদস্যরা এখন প্রকৃত কারণ জানতে চান। চিকিৎসায় কোনো গাফিলতি ছিল কি না, অক্সিজেন দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বিলম্ব হয়েছিল কি না কিংবা অন্য কোনো শারীরিক জটিলতায় তাঁদের মৃত্যু হয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তেই স্পষ্ট হতে পারে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের কথা জানিয়েছে। এখন সেই তদন্ত কত দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন হয় এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সেদিকেই নজর থাকবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে জরুরি রোগীদের চিকিৎসা ও অক্সিজেন ব্যবস্থাপনায় কোনো ধরনের ঘাটতি যেন না থাকে, সে বিষয়েও কার্যকর পদক্ষেপ প্রত্যাশা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
চুনারুঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এই ঘটনায় দুই পরিবারের স্বজন হারানোর বেদনার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবার মান, জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহির প্রশ্ন সামনে এসেছে। তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা পরিষ্কার হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এটাই এখন সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা।


