প্রকাশ:২৮ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
মৌলভীবাজারের বড়লেখা সীমান্তে ভারতীয় একটি চোরাকারবারি দলের সঙ্গে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্যদের গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করেছে বিজিবি। এ সময় আহত অবস্থায় এক ভারতীয় নাগরিককে আটক করা হয়েছে। তাঁর কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, দুই রাউন্ড গুলি ও ৫০০ পিস ইয়াবা উদ্ধারের কথা জানিয়েছে সীমান্তরক্ষী বাহিনী।
বৃহস্পতিবার রাতে বড়লেখা সীমান্তের কুমারশাইল এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। আটক ব্যক্তির নাম বালাই দাস বলে জানিয়েছে বিজিবি। বাহিনীর দাবি, তিনি সীমান্তকেন্দ্রিক একটি চোরাচালান চক্রের সঙ্গে জড়িত। তবে তাঁর বিরুদ্ধে আনা এসব অভিযোগের বিষয়ে আইনগত প্রক্রিয়ায় বিস্তারিত তথ্য সামনে আসবে।
বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার রাতে কুমারশাইল সীমান্ত এলাকায় ভারতীয় একটি চোরাকারবারি দল দিয়ে বাংলাদেশে মাদক ও অবৈধ অস্ত্র প্রবেশ করানোর চেষ্টা করা হতে পারে—এমন গোপন তথ্য পায় সীমান্তরক্ষী বাহিনী। তথ্যের ভিত্তিতে বিয়ানীবাজার ব্যাটালিয়নের একটি বিশেষ টহল দল ওই এলাকায় অবস্থান নেয়। রাত আনুমানিক ১০টার দিকে সন্দেহভাজন কয়েকজন ব্যক্তির গতিবিধি নজরে আসে টহল দলের।
বিজিবির ভাষ্য অনুযায়ী, সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের থামার জন্য চ্যালেঞ্জ করা হলে তারা সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এবং আত্মরক্ষার্থে বিজিবি সদস্যরাও পাল্টা গুলি চালান। এতে সীমান্ত এলাকায় কিছু সময়ের জন্য উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
গোলাগুলির একপর্যায়ে দলের কয়েকজন সদস্য সেখান থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন বলে জানিয়েছে বিজিবি। পরে আহত অবস্থায় একজনকে আটক করা হয়। আটক ব্যক্তি ভারতীয় নাগরিক এবং তাঁর নাম বালাই দাস বলে প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করা হয়েছে।
অভিযানের সময় তাঁর কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, দুই রাউন্ড গুলি এবং ৫০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে বলে বিজিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। উদ্ধার করা অস্ত্র ও মাদক কোথা থেকে এসেছে এবং এগুলো কোথায় নেওয়া হচ্ছিল, তা নিশ্চিত হতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তদন্ত করছে।
বিজিবি ৫২ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আতাউর রহমান সুজন শুক্রবার সকালে সাংবাদিকদের জানান, সীমান্ত এলাকায় মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের প্রবেশ ঠেকাতে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করা হয়। তাঁর দাবি, আটক ভারতীয় নাগরিক সীমান্তবর্তী চোরাচালান চক্রের সঙ্গে যুক্ত।
বিজিবি কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, উদ্ধার করা অস্ত্র ও মাদক বাংলাদেশে সরবরাহের উদ্দেশ্যে ভারত থেকে আনা হয়ে থাকতে পারে। তবে অস্ত্র ও ইয়াবার প্রকৃত উৎস, এর সঙ্গে কারা জড়িত এবং চক্রটির কার্যক্রমের পরিধি তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার বিষয় রয়েছে।
সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে দীর্ঘদিন ধরেই মাদক ও বিভিন্ন ধরনের পণ্য চোরাচালান ঠেকাতে বিজিবির অভিযান পরিচালিত হয়ে আসছে। ভৌগোলিক অবস্থান, সীমান্তের দুর্গম পথ এবং বিভিন্ন সময়ের প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতার কারণে কিছু এলাকায় নজরদারি ও টহল পরিচালনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। এসব সুযোগ কাজে লাগিয়ে চোরাচালানকারীরা সীমান্তপথ ব্যবহারের চেষ্টা করে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বিভিন্ন সময়ে জানিয়েছেন।
বড়লেখার কুমারশাইল এলাকাতেও এমন তৎপরতা ঠেকাতে বিজিবির নজরদারি রয়েছে বলে জানা গেছে। গোপন তথ্যের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার রাতের অভিযান তারই অংশ ছিল বলে জানিয়েছে বাহিনীটি।
ঘটনার পর সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে বলে বিজিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ঘটনার সঙ্গে আরও কেউ জড়িত কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
আটক বালাই দাসের কাছ থেকে উদ্ধার করা অস্ত্র ও মাদক তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এগুলোর বৈধতা, বহনের উদ্দেশ্য এবং বাংলাদেশে প্রবেশের সম্ভাব্য পথ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হবে। একই সঙ্গে আটক ব্যক্তির সঙ্গে সীমান্তের উভয় পাশে থাকা কোনো চক্রের যোগাযোগ ছিল কি না, সে বিষয়েও অনুসন্ধান চালানো হতে পারে।
সীমান্তে গোলাগুলির ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রাতের ঘটনায় আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। সীমান্তবর্তী জনপদে নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্ত দিয়ে মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের প্রবেশ শুধু আইনশৃঙ্খলার জন্য নয়, স্থানীয় সামাজিক নিরাপত্তার জন্যও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে। মাদক পাচারের সঙ্গে বিভিন্ন অপরাধচক্রের যোগাযোগ তৈরি হতে পারে এবং অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার স্থানীয় পর্যায়ে সহিংসতা বাড়ানোর আশঙ্কা তৈরি করে। ফলে সীমান্ত এলাকায় নিয়মিত নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ।
তবে সীমান্তে যেকোনো গোলাগুলির ঘটনা অত্যন্ত সংবেদনশীল। তাই ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি, গুলি বিনিময়ের কারণ, আহত হওয়ার ধরন এবং উদ্ধার হওয়া অস্ত্র ও মাদকের উৎস সম্পর্কে তদন্তের ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বর্তমানে বিজিবির পক্ষ থেকে দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই ঘটনার প্রাথমিক বিবরণ পাওয়া গেছে।
বিজিবি জানিয়েছে, পলাতক ব্যক্তিদের শনাক্ত ও আটক করতে অভিযান এবং গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। আটক ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। একই সঙ্গে উদ্ধার করা অস্ত্র ও মাদক কীভাবে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করা হয়েছিল, তা তদন্তের মাধ্যমে বের করার চেষ্টা করা হবে।
সীমান্তে এমন ঘটনা পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে নজরদারি আরও জোরদার করার পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদেরও সতর্ক থাকার প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ করে সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় সন্দেহজনক চলাচল বা চোরাচালানের তৎপরতা চোখে পড়লে তা দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপদ সীমান্ত নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের সহযোগিতাও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
কুমারশাইল সীমান্তের রাতের এই ঘটনায় একজনকে আহত অবস্থায় আটক এবং বিপুল পরিমাণ ইয়াবা ও অস্ত্র উদ্ধারের দাবি করেছে বিজিবি। এখন তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার পুরো চিত্র কতটা স্পষ্ট হয় এবং পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের শনাক্ত করা সম্ভব হয় কি না, সেটিই দেখার বিষয়। সীমান্তে মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের প্রবেশ বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেও নজর থাকবে।


