প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
নেপালে আকস্মিক ভয়াবহ বন্যার পর পরিস্থিতি ক্রমেই মানবিক বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে। প্রবল স্রোতে ভেসে গেছে ঘরবাড়ি, সড়ক ও স্থাপনা। এর সঙ্গে বাড়ছে প্রাণহানির সংখ্যাও। অনেক মরদেহ বন্যার পানিতে ভেসে দূরের বিভিন্ন জেলায় চলে যাওয়ায় নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে যে স্থানীয় হাসপাতালগুলোর মর্গে মরদেহ রাখার আর পর্যাপ্ত জায়গা নেই। ফলে উদ্ধার করা মরদেহ সংরক্ষণের জন্য আলাদা সরকারি ভবন ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
বুধবারের আকস্মিক বন্যার পর নেপালের বিভিন্ন এলাকায় উদ্ধার অভিযান চালিয়ে একের পর এক মরদেহ উদ্ধার করা হচ্ছে। দেশটির পুলিশের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ভয়াবহ এই বন্যায় এখন পর্যন্ত ৫৪৭ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বন্যার পানির তীব্র স্রোতে অনেক মানুষ নিখোঁজ হয়েছেন। তাদের মধ্যে কেউ বন্যার পানিতে ভেসে কোথায় চলে গেছেন, তা শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। আবার উদ্ধার করা অনেক মরদেহের অবস্থাও ভালো নেই। ফলে মরদেহ শনাক্তকরণ, সংরক্ষণ এবং স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের পুরো প্রক্রিয়া কর্তৃপক্ষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, কাঠমান্ডু থেকে প্রায় ১৮৬ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত চিতওয়ান এলাকায় এখন পর্যন্ত ২২১টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। একইভাবে রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দক্ষিণে নওয়ালপরাসি পূর্ব এলাকায় ১৩৪টি মরদেহ পাওয়া গেছে। দুর্গম ও পানিতে প্লাবিত বিভিন্ন এলাকায় উদ্ধার কার্যক্রম চলতে থাকায় আরও মরদেহ পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চিতওয়ানের প্রধান জেলা কর্মকর্তা গণেশ আরিয়াল পরিস্থিতির ভয়াবহতার কথা জানিয়েছেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে তিনি বলেছেন, উদ্ধার করা অনেক মরদেহের অবস্থা ভালো নেই। দীর্ঘ সময় পানিতে থাকার কারণে মরদেহগুলো সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এতে পরিচয় শনাক্ত করার প্রক্রিয়াও জটিল হয়ে উঠছে।
সাধারণত বড় ধরনের দুর্যোগের পর উদ্ধার করা মরদেহ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়। সেখানে পরিচয় শনাক্তকরণ, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। কিন্তু নেপালের বর্তমান পরিস্থিতিতে এত বিপুল সংখ্যক মরদেহ একসঙ্গে হাসপাতালে আসায় প্রচলিত মর্গগুলোর সক্ষমতা দ্রুত শেষ হয়ে গেছে। ফলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে।
চিতওয়ানের স্থানীয় হাসপাতালগুলোর মর্গে ইতোমধ্যে আর মরদেহ রাখার জায়গা নেই। এ কারণে উদ্ধার করা মরদেহগুলো সাময়িকভাবে রাখার জন্য একটি সরকারি ভবন নির্ধারণ করেছে কর্তৃপক্ষ। সেখানে মরদেহগুলো সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি পরিচয় শনাক্ত করার প্রক্রিয়া চালানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় নিখোঁজ ব্যক্তিদের সঙ্গে উদ্ধার হওয়া মরদেহের মিল খুঁজে বের করা। বন্যায় যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অনেক পরিবারের পক্ষেও দ্রুত ঘটনাস্থল বা হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। একই সঙ্গে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় মরদেহ ভেসে যাওয়ায় নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধান এবং পরিচয় শনাক্তকরণ আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
বন্যার ভয়াবহতায় অনেক এলাকা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। পানির স্রোত ও ধ্বংসাবশেষের কারণে উদ্ধারকারী দলকে বিভিন্ন স্থানে পৌঁছাতে বেগ পেতে হচ্ছে। কোথাও সড়ক যোগাযোগ বন্ধ, কোথাও আবার নদী ও জলাধারের পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এসব কারণে উদ্ধারকাজ সময়সাপেক্ষ হয়ে উঠেছে।
মরদেহ ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি জীবিতদের উদ্ধারের কাজও অব্যাহত রয়েছে। বন্যাকবলিত এলাকার মানুষ নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করছেন। অনেক পরিবার তাদের স্বজনদের খোঁজে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছুটছেন। কেউ হাসপাতাল, কেউ আশ্রয়কেন্দ্র, আবার কেউ উদ্ধারকেন্দ্রে গিয়ে নিখোঁজ স্বজনের কোনো খবর পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।
নেপালের মতো পাহাড়ি দেশে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি বিভিন্ন অঞ্চলে রয়েছে। অতিবৃষ্টি হলে পাহাড়ি নদী ও জলধারায় দ্রুত পানি বাড়তে পারে। এর সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থা ও বসতিতে পানি ঢুকে পড়লে অল্প সময়ের মধ্যেই বড় ধরনের বিপর্যয় তৈরি হতে পারে। এবারের বন্যায়ও সেই ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, প্রাণহানির পাশাপাশি নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা এবং মরদেহ শনাক্তকরণের জটিলতা পরিস্থিতিকে আরও মানবিক সংকটে পরিণত করছে। কোনো পরিবার যখন জানতেই পারছে না তাদের প্রিয়জন বেঁচে আছেন কি না, তখন অপেক্ষার প্রতিটি মুহূর্ত তাদের জন্য অসহনীয় হয়ে উঠছে। আবার মরদেহ উদ্ধার হলেও পরিচয় নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত স্বজনদের অনিশ্চয়তা কাটছে না।
কর্তৃপক্ষের জন্য তাই উদ্ধার অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি মরদেহের যথাযথ সংরক্ষণ, পরিচয় শনাক্তকরণ এবং স্বজনদের কাছে হস্তান্তর এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মর্গের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিকল্প ভবন ব্যবহারের সিদ্ধান্ত সেই প্রয়োজন থেকেই নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের তথ্য থেকে বোঝা যাচ্ছে।
এদিকে পুলিশের হিসাবে মৃতের সংখ্যা ৫৪৭-এ পৌঁছানোয় দুর্যোগের ব্যাপকতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। উদ্ধার অভিযান আরও বিস্তৃত হলে প্রাণহানির সংখ্যা বাড়তে পারে। বন্যার পানি কমে যাওয়ার পর ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ চিত্র আরও স্পষ্ট হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নেপালের এই ভয়াবহ বন্যা শুধু অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি বা প্রাণহানির ঘটনা নয়; এটি বহু পরিবারের জীবনে নেমে আসা এক গভীর মানবিক বিপর্যয়। কেউ হারিয়েছেন সন্তান, কেউ বাবা-মা, কেউ জীবনসঙ্গী কিংবা আপনজন। আর উদ্ধারকর্মীদের সামনে এখন একদিকে জীবিতদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া, অন্যদিকে পানির স্রোতে ভেসে যাওয়া মরদেহ উদ্ধার ও তাদের পরিচয় নিশ্চিত করার কঠিন দায়িত্ব।
বন্যার পানি হয়তো একসময় কমে যাবে, রাস্তা আবার সচল হবে, মানুষের জীবনও ধীরে ধীরে স্বাভাবিকতার দিকে ফিরবে। কিন্তু নিখোঁজ স্বজনের অপেক্ষা কিংবা প্রিয় মানুষকে হারানোর শোক বহু পরিবারের জীবনে দীর্ঘদিন থেকে যাবে। এই মুহূর্তে নেপালের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন দ্রুত উদ্ধারকাজ, নিখোঁজদের সন্ধান এবং মরদেহগুলোর মর্যাদাপূর্ণ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা।

