প্রকাশ: ৫ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলা ও তাঁর ব্যবহৃত গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। রোববার (৪ অক্টোবর) সন্ধ্যায় ছেঁউড়িয়ায় লালন শাহের আখড়াবাড়ি এলাকায় এ ঘটনা ঘটে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা গেছে। ঘটনার পর এনসিপির নেতারা হামলার জন্য ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের দায়ী করলেও কুষ্টিয়া জেলা ছাত্রদল অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
ঘটনার পর এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, একজন নেতাকে কতটা ভয় পেলে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা এমন আচরণ করতে পারে। একই সঙ্গে হামলাকারীদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
নাহিদ ইসলামের বক্তব্যের পাশাপাশি ঘটনার প্রত্যক্ষতা ও দায় নির্ধারণের বিষয়টি এখন তদন্তসাপেক্ষ। কারণ এনসিপির পক্ষ থেকে ছাত্রদলের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হলেও ছাত্রদলের স্থানীয় নেতৃত্ব জানিয়েছে, সংগঠনটি এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত নয়। ফলে হামলার প্রকৃত কারণ এবং কারা এতে জড়িত ছিলেন, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়াই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোববার ব্যক্তিগত সফরে কুষ্টিয়ায় যান নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। দিনের শুরুতে তিনি কুমারখালীর শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়ি পরিদর্শন করেন। পরে সন্ধ্যায় ছেঁউড়িয়ায় লালন শাহের আখড়াবাড়িতে যান। সেখানে মাজার পরিদর্শনের পাশাপাশি স্থানীয় শিল্পীদের পরিবেশনা উপভোগ করেন এবং ফেসবুকে লাইভ করেন বলে এনসিপি সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এরপর আখড়াবাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় তাঁকে লক্ষ্য করে ডিম ছোড়া এবং একদল লোকের ধাওয়া করার অভিযোগ ওঠে। নাসীরুদ্দীনের সঙ্গে থাকা নেতাকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, একপর্যায়ে কয়েকজন যুবক সেখানে জড়ো হয়ে তাঁকে গালাগাল করেন এবং মারধরের জন্য এগিয়ে আসেন। তাঁকে ঘিরে নিরাপত্তা দেওয়ার চেষ্টা করেন সঙ্গে থাকা নেতাকর্মীরা। পরে তাঁর গাড়িতে ইট নিক্ষেপ করে গাড়ির কাচ ভাঙচুর করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
ঘটনার সময় নাসীরুদ্দীনের সঙ্গে থাকা এনসিপির নেতারা কয়েকজন আহত হয়েছেন বলেও দাবি করেছেন। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘটনার পর কিছু সময় তিনি আখড়াবাড়ি এলাকায় অবস্থান করেন এবং পরে পুলিশ গিয়ে তাঁকে নিরাপদে সরিয়ে নেয়। তবে ঘটনার বিভিন্ন দিক নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকে বিস্তারিত তদন্ত-ফল প্রকাশিত হয়নি।
ঘটনার বিষয়ে কুষ্টিয়া জেলা এনসিপির পক্ষ থেকে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ তোলা হয়েছে। এনসিপির স্থানীয় এক নেতা দাবি করেন, ছাত্রদলের নেতাকর্মীরাই হামলা চালিয়েছে এবং এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই ধরনের অভিযোগ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টেও উঠে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হয়নি।
অন্যদিকে কুষ্টিয়া জেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মোজাক্কির রহমান রাব্বী হামলার অভিযোগের সঙ্গে সংগঠনের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলা হয়ে থাকলে তা নিন্দনীয় এবং ছাত্রদল মব বা সংঘবদ্ধ হামলার রাজনীতি সমর্থন করে না। তবে সংগঠনের কোনো নেতা-কর্মী ব্যক্তিগতভাবে জড়িত থাকলে তার দায় তাকেই নিতে হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন।
হামলার ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ কয়েকটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। সেগুলোর কোনো কোনোটিতে একদল মানুষকে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও তাঁর সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের দিকে এগিয়ে যেতে দেখা যায়। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর প্রেক্ষাপট, ধারণের সময় এবং ভিডিওতে থাকা ব্যক্তিদের পরিচয় স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে এসব ভিডিওকে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা না করে তদন্তের অংশ হিসেবে যাচাই করা প্রয়োজন।
ঘটনার পর নিজের ফেসবুক পেজে দেওয়া পোস্টে নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার গঠনের পর নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর এটি পঞ্চম হামলার ঘটনা। তিনি বলেন, ভয়ভীতি বা দমন-পীড়ন চালিয়ে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীসহ তাঁদের রাজনৈতিক কণ্ঠ স্তব্ধ করা যাবে না। একই সঙ্গে তিনি হামলাকারীদের দ্রুত শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান।
নাহিদের এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ঘটনাটি কেবল একটি স্থানীয় হামলার অভিযোগে সীমাবদ্ধ থাকেনি; রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগের বিষয়েও পরিণত হয়েছে। এনসিপির নেতারা ঘটনাটিকে রাজনৈতিক সহিংসতা হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে ছাত্রদলের স্থানীয় নেতৃত্ব বলছে, সংগঠন হিসেবে তারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত নয়। এই দুই বক্তব্যের মধ্যে প্রকৃত ঘটনা নির্ধারণের দায়িত্ব এখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তের ওপরই বর্তায়।
এ ঘটনায় পুলিশের ভূমিকাও আলোচনায় এসেছে। কুমারখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী লালন শাহের মাজারে গিয়েছিলেন এবং সেখানে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে বলে পুলিশ জানতে পারে। পরে তাঁকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। অন্য একটি প্রতিবেদনে কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারও ঘটনার কথা জানান এবং বলেন, ঘটনার পর পুলিশ সেখানে যায়।
রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও কোনো রাজনৈতিক নেতা বা নাগরিকের ওপর হামলা, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা সম্পদ ভাঙচুরের অভিযোগ উঠলে সেটি তদন্তের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হওয়া জরুরি। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর দ্রুত নানা ধরনের দাবি ও পাল্টা দাবি তৈরি হয়। এতে যাচাই না করা তথ্যও জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। তাই প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, ভিডিও ফুটেজ, ঘটনাস্থলের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পর্যালোচনা করে প্রকৃত ঘটনা নির্ধারণ প্রয়োজন।
কুষ্টিয়ার লালন আখড়াবাড়ির মতো একটি সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক স্থানে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হওয়ার বিষয়টিও আলাদা গুরুত্ব বহন করে। এমন স্থানে সাধারণ দর্শনার্থী ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে রাজনৈতিক কর্মসূচি বা ব্যক্তিগত সফরে থাকা কোনো নেতার নিরাপত্তা নিয়েও সংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলার অভিযোগ এবং এ নিয়ে নাহিদ ইসলামের বক্তব্য ইতোমধ্যে রাজনৈতিক আলোচনায় জায়গা করে নিয়েছে। তবে অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিডিওর বাইরে প্রকৃত ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র পেতে নিরপেক্ষ তদন্তের বিকল্প নেই। কারা হামলায় জড়িত ছিলেন, হামলার পেছনে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল কি না এবং অভিযোগের ভিত্তি কতটা সত্য—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তেই স্পষ্ট হওয়ার কথা।
এখন সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা, ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের শনাক্ত করা হবে এবং সত্যতা প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক মতপার্থক্য যেন সংঘাত বা সহিংসতায় রূপ না নেয়, সে বিষয়ে সব পক্ষের দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন। কুষ্টিয়ার এই ঘটনা সেই প্রয়োজনীয়তাকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে।


