প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
কক্সবাজার শহরের একটি আবাসিক হোটেলের বারে বন্ধুদের মধ্যে কথা-কাটাকাটির জেরে সংঘর্ষ ও ছুরিকাঘাতের ঘটনায় দুই যুবকের মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে ঝাউতলা এলাকার রেনেসাঁ হোটেলের বারে নাজিবুল হক নামে এক যুবক ছুরিকাঘাতে নিহত হন। পরে তাঁর স্বজনদের মারধরে গুরুতর আহত হন ঘটনায় অভিযুক্ত সালমান মিয়া। পুলিশ তাঁকে আটক করে হাসপাতালে ভর্তি করলেও শুক্রবার সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁরও মৃত্যু হয়।
পুলিশ ও সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার রাতে নাজিবুল হক ও সালমান মিয়া আরও কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে রেনেসাঁ হোটেলের বারে গিয়েছিলেন। সেখানে বসে তাঁরা মদ পান করছিলেন। একপর্যায়ে কোনো একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে নাজিবুল ও সালমানের মধ্যে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে উঠলে তা শারীরিক সংঘর্ষে রূপ নেয়।
একপর্যায়ে সালমান মিয়া নাজিবুলকে ছুরিকাঘাত করেন বলে পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য। গুরুতর আহত অবস্থায় নাজিবুল ঘটনাস্থলেই মারা যান। খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর নুনিয়ারছড়া এলাকা থেকে তাঁর স্বজনেরা হোটেলটিতে ছুটে আসেন। সেখানে সালমানকে পেয়ে তাঁরা মারধর করেন এবং তাঁকে নুনিয়ারছড়া এলাকায় নিয়ে যান।
পরে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে সালমান মিয়াকে আটক করে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে প্রথমে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। রাতেই তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার সকালে তাঁর মৃত্যু হয়। অর্থাৎ কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে একই ঘটনার সঙ্গে জড়িত দুই যুবকেরই মৃত্যু হয়।
নিহত নাজিবুল হক ও সালমান মিয়ার বয়স ২৮ বছর বলে পুলিশের দেওয়া তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। নাজিবুল শহরের নুনিয়ারছড়া এলাকার এবং সালমান বিজিবি ক্যাম্প এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। পুলিশ ও হোটেল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁরা একে অপরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। ফলে বন্ধুত্বের সম্পর্ক থেকেই এমন ভয়াবহ পরিণতি কীভাবে ঘটল, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যেও নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অহিদুর রহমান জানান, বারে মদ পান করার সময় কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে নাজিবুল ছুরিকাঘাতে নিহত হন। পরে নাজিবুলের স্বজনদের মারধরে আহত সালমানকেও পুলিশ আটক করে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়েছে।
ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও সতর্ক অবস্থান নিয়েছে পুলিশ। আলামত সংগ্রহ ও তদন্তের স্বার্থে বারটি বন্ধ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে সেখানে নিরাপত্তাব্যবস্থা যথাযথ ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পুলিশের পক্ষ থেকে বারের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। বারে কর্মরত ব্যক্তিদের কাছ থেকেও তথ্য নেওয়া হচ্ছে। ঘটনার সঙ্গে আরও কেউ জড়িত ছিল কি না, তা শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
প্রাথমিকভাবে ঘটনাটি দুই বন্ধুর মধ্যে ব্যক্তিগত বিরোধ থেকে শুরু হয়েছে বলে জানা গেলেও সংঘর্ষের প্রকৃত কারণ এখনো স্পষ্ট নয়। তর্কাতর্কির সূত্রপাত কী নিয়ে হয়েছিল, সেখানে উপস্থিত অন্য ব্যক্তিদের ভূমিকা কী ছিল এবং ছুরিকাঘাতের আগে বা পরে ঠিক কী ঘটেছিল—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়ার কথা।
ঘটনাটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, অভিযুক্ত সালমানকে পুলিশ আটক করার আগেই তিনি নাজিবুলের স্বজনদের মারধরের শিকার হন। পরে পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁর মৃত্যু হওয়ায় ঘটনাটি এখন দ্বিমুখী মৃত্যুর ঘটনায় পরিণত হয়েছে। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার মতো কোনো ঘটনা ঘটেছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।
কক্সবাজার সদর থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ আলী জানিয়েছেন, নিহত সালমান মিয়া একটি কিশোর গ্যাংয়ের নেতৃত্বে ছিলেন বলে পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে ছিনতাইসহ একাধিক মামলা থাকার কথাও পুলিশ জানিয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সঙ্গে বর্তমান ঘটনার সম্পর্ক কী, তা তদন্তের মাধ্যমেই নির্ধারণ করা হবে।
এদিকে বারের ভেতরে সংঘর্ষের ঘটনায় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। একটি আবাসিক হোটেলের বারে কয়েকজন ব্যক্তি মদ পান করার সময় তর্কাতর্কি থেকে প্রাণঘাতী সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়লেন—এ অবস্থায় সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মী বা নিরাপত্তাকর্মীরা কী ভূমিকা পালন করেছিলেন, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। বিশেষ করে সংঘর্ষের সময় অস্ত্র বা ধারালো বস্তু কীভাবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হলো, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঘটনার পর রেনেসাঁ হোটেল ও আশপাশের এলাকায়ও চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। পর্যটননগরী হিসেবে কক্সবাজারে রাতের বিনোদনকেন্দ্র ও হোটেলভিত্তিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। একটি সামান্য কথাকাটাকাটি কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে প্রাণঘাতী সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে, এই ঘটনা তারই নির্মম উদাহরণ হয়ে সামনে এসেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, দুই যুবকের মরদেহের প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হচ্ছে। ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের শনাক্ত করতে সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ঘটনার প্রকৃত কারণ, ছুরিকাঘাতের পরিস্থিতি এবং পরে সালমানের ওপর হামলার ঘটনায় কারা জড়িত ছিল, সেসব বিষয়ও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
দুই তরুণের মৃত্যুতে তাঁদের পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। একটি রাতের তর্ক-বিতর্ক শেষ হয়েছে দুটি প্রাণহানির মধ্য দিয়ে। যে দুই যুবক কয়েক ঘণ্টা আগেও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছিলেন, তাঁদের একজনের মৃত্যু হয়েছে ছুরিকাঘাতে এবং অপরজনের মৃত্যু হয়েছে চিকিৎসাধীন অবস্থায়। ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দায় ও ঘটনার প্রতিটি ধাপ স্পষ্ট হওয়াই এখন পুলিশের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।


