প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শেখ মুজিবুর রহমান হলের প্রধান ফটক থেকে ‘শহীদ ওসমান হাদি হল’ লেখা মুছে ফেলার ঘটনাকে ঘিরে ক্যাম্পাসে নতুন করে আলোচনা ও প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। নামটি মুছে ফেলার কাজ শুরু হওয়ার পর শিক্ষার্থীদের একাংশ প্রতিবাদ জানালেও হল কর্তৃপক্ষ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বক্তব্যে বিষয়টি কোনো নতুন নামকরণের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপিত হয়নি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক নথি ও অনুমোদিত নামের ক্ষেত্রে হলটির নাম এখনো ‘শেখ মুজিবুর রহমান হল’ই রয়েছে।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর বুধবার দুপুরে হলটির প্রধান ফটকে ‘শহীদ ওসমান হাদি হল’ লেখা অংশ মুছে ফেলার কাজ শুরু হয়। ঘটনাটি সামনে আসার পর শিক্ষার্থীদের একটি অংশ সেখানে প্রতিবাদ জানায়। বিষয়টি দ্রুত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদের নেতাদের মধ্যেও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। পরবর্তী সময়ে হলের ফটকের নাম নিয়ে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, সিন্ডিকেট ও সিনেটের ভূমিকা এবং শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়টি আবারও আলোচনার কেন্দ্রে আসে।
প্রশাসনের বক্তব্য অনুযায়ী, ‘শহীদ ওসমান হাদি হল’ নামটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত নাম হিসেবে কার্যকর হয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী জানিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশেষ সিনেট অধিবেশনে আগের নাম পরিবর্তনের কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। ফলে হলটির আগের নামের দিকে ফিরে যাওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাঁর বক্তব্যের এই অবস্থান উঠে এসেছে।
অন্যদিকে, হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামানের বক্তব্য অনুযায়ী, ‘শহীদ ওসমান হাদি হল’ লেখা মুছে ফেলার জন্য হল কর্তৃপক্ষ আলাদাভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। তাঁর ভাষ্য, হলের দেয়াল ও বিভিন্ন গ্রাফিতি পরিষ্কার করার কাজ চলছিল। সেই সময় শ্রমিক বা অন্য কেউ নামটি মুছে ফেলেছে কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করে বলা সম্ভব ছিল না। ফলে ঘটনাটির সঙ্গে কোনো নির্দিষ্ট প্রশাসনিক নির্দেশনা জড়িত ছিল কি না, তা নিয়েও তখন প্রশ্ন তৈরি হয়।
তবে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নামটি সরিয়ে আগের ‘শেখ মুজিবুর রহমান হল’ নামফলক পুনরায় স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক অবস্থানও মূলত এই বিষয়টির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ—কারণ নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত না হওয়ায় আনুষ্ঠানিক নাম অপরিবর্তিত রয়েছে।
‘শহীদ ওসমান হাদি হল’ নামটি কীভাবে ফটকে এসেছিল, তার পেছনেও রয়েছে কয়েক মাসের ঘটনাপ্রবাহ। ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শরীফ ওসমান হাদির মৃত্যুর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি অংশ শেখ মুজিবুর রহমান হলের নাম পরিবর্তনের দাবি তোলে। একপর্যায়ে ২০ ডিসেম্বর রাতে হলের প্রধান ফটকের পুরোনো নাম মুছে সেখানে ‘শহীদ ওসমান হাদি হল’ লেখা হয়। নাম পরিবর্তনের ওই উদ্যোগটি শিক্ষার্থীদের একাংশের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছিল; তখনও বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি।
এরপর ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় শেখ মুজিবুর রহমান হলের নাম পরিবর্তন করে ‘শহীদ ওসমান হাদি হল’ করার সুপারিশ করা হয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। একই সময়ে আরও কয়েকটি স্থাপনার নাম পরিবর্তনের বিষয়ও আলোচনায় আসে। তবে এসব সুপারিশ চূড়ান্ত অনুমোদনের পর্যায়ে গিয়ে কার্যকর হয়নি। পরবর্তী সময়ে বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় আরও বিবেচনার জন্য পাঠানোর কথা জানানো হয়।
এই প্রশাসনিক প্রক্রিয়াই সাম্প্রতিক ঘটনাটির মূল প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে। একদিকে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ ওসমান হাদির স্মরণে হলটির নাম পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছিল। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদিত নাম পরিবর্তনের জন্য নির্ধারিত প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। ফলে ফটকে শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে নতুন নাম লেখা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক নথিতে নাম অপরিবর্তিত থাকার মধ্যে একটি পার্থক্য তৈরি হয়েছিল।
নাম মুছে ফেলার পর বুধবার রাতে হল ফটকের সামনে শিক্ষার্থীদের তাৎক্ষণিক বিক্ষোভও হয়। ডাকসুর সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ এবং হল সংসদের সাধারণ সম্পাদক আহমেদ আল সাবাহর আহ্বানে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ সেখানে জড়ো হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে ডাকসুর পক্ষ থেকেও বিষয়টি নিয়ে আপত্তি জানানো হয়।
ডাকসুর সহসভাপতি আবু সাদিক কায়েম এ ঘটনাকে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হিসেবে উল্লেখ করে প্রশাসনের সমালোচনা করেন। তাঁর বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ও ছাত্ররাজনীতির একটি অংশের ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক অভিযোগও উঠে আসে। তবে এসব বক্তব্য সংশ্লিষ্ট পক্ষের রাজনৈতিক অবস্থান ও প্রতিক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে; বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে এগুলোকে এক করে দেখার সুযোগ নেই।
এদিকে হলের নাম পরিবর্তনের বিষয়টি শুধু একটি নামফলক ঘিরে নয়, বরং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপনার নামকরণ ও পরিবর্তনের প্রশাসনিক ক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট, সিনেট ও প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব কীভাবে বিবেচিত হয়, সেই প্রক্রিয়াও এ ঘটনায় সামনে এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো স্থাপনার নাম পরিবর্তন কেবল শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে ফটকে নতুন নাম লেখার মাধ্যমে চূড়ান্ত হয় না; এর জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।
সাম্প্রতিক ঘটনাটি তাই শিক্ষার্থীদের আবেগ, স্মৃতির রাজনীতি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক বিধিব্যবস্থার একটি জটিল সংযোগকে সামনে এনেছে। ওসমান হাদির মৃত্যুর পর তাঁর স্মরণে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ যে নামটি ব্যবহার শুরু করেছিল, সেটি কয়েক মাস ধরে হলের প্রধান ফটকে দৃশ্যমান ছিল। এখন সেই নাম মুছে পুরোনো নাম ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
প্রশাসনের বক্তব্যে আপাতত যে বিষয়টি স্পষ্ট, তা হলো ‘শহীদ ওসমান হাদি হল’ নামটি বিশ্ববিদ্যালয়ের চূড়ান্ত অনুমোদিত নাম হিসেবে কার্যকর হয়নি। অন্যদিকে, শিক্ষার্থীদের একটি অংশ মনে করছে, নাম পরিবর্তনের দাবি ও এ নিয়ে আগে নেওয়া উদ্যোগকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। ফলে সামনে বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারণী কাঠামোয় কীভাবে নিষ্পত্তি হয়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
হলের প্রধান ফটকে নামফলকের পরিবর্তনকে ঘিরে তৈরি হওয়া এই পরিস্থিতি একই সঙ্গে দেখিয়ে দিয়েছে, একটি নাম শুধু একটি স্থাপনার পরিচয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে পারে ইতিহাস, রাজনৈতিক স্মৃতি, শিক্ষার্থীদের আবেগ এবং একটি প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া। সেই কারণেই বিষয়টি নিয়ে দ্রুত কোনো পক্ষের অবস্থানকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে না দেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে নজর রাখার প্রয়োজন রয়েছে।


