প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট জেলা পরিষদের প্রশাসক আবুল কাহের চৌধুরী শামীম বলেছেন, গ্রামাঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন এবং শহরের মতো নাগরিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে সরকার বিভিন্ন পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। গ্রামের মানুষ যেন নিজ এলাকার মধ্যেই উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, অবকাঠামো, শিক্ষা, চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সেবা পান, সেই লক্ষ্যেই উন্নয়ন কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার গ্রাম ও শহরের সুযোগ-সুবিধার বৈষম্য কমিয়ে আনতে কাজ করছে। এর অংশ হিসেবে সিলেট বিভাগের রাস্তাঘাট ও অবকাঠামো উন্নয়নে ৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
বৃহস্পতিবার বিয়ানীবাজার উপজেলা অডিটোরিয়ামে সিলেট জেলা পরিষদের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সভায় উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের প্রধান, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা অংশ নেন।
আবুল কাহের চৌধুরী শামীম বলেন, উন্নয়ন শুধু শহরকেন্দ্রিক হলে একটি দেশের সামগ্রিক অগ্রগতি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করার পাশাপাশি তাঁদের মৌলিক নাগরিক সেবা পাওয়ার সুযোগ বাড়াতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে রাস্তাঘাট, সেতু, কালভার্ট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা এবং অন্যান্য অবকাঠামোর উন্নয়ন হলে গ্রামের মানুষকে ছোটখাটো প্রয়োজনেও শহরমুখী হতে হবে না।
তিনি আরও বলেন, জেলা পরিষদ সরকারের গ্রামীণ উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করবে। জেলার বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের প্রয়োজন ও সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ এবং বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও জনগণের মধ্যে সমন্বয় থাকলে প্রকল্পের সুফল দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বিয়ানীবাজারের স্থানীয় উন্নয়ন প্রসঙ্গে জেলা পরিষদ প্রশাসক বলেন, শুধু বড় প্রকল্প গ্রহণ করলেই উন্নয়ন নিশ্চিত হয় না; প্রকল্পের মানসম্মত বাস্তবায়ন এবং জনগণের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্য থাকাও জরুরি। এ কারণে জেলা পরিষদের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। কোন এলাকায় কী ধরনের উন্নয়ন প্রয়োজন, তা সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় মানুষের কাছ থেকে জানার মাধ্যমে অগ্রাধিকার নির্ধারণের ওপর জোর দেন তিনি।
সভায় বিয়ানীবাজার উপজেলার বিভিন্ন এলাকার যোগাযোগব্যবস্থা, অবকাঠামোগত প্রয়োজন, জনসেবার মান এবং জেলা পরিষদের চলমান ও প্রস্তাবিত প্রকল্প নিয়ে আলোচনা হয়। স্থানীয় পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে থাকা বিভিন্ন সমস্যার বিষয়ও তুলে ধরেন উপস্থিত ব্যক্তিরা। এসব সমস্যা পর্যায়ক্রমে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেন জেলা পরিষদ প্রশাসক।
মতবিনিময় সভায় সভাপতিত্ব করেন বিয়ানীবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে হাবিবা মজুমদার। অনুষ্ঠানে বিয়ানীবাজার থানার অফিসার ইনচার্জ আবু জাফর মো. ফায়জুল করিম, উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা এবং স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে জেলা পরিষদ প্রশাসক বিয়ানীবাজার ক্যান্সার অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতাল ফাউন্ডেশনে জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে একটি পোর্টেবল এক্স-রে মেশিন প্রদান করেন। এ সময় একটি সংবর্ধনা অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়। স্বাস্থ্যসেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে এ ধরনের সরঞ্জাম স্থানীয় মানুষের চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ বাড়াতে সহায়ক হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
পরে তিনি বিয়ানীবাজার পৌর শহরে জেলা পরিষদের মালিকানাধীন মার্কেট ও পুকুর পরিদর্শন করেন। পাশাপাশি বিয়ানীবাজার থানা এবং দুবাগ স্কুল অ্যান্ড কলেজও পরিদর্শন করেন তিনি। এসব পরিদর্শনের মাধ্যমে জেলা পরিষদের সম্পদ, স্থানীয় প্রতিষ্ঠান এবং উন্নয়ন-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে সরেজমিনে ধারণা নেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
অনুষ্ঠানে বিএনপি, জমিয়তসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে সিলেট জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি আব্দুল মান্নান, সহসভাপতি নজমুল হোসেন পুতুল, মহানগর বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মহবুব চৌধুরী, সিলেট জেলা জমিয়তের সভাপতি মুফতি মুজিবুর রহমান, বিয়ানীবাজার উপজেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট আহমেদ রেজা, পৌর বিএনপির সভাপতি মিজানুর রহমান রুমেল, মহানগর বিএনপি নেতা ফাত্তাহ বকসী, জেলা বিএনপি নেতা সিদ্দিক আহমেদসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ ছিলেন।
এ ছাড়া বিয়ানীবাজার ও গোলাপগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন বিএনপি, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের নেতারাও সভায় অংশ নেন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতাদের উপস্থিতিতে আয়োজিত এই মতবিনিময় সভায় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে আরও কার্যকর ও জনমুখী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সিলেটের গ্রামীণ জনপদের উন্নয়ন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই যোগাযোগব্যবস্থা ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কথা উঠে আসছে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকার সড়ক, সেতু ও অন্যান্য যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নত হলে কৃষিপণ্য পরিবহন, শিক্ষার্থীদের যাতায়াত, রোগীদের হাসপাতালে পৌঁছানো এবং স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনায় মানুষের ভোগান্তি কমবে। একই সঙ্গে গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রেও উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
জেলা পরিষদ প্রশাসকের বক্তব্যে সেই বৃহত্তর উন্নয়ন ভাবনার কথাই উঠে এসেছে। তাঁর মতে, গ্রামের মানুষকে উন্নয়নের মূলধারায় যুক্ত করতে হলে শুধু একটি বা দুটি অবকাঠামো প্রকল্প যথেষ্ট নয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, নিরাপদ পানি, স্থানীয় বাজার ও অন্যান্য নাগরিক সেবাকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে। তবেই শহর ও গ্রামের সুযোগ-সুবিধার ব্যবধান কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
সিলেট বিভাগের অবকাঠামো উন্নয়নে ৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দের যে তথ্য তিনি দিয়েছেন, তার বাস্তব সুফল কত দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছাবে, তা নির্ভর করবে প্রকল্পের যথাযথ পরিকল্পনা, অনুমোদন, বাস্তবায়ন ও তদারকির ওপর। স্থানীয় পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে এসব উন্নয়ন উদ্যোগ মানুষের আস্থা বাড়াতে পারে।
মতবিনিময় সভা থেকে জেলা পরিষদ প্রশাসক স্পষ্ট করেছেন, স্থানীয় উন্নয়নকে কেবল প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে যুক্ত করতে চান তাঁরা। গ্রামাঞ্চলের মানুষ যেন নিজেদের এলাকাতেই প্রয়োজনীয় সেবা ও সুযোগ-সুবিধা পান এবং উন্নয়নের সুফল যেন শহরের পাশাপাশি প্রত্যন্ত জনপদেও পৌঁছে যায়—এ লক্ষ্যেই জেলা পরিষদের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার কথা জানান তিনি।


