প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সুনামগঞ্জের ছাতকে দীর্ঘ প্রায় এক বছর বন্ধ থাকার পর বাংলাদেশ রেলওয়ের একমাত্র সরকারি কংক্রিট স্লিপার প্লান্টে আবারও উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিনের যান্ত্রিক ত্রুটি, কাঁচামালের সংকট এবং জনবল ঘাটতির পাশাপাশি ভয়াবহ বন্যায় প্লান্টের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এতদিন উৎপাদন বন্ধ ছিল। মেরামত, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শেষে গত রোববার থেকে প্লান্টটিতে পুরোদমে কংক্রিট স্লিপার উৎপাদন শুরু হয়েছে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি শিল্প স্থাপনায় দীর্ঘ বিরতির পর উৎপাদন পুনরায় চালু হওয়ায় বাংলাদেশ রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের মধ্যে নতুন করে আশাবাদ তৈরি হয়েছে। উৎপাদন কার্যক্রম শুরুর পর প্লান্ট এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন রেলওয়ে ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তাদের প্রত্যাশা, নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী উৎপাদন অব্যাহত রাখা গেলে রেলওয়ের স্লিপারের চাহিদা পূরণে প্লান্টটি আবারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।
রেলওয়ে-সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ছাতকের কংক্রিট স্লিপার প্লান্টটি দীর্ঘদিন ধরেই নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়ে আসছিল। যন্ত্রপাতির ত্রুটি, প্রয়োজনীয় কাঁচামালের সংকট এবং পর্যাপ্ত জনবলের অভাবের কারণে বিভিন্ন সময়ে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। কখনো উৎপাদন আংশিকভাবে চললেও পরবর্তী সময়ে আবারও প্লান্টটি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে দীর্ঘমেয়াদে এর উৎপাদন সক্ষমতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
এর মধ্যে ভয়াবহ বন্যা প্লান্টটির সংকট আরও বাড়িয়ে দেয়। বন্যার পানিতে পুরো কারখানা এলাকা তলিয়ে যাওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ মেশিনারিজ পানিতে নিমজ্জিত হয় এবং ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পরও ক্ষতিগ্রস্ত যন্ত্রপাতি তাৎক্ষণিকভাবে উৎপাদনে নেওয়া সম্ভব হয়নি। বিভিন্ন যন্ত্রাংশ মেরামত, প্রয়োজনীয় কারিগরি কাজ এবং ধাপে ধাপে পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হয়। এ কারণেই প্লান্টটি পুনরায় চালু করতে প্রায় এক বছর সময় লেগেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এর আগেও গত বছর কয়েক দফায় প্লান্টটির উৎপাদন পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু উৎপাদন শুরুর পর যান্ত্রিক ত্রুটি এবং কাঁচামালের সংকট দেখা দেওয়ায় অল্প সময়ের মধ্যেই কার্যক্রম আবারও থেমে যায়। ফলে শুধু উৎপাদন শুরু করাই নয়, এবার উৎপাদনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
ছাতকের এই সরকারি কংক্রিট স্লিপার প্লান্টের রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। রেললাইনকে আরও মজবুত, টেকসই ও নিরাপদ করার লক্ষ্য নিয়ে ১৯৮৮ সালে দৈনিক ২৬৪টি কংক্রিট স্লিপার উৎপাদনের সক্ষমতা নিয়ে কারখানাটির যাত্রা শুরু হয়। কাঠের স্লিপারের তুলনায় কংক্রিট স্লিপার অধিক টেকসই হওয়ায় রেলপথের স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এর গুরুত্ব রয়েছে। ছাতক প্লান্টে উৎপাদিত স্লিপার মূলত বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন রেলপথে ব্যবহারের জন্য সরবরাহ করা হয়ে থাকে।
প্রতিষ্ঠার পর দীর্ঘ সময় প্লান্টটি স্বাভাবিকভাবে উৎপাদন চালিয়ে গেলেও পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ধরনের সমস্যায় এর কার্যক্রম বারবার ব্যাহত হয়েছে। ২০০০ সাল পর্যন্ত কারখানাটি তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক গতিতে চললেও এরপর বিভিন্ন সময়ে উৎপাদন বন্ধ ও পুনরায় চালুর ঘটনা ঘটেছে। ২০১২, ২০১৪, ২০১৬ এবং ২০২০ সালেও বিভিন্ন মেয়াদে প্লান্টটি বন্ধ থাকার তথ্য রয়েছে। ফলে কারখানাটির উৎপাদন সক্ষমতা ধরে রাখা এবং আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে।
বর্তমানে বিশ্বাস কনস্ট্রাকশন লিমিটেড নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্লান্টটির উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। পুনরায় উৎপাদন শুরুর পর আগামী এক বছরের জন্য একটি নির্দিষ্ট উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী সপ্তাহে ছয় দিন প্রতিদিন ২৪০টি করে মোট ২৫ হাজার কংক্রিট স্লিপার উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে। এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে মেশিনারিজ সচল রাখার পাশাপাশি পর্যাপ্ত কাঁচামাল সরবরাহ এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি জনবল নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে প্লান্টটি পুনরায় চালু হওয়ার পাশাপাশি রেলওয়ের স্লিপার সংগ্রহের বর্তমান ব্যবস্থাপনা নিয়েও স্থানীয়ভাবে প্রশ্ন রয়েছে। এরই মধ্যে পঞ্চগড়, বাংলাবান্ধা ও জামালপুরে বেসরকারি খাতে বেশ কয়েকটি কংক্রিট স্লিপার প্লান্ট গড়ে উঠেছে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এসব বেসরকারি প্লান্ট থেকেও স্লিপার সংগ্রহ করছে। ফলে ছাতকের সরকারি প্লান্টের উৎপাদন সক্ষমতা সর্বোচ্চ মাত্রায় কাজে লাগানো যাচ্ছে কি না, তা নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি এই প্লান্টের উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে চালু রাখা গেলে রেলওয়ের নিজস্ব স্লিপার উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়বে। এতে প্রয়োজনের সময় দ্রুত স্লিপার সরবরাহ করা এবং রেললাইন রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়নকাজে প্রয়োজনীয় উপকরণ জোগানের ক্ষেত্রে সুবিধা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের অব্যবহৃত বা অকার্যকর অবস্থার কারণে যন্ত্রপাতির সক্ষমতা আরও কমে যাওয়ার ঝুঁকিও কমানো সম্ভব হবে।
উৎপাদন শুরুর পর গত রোববার প্লান্টটি পরিদর্শন করেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বিশ্বাস কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের পরিচালক মো. আশরাফ উদ্দিন। এ সময় বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের অতিরিক্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আনোয়ার হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। তারা উৎপাদন কার্যক্রম, মেশিনারিজের অবস্থা এবং প্লান্টের সার্বিক প্রস্তুতি পর্যবেক্ষণ করেন।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক মো. আশরাফ উদ্দিন জানান, বন্যার পানিতে প্লান্টটি তলিয়ে যাওয়ায় মেশিনারিজের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল। ক্ষতিগ্রস্ত যন্ত্রপাতির মেরামত এবং পরবর্তী সময়ে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম সম্পন্ন করতে সময় লেগেছে। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শেষ করার পর এখন উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান হাবিবও প্লান্টটি পুনরায় চালু হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, প্রায় এক বছর বন্ধ থাকার পর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় মেরামতকাজ সম্পন্ন করে প্লান্টটি আবার চালু করেছে। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী সপ্তাহে ছয় দিন নিয়মিতভাবে স্লিপার উৎপাদন করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর ছাতকের কংক্রিট স্লিপার প্লান্টের উৎপাদন পুনরায় শুরু হওয়াকে তাই শুধু একটি কারখানা সচলের ঘটনা হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। রেলপথের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, স্লিপারের সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং সরকারি উৎপাদন সক্ষমতা কাজে লাগানোর ক্ষেত্রেও এর গুরুত্ব রয়েছে। তবে অতীতের অভিজ্ঞতায় যান্ত্রিক ত্রুটি ও কাঁচামাল সংকটের কারণে উৎপাদন বারবার বন্ধ হওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এবার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নিশ্চিত করাই হবে বড় বিষয়।
প্লান্টটি নিয়মিত সচল রাখতে হলে মেশিনারিজের রক্ষণাবেক্ষণ, প্রয়োজনীয় কাঁচামালের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, দক্ষ জনবল এবং কারিগরি তদারকি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এসব বিষয় সমন্বিতভাবে নিশ্চিত করা গেলে নির্ধারিত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পাশাপাশি ছাতকের এই ঐতিহ্যবাহী সরকারি প্লান্টটি ভবিষ্যতে আরও কার্যকরভাবে রেলওয়ের প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম হবে।
প্রায় এক বছর অচল থাকার পর আবারও যন্ত্রের শব্দে মুখর হয়ে উঠেছে ছাতকের কংক্রিট স্লিপার প্লান্ট। এখন সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, এবার যেন উৎপাদন সাময়িকভাবে চালু হয়ে আবার বন্ধ না হয়ে যায়। বরং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে উৎপাদন ধারাবাহিকতা বজায় রেখে দেশের রেল অবকাঠামো উন্নয়নে প্লান্টটি দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।


