প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে লোকালয়ের কাছ থেকে বিরল প্রজাতির সাইবোল্ড’স ওয়াটার স্নেক উদ্ধার করা হয়েছে। বুধবার রাতে উপজেলার সিন্দুরখান ইউনিয়নের কুঞ্জবন এলাকায় একটি বাড়ির পাশের জমিতে সাপটির দেখা মেলে। অপরিচিত ও দেখতে ভিন্ন হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে প্রথমে আতঙ্ক তৈরি হলেও পরে বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায়, এটি বিরল প্রজাতির সাইবোল্ড’স ওয়াটার স্নেক। সাপটি বিষহীন জলচর প্রজাতির বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বুধবার রাতে কুঞ্জবন গ্রামের একটি বাড়ির পাশের জমিতে ছোট আকারের একটি সাপ দেখতে পান কয়েকজন। সাধারণত এলাকায় দেখা যায় এমন সাপের সঙ্গে এর চেহারার মিল না থাকায় তারা কিছুটা ভয় পেয়ে যান। বিষয়টি দ্রুত আশপাশের লোকজনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। পরে স্থানীয় শিক্ষক একরামুল কবীরকে বিষয়টি জানানো হলে তিনি বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
খবর পেয়ে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে সাপটিকে নিরাপদে উদ্ধার করেন। উদ্ধারকাজের সময় সাপটির যাতে কোনো ধরনের আঘাত না লাগে, সেদিকে বিশেষভাবে নজর রাখা হয়। পরে সাপটির পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।
বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজল জানান, প্রথমে সাপটির পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। কারণ এ ধরনের সাপ সচরাচর লোকালয়ে দেখা যায় না। পরে সাপ বিশেষজ্ঞ শাহরিয়ার সিজার রহমানের কাছে ছবি পাঠানো হলে তিনি এটি সাইবোল্ড’স ওয়াটার স্নেক বলে শনাক্ত করেন। পরবর্তীতে সাপটিকে অক্ষত অবস্থায় বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, সাইবোল্ড’স ওয়াটার স্নেক দক্ষিণ এশিয়ার জলাভূমিনির্ভর একটি অপেক্ষাকৃত দুর্লভ সাপ। বৈজ্ঞানিক শ্রেণিবিন্যাসে প্রজাতিটির নাম Ferania sieboldii। বিভিন্ন গবেষণামূলক তথ্যেও বাংলাদেশে এ প্রজাতির উপস্থিতির উল্লেখ রয়েছে। জলাশয়ের কিনারা, কাদামাটিযুক্ত এলাকা, খাল-বিল এবং জলজ উদ্ভিদসমৃদ্ধ পরিবেশ এদের উপযোগী আবাসস্থল হিসেবে বিবেচিত হয়।
শাহরিয়ার সিজার রহমানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সাপটি জলচর এবং সাধারণত মাছ ও উভচর প্রাণী, বিশেষ করে ব্যাঙ খেয়ে জীবনধারণ করে। এর শরীর তুলনামূলকভাবে মোটা এবং পিঠে কালচে বা ধূসর-বাদামি ধরনের ছোপ ছোপ দাগ দেখা যায়। পানির কাছাকাছি থাকা এবং জলজ পরিবেশে চলাফেরার কারণে সাধারণ মানুষের চোখে এটি অন্য অনেক সাপের তুলনায় আলাদা বলে মনে হতে পারে।
বাংলাদেশে সাপ দেখলেই ভয় পাওয়া কিংবা সেটিকে মেরে ফেলার প্রবণতা এখনও অনেক এলাকায় রয়েছে। বিশেষ করে কোনো অপরিচিত সাপ দেখা গেলে সেটিকে বিষধর ধরে নেওয়ার প্রবণতাও দেখা যায়। কুঞ্জবনের এই ঘটনায় অবশ্য স্থানীয়রা সাপটিকে হত্যা না করে বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের জানানোর সুযোগ পেয়েছেন। ফলে একটি বিরল বন্যপ্রাণী নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কোনো সাপ লোকালয়ে ঢুকে পড়লে সেটিকে উত্তেজিত করা বা ধরার চেষ্টা না করে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা উচিত। কারণ প্রজাতি সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়ে সাপের কাছে যাওয়া যেমন মানুষের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, তেমনি আতঙ্কে সাপটিকে আঘাত করলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাণীও মারা যেতে পারে। প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী দল কিংবা বন বিভাগের সহায়তা নেওয়াই এ ধরনের পরিস্থিতিতে নিরাপদ পদ্ধতি।
শ্রীমঙ্গলের কুঞ্জবন এলাকায় এই বিরল সাপের সন্ধান পাওয়ার ঘটনা স্থানীয় জীববৈচিত্র্য নিয়েও নতুন করে আগ্রহ তৈরি করেছে। চা-বাগান, বনাঞ্চল, ছড়া, জলাশয় ও বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক পরিবেশের কারণে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই জীববৈচিত্র্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে পরিচিত। এসব এলাকায় অনেক প্রাণীর উপস্থিতি মানুষের নজরের বাইরে থেকে যায়। কোনো কোনো প্রজাতি দীর্ঘ সময় পর মানুষের সামনে আসে বা নির্দিষ্ট পরিবেশে সীমিত পরিসরে টিকে থাকে।
সাইবোল্ড’স ওয়াটার স্নেকের ক্ষেত্রেও এর আবাসস্থল ও বিস্তৃতি নিয়ে আরও পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। একটি এলাকায় এমন সাপের উপস্থিতি শনাক্ত হওয়া মানেই সেখানে এদের বড় কোনো স্থায়ী আবাস রয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। বরং কোথা থেকে সাপটি এসেছে, আশপাশে উপযুক্ত জলাভূমি রয়েছে কি না এবং একই ধরনের আরও কোনো সাপ সেখানে পাওয়া যায় কি না, এসব বিষয় পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের মৌলভীবাজার রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. কাজী নাজমুল হক জানান, উদ্ধার করা সাপটির প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হবে। এরপর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সাপটির নিরাপত্তা এবং উপযুক্ত পরিবেশে রাখার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে স্থানীয় মানুষের ভূমিকা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, কুঞ্জবনের ঘটনাটি তারও একটি উদাহরণ। অপরিচিত প্রাণী দেখে আতঙ্কিত হয়ে সেটিকে মেরে ফেলার পরিবর্তে স্থানীয় শিক্ষক ও বাসিন্দারা সংশ্লিষ্টদের খবর দিয়েছেন। এর ফলে শুধু একটি প্রাণের নিরাপত্তাই নিশ্চিত হয়নি, বরং শ্রীমঙ্গলের জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে নতুন একটি তথ্যও সামনে এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণীর নিজস্ব ভূমিকা রয়েছে। জলজ পরিবেশে বসবাসকারী সাপগুলো খাদ্যশৃঙ্খলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মাছ, ব্যাঙসহ বিভিন্ন প্রাণীর ওপর তাদের খাদ্যনির্ভরতা জলজ প্রতিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই কোনো প্রাণী মানুষের কাছে অপরিচিত বা ভীতিকর মনে হলেই সেটিকে ক্ষতিকর হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
শ্রীমঙ্গলে উদ্ধার হওয়া সাইবোল্ড’স ওয়াটার স্নেকের ঘটনাটি তাই শুধু একটি বিরল সাপ উদ্ধারের খবর নয়; এটি একই সঙ্গে মানুষের সঙ্গে বন্যপ্রাণীর সহাবস্থান এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথাও মনে করিয়ে দিয়েছে। আতঙ্কের মুহূর্তে প্রাণীটিকে হত্যা না করে নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হওয়ায় স্থানীয়দের সচেতনতার বিষয়টিও ইতিবাচকভাবে সামনে এসেছে। এখন সাপটির স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও পরবর্তী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তার নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রধান দায়িত্ব।


